যেভাবে রূপালি পর্দার তারকা হলেন শাকিব-পূর্ণিমারা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
তারকাদের নাম বদলের গল্পে আছে পরিচালকের পছন্দ, সহকর্মীদের পরামর্শ এবং তাদের নিজের সিদ্ধান্ত। পর্দার নামগুলো একসময় ছাপিয়ে গেছে পারিবারিক পরিচয়কে, যে নামে তাদের চিনিয়েছে বাংলা চলচ্চিত্র। লিখেছেন মীর রাকিব হাসান
ঢালিউডের অনেক তারকা পর্দায় যে নামে জনপ্রিয়তা পেয়েছেন, সেটি তাদের জন্মপরিচয় নয়। কারও নাম বদলেছে পরিচালকের পছন্দে, কেউ আবার নিজেই পর্দার জন্য বেছে নিয়েছেন নতুন নাম। ঢালিউডে এমন নাম বদলের গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তারকাদের চলচ্চিত্রে আসার স্মৃতি, নির্মাতাদের সৃজনশীলতা আর দর্শকের ভালোবাসার নানা অধ্যায়।
‘শাব’ নামের আড়ালে
দেশীয় চলচ্চিত্রে নারী শিল্পীদের নামের শুরুতে ‘শাব’ যুক্ত করার একটি প্রবণতা তৈরি করেছিলেন পরিচালক এহতেশাম। শবনম, শাবানা, শাবনাজ ও শাবনূরের নামের পেছনে রয়েছে তার পছন্দের ছাপ। উর্দু শব্দ ‘শব’-এর অর্থ রাত, আর ‘নূর’ অর্থ আলো। সেই অনুযায়ী শাবনূর নামের অর্থ রাতের আলো। এহতেশামের কাছে শব্দটির আবেদন ছিল বিশেষ।
এ ধারার অন্যতম উদাহরণ শাবানা। তার পারিবারিক নাম আফরোজা সুলতানা রত্না। মাত্র ৯ বছর বয়সে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার পাট চুকিয়েছেন তিনি। ১৯৬২ সালে মাত্র ১১ বছর বয়সে আত্মীয় ও চলচ্চিত্রকার এহতেশামের হাত ধরে ‘নতুন সুর’ সিনেমায় অতিরিক্ত শিল্পী হিসেবে অভিনয়ে নাম লেখান তিনি। ১৯৬৬ সালে উর্দু সিনেমা ‘চকোরী’-তে অভিনয়ের সময় এহতেশাম তার নাম রাখেন শাবানা। সেই নামেই পরবর্তী সময়ে তিনি হয়ে ওঠেন ঢালিউডের অন্যতম জনপ্রিয় ও সফল অভিনেত্রী।
এহতেশামের হাত ধরে নতুন নাম পাওয়ার আরেকটি উদাহরণ শাবনূর। এ ছাড়া পুরুষ শিল্পীদের নামকরণের ক্ষেত্রেও তার বিশেষ পছন্দের কথা জানা যায়। নাদিম ও নাঈমের মতো নামের ক্ষেত্রে ‘ন’ অক্ষরের ব্যবহার সেই প্রবণতার উদাহরণ হিসেবে আলোচিত।
ওমর সানী ছিলেন ইমরান
চিত্রনায়ক ওমর সানীর পারিবারিক নাম ছিল ইমরান। অভিনয়ের সুযোগ খুঁজতে গিয়ে পরিচালক জালাল উদ্দিন রুমির সঙ্গে পরিচয় হয় তার। তখন চলচ্চিত্রে ইমরান নামে আরেকজন নায়ক ছিলেন, যিনি দিলীপ বিশ্বাসের ‘অপেক্ষা’ সিনেমায় অভিনয় করেন। একই নামে দুই অভিনেতা থাকলে দর্শকের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে— এমন ভাবনা থেকেই রুমি তাকে নাম বদলানোর পরামর্শ দেন।
পরিচালকের প্রস্তাবে ‘ওমর’ নামটি বেছে নেন তিনি। পরে অভিনেতা জুবের আলমের পরামর্শে নামের সঙ্গে যুক্ত হয় ‘সানী’। এভাবেই ইমরান হয়ে ওঠেন ওমর সানী।
মাসুদ রানা থেকে শাকিব
বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় চিত্রনায়ক শাকিব খানকে পরিবারের অনেকে এখনো মাসুদ রানা নামে ডাকেন। তবে চলচ্চিত্রে তার পরিচিতি শাকিব খান হিসেবে। ১৯৯৯ সালে ‘অনন্ত ভালোবাসা’ সিনেমায় অভিনয়ের সময় বদলে যায় তার নাম। এক সাক্ষাৎকারে শাকিব খান জানিয়েছেন, সে সময় চলচ্চিত্রে শাকিল খান নামে আরেকজন অভিনেতা ছিলেন। অন্যদিকে, মাসুদ রানা নামটির সঙ্গে সোহেল রানার নামের মিল থাকায় নতুন নামের প্রয়োজন দেখা দেয়। পরে পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান ও প্রযোজক কুদ্দুস মিলে তার নাম রাখেন শাকিব খান। সেই নামেই ঢালিউডে প্রতিষ্ঠা পান তিনি।
শাকিব খানকে পরিবারের অনেকে এখনো মাসুদ রানা নামে ডাকেন। তবে মাসুদ রানা নামটির সঙ্গে সোহেল রানার নামের মিল থাকায় নতুন নামের প্রয়োজন দেখা দেয়। নির্মাতারা তার নাম রাখেন শাকিব খান
স্বপ্নে পাওয়া নাম!
অভিনেত্রী পূর্ণিমার পারিবারিক নাম দিলারা হানিফ রিতা। পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের কাছে তিনি রিতা নামে পরিচিত। ১৯৯৭ সালে জাকির হোসেন পরিচালিত ‘এ জীবন তোমার আমার’ সিনেমায় অভিনয়ের সময় নায়িকার নাম রাখা হয় পূর্ণিমা। তার ভাষ্য, সিনেমাটির প্রযোজক মতিউর রহমান নামটি পছন্দ করেন। একদিন তিনি পূর্ণিমাকে বলেছেন, তাকে পূর্ণিমার মতো দেখতে। প্রযোজক জানিয়েছেন, নামটি তিনি স্বপ্নে পেয়েছেন! পরে সাংবাদিকদের সামনে তাকে পূর্ণিমা নামে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। সেই থেকে রিতা হয়ে ওঠেন পূর্ণিমা।
নেপথ্যে পরীমন বিবি
চিত্রনায়িকা পরীমণির কাগজে-কলমে নাম শামসুন্নাহার স্মৃতি। তার বাবা নাম রেখেছিলেন স্মৃতি। তবে পরীমণি নামটির পেছনে রয়েছে পারিবারিক স্মৃতি। তার নানির নাম ছিল পরীমন বিবি। চলচ্চিত্রে আসার আগে নানি আদর করে তাকে পরী বলে ডাকতেন।
পরবর্তী সময়ে পরিচালক শাহ আলম মণ্ডলের ‘ভালোবাসা সীমাহীন’ সিনেমায় অভিনয়ের সময় পরীর সঙ্গে যুক্ত হয় ‘মণি’। এভাবেই পরীমণি নামটি প্রতিষ্ঠিত হয়, যে নামে তিনি পরিচিতি পান দর্শকের কাছে।
আরও কজন
ঢালিউডে নাম বদলে পরিচিতি পাওয়া তারকার তালিকা দীর্ঘ। একেকজনের নাম পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে ভিন্ন গল্প। ফরিদা আক্তার পপি হয়েছেন ববিতা, শামীমা আক্তার হয়েছেন রোজী আফসারী, আর পারভীন সুলতানা পরিচিতি পেয়েছেন দিতি নামে। পাকিস্তানের চলচ্চিত্রে জনপ্রিয়তা পাওয়া শবনমের পারিবারিক নাম ছিল ঝর্ণা বসাক; নন্দিতা বসাক নামেও তিনি পরিচিত ছিলেন। মিনা পাল হয়ে গেছেন কবরী। আরিফা আক্তার জামান হয়েছেন মৌসুমী, শারমিন আক্তার নিপা হয়েছেন মাহিয়া মাহি। রওশন আরা রেনু হয়েছেন রোজিনা, ইফতে আরা ডালিয়া হয়েছেন দোয়েল। অঞ্জলী ঘোষ হয়েছেন অঞ্জু ঘোষ, কোহিনূর আক্তার হয়েছেন সুচন্দা, বেবি হেলেন হয়েছেন সুচরিতা, আর তন্দ্রা মজুমদার পরিচিতি পেয়েছেন সুজাতা নামে। শর্মিলী আহমেদের পারিবারিক নাম ছিল মাজেদা মল্লিক। সুনেত্রার পারিবারিক নাম ফাতেমা হক, আর সুমিতা দেবী ছিলেন হেনা ভট্টাচার্য। সুলতানা জামান পরিচিতি পান মীনা জামান নামে, সাদিকা পারভিন পরিচিতি পেয়েছেন পপি নামে।
নায়কদের মধ্যে আলমগীরের পারিবারিক নাম ছিল মহিউদ্দিন আহমেদ। শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’-এ হয়ে গেছেন সালমান শাহ। মাসুদ পারভেজের পর্দা নাম সোহেল রানা। তার ছোট ভাই মাসুম পারভেজ নায়ক হয়েছেন রুবেল নামে। মোহাম্মদ ইদ্রিস ইলিয়াস নাম থেকে ইলিয়াস কাঞ্চন, আসলাম তালুকদার হয়ে ওঠেন মান্না, মিজানুর রহমান পরিচিতি পান মিজু আহমেদ নামে। তবারুক আহমেদ হয়েছেন বুলবুল আহমেদ, আবদুস সামাদ হয়েছেন টেলি সামাদ, আমিনুল ইসলাম স্বপন হয়েছেন চিত্রনায়ক আমিন খান, মাহমুদুর রহমান ওসমানী পরিচিতি পেয়েছেন মাহমুদ কলি নামে। নাজিম বেগ হয়ে গেছেন নাদিম।



