বিটিএসের উত্থানে দক্ষিণ কোরিয়ার সুদিন

কে-পপ গ্রুপ বিটিএস ‘বিটিএস দ্য কামব্যাক লাইভ’ অনুষ্ঠানে পারফর্ম করে
ফিলিপাইনের নাগরিক শেকিনা ইয়াওরা মার্চের শেষে সিউলের এক বাথহাউসে কাটান পুরো রাত। সিউলের সব হোটেল বুক হয়ে যাওয়ায় তার সামনে ছিল না আর কোনো উপায়। ৩২ বছর বয়েসি এই ভক্ত সকাল ৭টায় গিয়ে হাজির হন শহরের প্রধান চত্বরে। কয়েক লাখ মানুষের ভিড়ের মধ্যে তিনি খুঁজে নেন নিজের পছন্দের জায়গাটি।
বিটিএস-এর সাত সদস্যকে একপলক দেখার জন্য ভক্তদের মধ্যে কাজ করছিল এক অন্যরকম উন্মাদনা। দীর্ঘ চার বছর পর বিটিএস মঞ্চে ফিরছে নিজেদের সামরিক দায়িত্ব পালন শেষে। ইয়াওরা কনসার্টের টিকিট না পেলেও বড় স্ক্রিনে প্রিয় দলটিকে দেখে মেতে ওঠেন বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসে। তার বন্ধুরা তো ফিলিপাইন থেকে কেবল এক রাতের জন্যই উড়ে আসেন সিউলে। নেটফ্লিক্সে প্রায় পৌনে ২ কোটি মানুষ উপভোগ করে এই জমজমাট অনুষ্ঠান সরাসরি।
বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩ কোটি ভক্ত গড়ে তুলেছেন ‘বিটিএস আর্মি’ নামের এক বিশাল বাহিনী। দক্ষিণ কোরিয়ার এই জনপ্রিয় সংস্কৃতিকে দুনিয়াবাসী এখন চেনে ‘হাল্লু’ বা কোরিয়ান ঢেউ হিসেবে। বিটিএসের নতুন অ্যালবাম ‘আরিরং’ দখল করেছে আমেরিকা আর জাপানের মিউজিক চার্টের শীর্ষস্থান।
আসন্ন বিশ্ব সফর থেকে তারা আয় করবেন প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার। মার্চের মাঝামাঝিতে কোরিয়ায় পর্যটকদের আনাগোনা বেড়ে যায় প্রায় ৩২ শতাংশ। বিটিএসের মগ আর কম্বল বিক্রির ধুম পড়ে যায় সিউলের বড় বড় শপিং মলে।
দোকানগুলোতে বেচাকেনা বেড়ে যায় আগের বছরের তুলনায় প্রায় অর্ধেক। গবেষকরা হিসাব করে দেখেছেন, একটি কনসার্টই কোরিয়ার অর্থনীতিতে যোগ করে প্রায় ৮০ কোটি ডলার। বিটিএসের এই অভাবনীয় সাফল্য কোরিয়াকে এখন এনে দিচ্ছে বিশ্বের দরবারে এক অনন্য সম্মান।
বিটিএসের এই ফিরে আসাকে কোরিয়ান সরকার দেখছে নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের হাতিয়ার হিসেবে। সিউল শহর কর্তৃপক্ষ মেতে ওঠে এই কনসার্টকে একটি জাতীয় উৎসব হিসেবে উদ্যাপন করতে। অনুষ্ঠান চলাকালে মোতায়েন করা হয় ১০ হাজারের বেশি সরকারি নিরাপত্তাকর্মী।
সরকার এই আয়োজনের পেছনে খরচ করে প্রায় ৮৭ হাজার ডলার। বিটিএসের সদস্যদের সেনাবাহিনীতে যাওয়া নিয়ে একসময় নীতিনির্ধারকরা মেতেছিলেন বিতর্কে।
কোরিয়ার অর্থনীতিতে এই ব্যান্ডটি প্রতিবছর যোগ করে কয়েক বিলিয়ন ডলার। মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট তো অনুরোধই করেছেন কোরিয়ান শিল্পীদের ঘন ঘন তার দেশে পাঠাতে। সংগীতের বাইরেও কোরিয়ান প্রসাধনী আর কৃষিপণ্য এখন দখল করে নিচ্ছে বিশ্ববাজার। কোরিয়া এখন বিশ্ব জুড়ে ‘সফট পাওয়ার’ হিসেবে ষষ্ঠ অবস্থানে থেকে টেক্কা দিচ্ছে বড় বড় দেশগুলোকে।
তরুণ আইডলদের পার করতে হয় হাড়ভাঙা খাটুনির এক কঠিন প্রশিক্ষণ পর্ব। পর্যাপ্ত ঘুম আর বিশ্রামের সুযোগ মেলে না তাদের একদমই। প্রেম করা বা ফোন ব্যবহারের ওপর এজেন্সিগুলো চাপিয়ে দেয় নানা রকম কঠোর নিষেধাজ্ঞা। চাপের মুখে পড়ে অনেক জনপ্রিয় তারকা বেছে নেন আত্মহত্যার মতো ভয়ঙ্কর পথ।
সৌন্দর্যের এক অদ্ভুত মানদণ্ড তৈরি হয়েছে এই রঙিন দুনিয়াকে কেন্দ্র করে। কোরিয়ার তরুণ প্রজন্মের মধ্যে প্লাস্টিক সার্জারি করার প্রবণতা এখন বাড়ছে মহামারীর মতো।
কোরিয়ান সংস্কৃতিকে বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে দিতে কোম্পানিগুলো এখন নিচ্ছে নতুন সব কৌশল। অনেক ব্যান্ডে এখন নেওয়া হচ্ছে বিদেশি সদস্যদের, যাতে বিদেশের মাটিতে বাড়ে তাদের জনপ্রিয়তা।
বিটিএসের নতুন গানে ইংরেজি শব্দের ব্যবহার নিয়ে ভক্তদের মধ্যে দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কেউ কেউ মনে করেন, কোরিয়ান গানের সেই চিরচেনা সুর হারিয়ে যাচ্ছে বিশ্বায়নের ভিড়ে।
গবেষকরা বলছেন, বিদেশের বাজারে টিকে থাকতে হলে কোরিয়াকে ধরে রাখতে হবে নিজেদের স্বকীয়তা। স্রেফ টাকা ঢেলে নয়; বরং পরিকাঠামো আর কর্মীদের অধিকার রক্ষার দিকেও দিতে হবে বিশেষ নজর।
কোরিয়ান সরকার এখন লক্ষ্য নিয়েছে তাদের এই সংস্কৃতিকে কয়েকশ বিলিয়ন ডলারের শিল্পে রূপান্তর করতে। রুপালি পর্দার এই জৌলুশ আর বাস্তবের ক্ষমতার লড়াই এখন কোরিয়াকে নিয়ে যাচ্ছে এক নতুন ভবিষ্যতের দিকে।






