বিষয় চলচ্চিত্র
সুগন্ধিকে সিনেমায় বন্দি করার লড়াই

পারফিউম সিনেমার দৃশ্যে বেন উইশ
‘পারফিউম: দ্য স্টোরি অব আ মার্ডারার’ সিনেমাটি শুটিং শুরুর আগেই প্রায় দুই দশক ছিল আলোচনায়। একই নামের প্যাট্রিক জুসকিন্ডের উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় ১৯৮৫ সালে। বইটির দুই কোটির বেশি কপি বিশ্ব জুড়ে বিক্রি হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু লেখক দীর্ঘদিন এর চলচ্চিত্রস্বত্ব বিক্রি করতে রাজি ছিলেন না। জুসকিন্ড মনে করতেন, স্ট্যানলি কুবরিক ও মিলোশ ফোরম্যানের মতো নির্মাতাই হয়তো বইটির যথাযথ চলচ্চিত্রায়ণ করতে পারবেন। কুবরিকও বইটি নিয়ে আগ্রহী হয়েছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত দায়িত্বটা তিনি নেননি। এ সময়ের মধ্যে মার্টিন স্করসেজি, টিম বার্টন, রিডলি স্কটসহ আরও কয়েকজন বড় নির্মাতার নাম প্রকল্পটির সঙ্গে জড়িয়ে যায়। কিন্তু কোনো উদ্যোগই বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে ‘পারফিউম’ ধীরে ধীরে হলিউড ও ইউরোপীয় চলচ্চিত্রের কাছে একটি ‘আনফিল্মেবল’ বা চলচ্চিত্রে রূপ দেওয়া অসম্ভব গল্প হিসেবে পরিচিতি পায়।
এখানেই আসেন প্রযোজক বার্ন্ড আইখিঙ্গার। উপন্যাসটি প্রকাশের সময়ই তিনি এর চলচ্চিত্রস্বত্ব পাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু লেখকের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হন। প্রায় ১৫ বছর পর, ২০০০ সালে অবশেষে ১ কোটি ইউরোতে আইখিঙ্গার স্বত্ব কিনতে সক্ষম হন। চুক্তির অর্থ জোগাড় করতে আইখিঙ্গার বন্ধুবান্ধবসহ প্রায় সবার কাছ থেকে ঋণ নিয়েছিলেন। অর্থাৎ ক্যামেরা চালু হওয়ার আগেই এর পেছনে শুরু হয়ে গিয়েছিল বিশাল আর্থিক ঝুঁকি।
২০০৩ সালে ‘রান লোলা রান’খ্যাত জার্মান নির্মাতা টম টিকওয়ার সিনেমাটির পরিচালক হিসেবে চূড়ান্ত হয়েছেন। বইটির বিপুল পরিমাণ বর্ণনাকে কীভাবে দৃশ্য, শব্দ, আলো ও অভিনয়ের মাধ্যমে সিনেমায় রূপ দেওয়া যায়— সেটিই ছিল সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। পরিচালক টিকওয়ার চ্যালেঞ্জ নিয়ে বলেছিলেন, ‘সাহিত্যের ভাষা যদি গন্ধকে অনুভব করাতে পারে, তাহলে সিনেমারও সেটা পারা উচিত।’ এ বিশাল পরিকল্পনার জন্য প্রয়োজন হয়েছিল বিশাল বাজেটের। সিনেমাটির নির্মাণ ব্যয় ছিল প্রায় ৫ কোটি ইউরো বা আনুমানিক ৬ কোটি ডলার। সে সময় এটি জার্মানির অন্যতম ব্যয়বহুল চলচ্চিত্র প্রকল্প ছিল। জার্মানি, ফ্রান্স, স্পেন ও যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় তৈরি হয় সিনেমাটি। শুটিং শুরু হয় ২০০৫ সালের ১২ জুলাই এবং শেষ হয় ১৬ অক্টোবর। জার্মানি, স্পেন ও ফ্রান্সের বিভিন্ন স্থানে ধারণ করা হয় দৃশ্য। বার্সেলোনার ঐতিহাসিক গথিক এলাকা আঠারো শতকের প্যারিসের আবহ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
শুধু লোকেশনই নয়, প্রোডাকশন ডিজাইনেও ছিল বিশাল আয়োজন। শত শত শিল্পী, বিপুলসংখ্যক অতিরিক্ত অভিনয়শিল্পী এবং হাজারের বেশি পোশাক ব্যবহারের মাধ্যমে আঠারো শতকের ফ্রান্সকে পুনর্নির্মাণ করা হয়। বাজার, রাস্তা, ঘরবাড়ি, পোশাক ও মানুষের ভিড়— সবকিছুর মধ্যে এমন একটি পৃথিবী তৈরি করার চেষ্টা ছিল, যা গ্রেনুইয়ের ঘ্রাণনির্ভর জগৎকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলবে।
এ কঠিন চরিত্রটির দায়িত্ব দেওয়া হয় বেন উইশকে। তার সঙ্গে ছিলেন দুই কিংবদন্তি অভিনেতা অ্যালান রিকম্যান ও ডাস্টিন হফম্যান। মূল চরিত্র গ্রেনুই প্রচলিত অর্থে নায়ক নয়, আবার শুধু খলনায়কও নয়। এক সাক্ষাৎকারে উইশ বলেছেন, গ্রেনুইকে অনেকে ভয়ংকরতার প্রতীক মনে করলেও তিনি এবং টিকওয়ার তাকে একজন ‘নির্দোষ’ মানুষ হিসেবে দেখেছিলেন— যার নৈতিক বোধের বিকাশ অন্যরকম।
মুক্তির পর সিনেমাটি সমালোচকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পেলেও এর ভিজ্যুয়াল নির্মাণ ও অভিনয় ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে। জার্মানির প্রায় সব বড় পুরস্কার পেয়েছিল মুভিটি। প্রায় ৬ কোটি ডলারের বাজেটের সিনেমাটি বিশ্বব্যাপী ১৩ কোটি ৫০ লাখ ডলারের বেশি আয় করে। জার্মানিতেই আয় করে ৫ কোটি ৩০ লাখ ডলারের বেশি।





