যেভাবে সিনেমার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল ত্রুফোর এক ফ্রিজ শট

‘দ্য ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ’ চলচ্চিত্রের শেষ শট
২১ অক্টোবর ফরাসি চলচ্চিত্রকার ফ্রাঁসোয়া ত্রুফোর প্রয়াণ দিবস। প্রথম ফিচার ফিল্মের শেষ শটটির জন্য বিশেষ খ্যাতি তার। সেই ফ্রিজ শটের বিশ্লেষণ করেছেন রুদ্র আরিফ
আঁতোয়ান দোয়ানেল। ১২ বছর বয়সী এক বালক। বাড়িতে নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত মা ও সৎবাবার অবহেলা আর স্কুলে কঠোর ও কর্তৃত্বপরায়ণ শিক্ষকদের অত্যাচারে সে মুক্তির পথ খোঁজে। স্কুল পালানো, সিনেমা হলে উঁকিঝুঁকি দেওয়া আর বন্ধু রেনের সঙ্গে ছোটখাটো অপরাধে দিন কাটে তার। স্কুলে অনুপস্থিতির কারণ হিসেবে মায়ের মৃত্যুর মিথ্যা গল্প সাজিয়ে ধরা পড়ে যায়। এরপর একটি অফিস থেকে টাইপরাইটার চুরি করেও শেষ রক্ষা হয় না। উঠতি বয়সের এই বালককে স্নেহ-মমতা ও যত্ন দিয়ে সঠিক পথে ফেরানোর বদলে মা ও সৎবাবা নেয় নির্মম সিদ্ধান্ত। মা ওর অভিভাবকত্ব ত্যাগ করে আর সৎবাবা ওকে তুলে দেয় পুলিশের হাতে। সেখান থেকে আঁতোয়ানের নতুন ঠিকানা হয় একটি গ্রামীণ কিশোর সংশোধন কেন্দ্র। নিজেকে একেবারেই পরিত্যক্ত অনুভব করা এই বেপরোয়া বালক একটি ফুটবল খেলা চলার সময় সেই কেন্দ্র থেকে পালিয়ে যায়। ছুটতে ছুটতে পৌঁছায় সমুদ্রের তীরে। সামনে আদিগন্ত সমুদ্র, পেছনে বড়দের তৈরি করা জীবনযাপনের কঠোরতা ও নির্মমতা— কোন পথে যাবে সে? এমন দ্বিধায় যখন সমুদ্র অভিমুখ থেকে ঘুরে দাঁড়ায় আর ক্যামেরার দিকে সরাসরি তাকায়, তখনই সমাপ্তি নেমে আসে চলচ্চিত্রের। এটি ফ্রাঁসোয়া ত্রুফোর প্রথম ফিচার ফিল্ম ‘দ্য ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ’-এর (১৯৫৯) কিংবদন্তিতুল্য ও রহস্যময় ফ্রিজ শট। এই শটের মাধ্যমেই নির্মাতা জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছেন, তিনি প্রচলিত ধারার চলচ্চিত্র বানাতে আসেননি। তর্কসাপেক্ষে দুনিয়ার সবচেয়ে প্রভাবশালী চলচ্চিত্র আন্দোলন ‘ফ্রেঞ্চ নিউ ওয়েভ’-এর অন্যতম অগ্রসেনা এবং ‘ইনফ্যান্ট টেরিবল’ হিসেবে খ্যাতি ত্রুফোর। ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত হয়ে ১৯৮৪ সালে মাত্র ৫২ বছর বয়সে অকালপ্রয়াত হলেও দর্শক ও বোদ্ধাদের আলোচনায় তার নাম যেসব কারণে ফিরে ফিরে আসে, এই শটের অবস্থান সেগুলোর শীর্ষ তালিকায়।
সামনের উন্মুক্ত জলরাশি আর পেছনের স্থলভাগ— এর মাঝখানে আটকা পড়ে গেছে তার জীবন
ফ্রিজ শট হলো এমন একটি স্থির শট, যেটি দেখতে আলোকচিত্রের মতো মনে হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, চলচ্চিত্রে ব্যাপক অর্থে এর প্রথম ব্যবহার করেছেন আলফ্রেড হিচকক, ১৯২৮ সালে মুক্তি পাওয়া নির্বাক ছায়াছবি ‘শ্যাম্পেন’-এ। এরপর ফ্রিজ শটের ঘটেছে বহুল ব্যবহার; কিন্তু ‘দ্য ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ’-এর শেষ শট হিসেবে ত্রুফো একে পুনরুদ্ভাবনের পাশাপাশি নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। ঐতিহ্যবাহী ক্লাসিক্যাল হলিউড চলচ্চিত্রের সাধারণত সমাপ্তি ঘটত কোনো মীমাংসার মাধ্যমে, যেখানে মূল চরিত্রের জয়-পরাজয় অথবা শান্তি খুঁজে পাওয়া দেখানোর চল ছিল। ত্রুফো এই ধারাকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে ফ্রেমটি ফ্রিজ বা স্থির করার মাধ্যমে কাহিনিকে আচমকাই থামিয়ে দিয়েছেন। সমুদ্র দেখার স্বপ্ন ছিল আঁতোয়ানের; কিন্তু এক দৌড়ে এখানে এসে পৌঁছানোর পর সে বুঝে গেছে, সামনের এই উন্মুক্ত জলরাশি আর পেছনের স্থলভাগ— এর মাঝখানে আটকা পড়ে গেছে তার জীবন; পালানোর কোনো পথ নেই। বয়সের হিসাবেও আঁতোয়ান পড়েছে একই পরিস্থিতিতে; ১২ বছর বয়স মানে সে চেনা শৈশব ও অচেনা যৌবনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। এই যে তার ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ অনিশ্চয়তায় ঝুলে রয়েছে, ফ্রিজ শটটি যেন সেই জীবনেরই প্রতিবিম্ব।



