মন্দলোকের মহাকাব্য

এটিএম শামসুজ্জামান, দারাশিকো, মিশা সওদাগর, বাবর, আহমেদ শরীফ, হুমায়ুন ফরীদি, রাজীব
‘নয়নমনি’ চলচ্চিত্রের মোড়ল চরিত্র রূপায়ণের মধ্য দিয়ে খলনায়কের নতুন ধাঁচ প্রতিষ্ঠা করেন এটিএম শামসুজ্জামান। জন্মদিনে তাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে ঢালিউডের ভিলেনদের নিয়ে লিখেছেন মাহফুজুর রহমান
মাথায় টুপি। মুখে দাড়ি। পরনে পাঞ্জাবি-লুঙ্গি। জমি বর্গা দেয়। সুদ খায়। জোর করে কৃষকের জমি-ভিটা-ঘর কেড়ে নেয়। গ্রামে তার কথাই শেষ কথা। গ্রামবাসীকে দ্বীনের পথে ডাকে। আবার গ্রামের যৌবনবতী কন্যা মনির ওপর লোভ তার। ১৯৭৬ সালে আমজাদ হোসেন পরিচালিত ‘নয়নমনি’ সিনেমার অত্যাচারী এই মোড়ল বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী চরিত্র। এই মোড়লের ভূমিকায় সার্থক অভিনয় করে সিনেমাকে যেমন একটি যুগান্তকারী চরিত্র উপহার দেন, মাতবর চরিত্রের একটি ধাঁচ দাঁড় করান, তেমনই অভিনেতা হিসেবে ইন্ডাস্ট্রিতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন এটিএম শামসুজ্জামান। আজ তার জন্মদিন।
প্রথম সবাক সিনেমা আব্দুল জব্বার খাঁর ‘মুখ ও মুখোশ’-এ শমসের ডাকাতের ভূমিকায় অভিনয় করা ইনাম আহমেদ এ তল্লাটের চলচ্চিত্রে প্রথম খলনায়ক। ষাটের দশকে গোলাম মুস্তাফা, কাজী খালেক, ফতেহ লোহানী, রাজ, মেহফুজ, রাজু আহমেদ, খলিলের মতো অভিনেতাকে মন্দলোকের ভূমিকায় দেখা গেছে। তখনকার ভিলেনরা দেখতে বেশ সুদর্শন ছিলেন। দর্শনধারী হলেও গুণের বিচারে বদলোক। মুখে মধু অন্তরে বিষ। তবে তখনকার ভিলেনরা নৃশংস নয়। মন্দলোক হলেও তাদের সংলাপে সুরুচির ছাপ থাকে। শেষ দৃশ্যে হয়তো একটা চড় খেয়ে হুঁশও ফেরে ভিলেনের। নায়ক-নায়িকার কাছে মাফ-টাফ চেয়ে শুধরে নেওয়ার শপথ করলেই সিনেমার সমাপ্তি।
স্বাধীনতার পর দৃশ্যপট পাল্টে যায়। আত্মপ্রকাশ ঘটে জসীমের। তার নামে প্রযোজক-প্রদর্শক এক ঘাটে জল খায়। তার পর্দায় প্রবেশমুহূর্তে করতালিতে ফেটে পড়ে প্রেক্ষাগৃহ। ঘোড়ায় চড়ে তলোয়ার হাতে বিকটদর্শন জসীম ৩০ ফুট বাই ২০ ফুট পর্দায় বিভীষিকার সৃষ্টি করেন। পত্রিকায় সিনেমার বিজ্ঞাপনে তার নাম বড় হরফে ছাপা হয়। তার ছবি ছাড়া রঙিন পোস্টার ভাবাই যায় না। আর তখন থেকেই ভিলেনের হাত রক্তে রঞ্জিত হয়। শেষ দৃশ্যে মার খেলেও পুরো চিত্রনাট্য জুড়ে দোর্দণ্ড প্রতাপ ভিলেনের। জসীম-ওয়াসিমের তলোয়ারবাজি গোটা সত্তর দশকের বক্স অফিসকে পয়সার ঝনঝনানিতে মুখর করে রেখেছে।
জসীমের সমান্তরালে এটিএম শামসুজ্জামানের আবির্ভাব সামাজিক-পারিবারিক গল্পে দুষ্টু লোক হিসেবে। শয়তানির সঙ্গে রসিকতা যোগ করেন এ অভিনেতা কাম লেখক। সূচনা হয় সিরিয়ো কমেডির। দারাশিকো, বাবর, মতিন, আদিলদের প্রাসাদ ষড়যন্ত্র আর তলোয়ারঘটিত রক্তারক্তির বিপরীতে এটিএম, মুস্তাফা, খলিলরা চোরাচালানকারী, মাদককারবারি, মজুদদার, জোতদার চরিত্রগুলোকে পর্দায় জলজ্যান্ত করে তোলেন। ততদিনে নায়কোচিত চেহারা-সুরত নিয়ে হাজির হয়ে গেছেন আহমেদ শরীফ। ঝাঁপি মাথায় সাপুড়ে, তলোয়ার কোমরে বাঁধা উজির, সরু গোঁফ মুখে মাতবর— বিচিত্র চরিত্রে তার দাপুটে অভিনয়। তার বিকট চিৎকারে সিনেমা হল কেঁপে ওঠে। ‘সবুজ সাথী’ আর ‘সকাল সন্ধ্যা’ সিনেমায় নায়ক বনে যাওয়ার পর জসীমের হিংস্র চরিত্রগুলো চলে আসে আহমেদ শরীফের দখলে। মঞ্জুর রাহী আর মাহবুব খান গুঁইরাও ব্যস্ত সময় কাটান আশির দশকে। সব ধরনের সিনেমায় প্রবল উপস্থিতি দেখা যায় জাঁদরেল অভিনেতা রাজের। তবে একজন ভিলেন জিন, দৈত্য আর রাক্ষসের রূপ ধারণ করে বিপুল খ্যাতি অর্জন করেন। নাম না বললেও জাম্বুকে চিনতে কষ্ট হওয়ার কথা নয় কট্টর সিনেমাপ্রেমীদের।
এ ফাঁঁকে খলনায়িকাদের কথা না বললেই নয়। ‘জীবন থেকে নেয়া’র বড় আপা জহির রায়হানের অমর সৃষ্টি। রওশন জামিল এ চরিত্রকে দিয়েছেন অমরত্ব। তার পথ ধরে হেঁটে গেছেন মায়া হাজারিকা, রিনা খান, সুষমা, দুলারীরা।
ভিলেনদের এমন রমরমা বাজারে নায়ক হতে আসা রাজিবও নিজের সওদা পেতে বসেন। আমজাদ হোসেনের ‘ভাত দে’ সিনেমায় নিষ্ঠুর মজুদদার চরিত্রে তার অভিনয় দর্শক-সমালোচকের হাততালি পায়। নব্বই দশকে কাজী হায়াতের ‘দাঙ্গা’ তাকে দেয় রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। বরাবর তার সঙ্গেই উচ্চারিত হয় হুমায়ুন ফরীদির নাম। পারফরম্যান্সে, পারিশ্রমিকে, প্রশংসায় তার নায়কদেরও ছাপিয়ে যান ফরীদি। এ তারকা পর্দায় এলে কিশোররা হইহই করে লাফায় সিটের ওপর। সমানে সিটি বাজায় তরুণরা। নব্বই দশকে ফরীদি, রাজিব, আহমেদ শরীফ, মিজু আহমেদ, সাদেক বাচ্চু, নাসির খান, ড্যানি সিডাক, ইলিয়াস কোবরা, রাতিন, গাঙ্গুয়া, ডন, মিশা সওদাগররা মিলে ঢালিউডে ভিলেনদের আধিপত্য কায়েম করেন। নব্বই দশকের শেষের দিকে ‘সান ডে মানডে কোলোজ কইরা দিমু’ সংলাপ বলে ডিপজলের আগমন ঘটলে ষোলোকলা পূর্ণ হয়।
তখন থেকেই পর্দায় ভিলেনদের আচরণে বীভৎসতা আর ইতরতা দেখা যায়। কাটপিসের ভয়াবহতা বেড়ে গেলে এটিএম শামসুজ্জামান তার সত্তর দশকীয় ভিলেনসংক্রান্ত ধারণা ফিরিয়ে আনেন। কুসংস্কারাচ্ছন্ন মাতবরের চরিত্রে অসাধারণ অভিনয় করে সিনেমার চরম মন্দার ভেতর ‘মোল্লা বাড়ির বউ’কে সুপারহিট করিয়ে ছাড়েন। এভাবেই নেতিবাচক চরিত্রের অভিনেতা এটিএম শামসুজ্জামান চলচ্চিত্রে তার ইতিবাচক ভূমিকা রেখে গেছেন বারবার। তার মতো গুণী অভিনেতারা পর্দার ভিলেন হলেও বাস্তবের নায়ক।






