আতিকুল হক চৌধুরীদের মতোই ভিকিদের মানি

আজিজুল হাকিম
অভিনয়জীবনের দীর্ঘ পাঁচ দশক পেরিয়ে এলেন অভিনেতা আজিজুল হাকিম। এখন নাটক-সিনেমায় ব্যস্ত সময় কাটছে তার। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মীর রাকিব হাসান
অভিনয়জীবনের ৫০ বছর পূর্ণ করে নিশ্চয়ই ভালো লাগা কাজ করছে?
আমার জন্য অবশ্যই এটি বিশেষ একটি বিষয়। গত বছর থেকেই নানা আয়োজনে এ উপলক্ষে উদযাপন হচ্ছে। গত সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলাম। সেখানে আমার অভিনয়জীবনের ৫০ বছরপূর্তি উপলক্ষে কয়েকটি অনুষ্ঠানে আমাকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভালোবাসা আমাকে দারুণ অনুপ্রাণিত করেছে।
দর্শকের ভালোবাসা কি পাঁচ দশক পরও একইভাবে অনুপ্রাণিত করে?
অবশ্যই। একজন শিল্পীকে নির্মাতার মুনশিয়ানা আর তার চরিত্র পৌঁছে দেয় দর্শকের হৃদয়ে। দর্শক যখন কোনো চরিত্রের জন্য একজন শিল্পীকে মনে রাখেন, তখন সেটি অনেক বড় প্রাপ্তি। এই সময়ের কাজ ‘বকুলপুর’-এর আব্বাস চেয়ারম্যান কিংবা অন্য নাটকের চরিত্রের জন্যও মানুষ আমাকে চিনে নেয়। কখনো ছোট শিশুরাও চরিত্রের নামে আমাকে ডাকে। ‘সাইলেন্স’-এর মতো কাজ দেখে কেউ কেউ আমাকে ভয়ংকর চরিত্রের অভিনেতা হিসেবে মনে রেখেছেন। এসব অভিজ্ঞতা আমাকে আনন্দ দেয়।
আপনার অভিনয়জীবনের ৫০ বছর উপলক্ষে গ্রন্থ প্রকাশের কাজ কতদূর এগিয়েছে?
একটি প্রকাশনা সংস্থা আমার অভিনয়জীবন নিয়ে গ্রন্থ প্রকাশ করতে আগ্রহ দেখিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সফরের আগে এ নিয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে আমার। একজন শিল্পীর দীর্ঘ অভিনয়জীবন নিয়ে গবেষণা করে গ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া সম্মানের। ১৯৭৭ সালে মঞ্চে কাজ শুরু করেছিলাম। মামুনুর রশীদের হাত ধরে আমার নাট্যজীবনের পথচলা শুরু। এরপর আরণ্যক নাট্যদলের সঙ্গে যুক্ত হই। ‘জয়জয়ন্তী’সহ বিভিন্ন প্রযোজনায় নিয়মিত অভিনয় করেছি। নির্দেশনা দিয়েছি। মঞ্চ আমাকে অভিনয়শিল্পী হিসেবে তৈরি করেছে। ১৯৮১ সালে মামুনুর রশীদের লেখা এবং আবদুল্লাহ আল মামুনের পরিচালনায় টেলিভিশনে ‘নোঙর’ নাটকে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে দর্শকের কাছে পরিচিতি পেতে শুরু করি। ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকে অভিনয় করে আরেক ধরনের পরিচিতি পাই। হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস অবলম্বনে মোস্তাফিজুর রহমান পরিচালিত ‘শঙ্খনীল কারাগার’ আমার প্রথম চলচ্চিত্র। দীর্ঘ পথচলায় অনেক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি। বইটির মাধ্যমে এসব অভিজ্ঞতা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছাবে।
যুক্তরাষ্ট্রে থাকার কারণে একটি চলচ্চিত্রের কাজ হাতছাড়া হয়েছে শুনলাম?
হ্যাঁ। গত ১৮ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলাম। দেশে ফিরেছি ১৮ সেপ্টেম্বর। এক মাসের সফর ছিল। তখন ভিকি জাহেদ ‘খলনায়ক’ নামের একটি চলচ্চিত্রে আমাকে নিতে চেয়েছিলেন। তার প্রথম পছন্দ ছিলাম বলে জেনেছি। কিন্তু শুটিংয়ের পরিকল্পিত সময়ে আমি দেশের বাইরে থাকায় কাজটি হাতছাড়া হয়েছে। গত সোমবারও এ নিয়ে আমার সঙ্গে তার কথা হয়েছে। আমাকে সিনেমাটিতে না নিতে পারায় সে আফসোস করেছে। আমারও খারাপ লেগেছে। ভিকির গল্প বলার ধরন প্রচলিত ধারা থেকে কিছুটা আলাদা। সে প্রতিটি চরিত্রকে নিজের মতো করে ভাবতে এবং উপস্থাপন করতে চায়।
ভিকি জাহেদের সঙ্গে নতুন কোনো কাজ হচ্ছে?
হ্যাঁ। গত রবিবার অনেক রাত পর্যন্ত আমরা একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের শুটিং করেছি। হ্যালোইন উপলক্ষে গন্ধকাটা ভূতকে কেন্দ্র করে একটি অতিপ্রাকৃত গল্প নিয়ে তৈরি হচ্ছে এটি। এর নাম এখনো চূড়ান্ত হয়নি। সম্ভবত শুটিং ও সম্পাদনা শেষে নাম জানা যাবে।
নতুন প্রজন্মের নির্মাতাদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা কেমন?
তাদের কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। আমরা অনেক সময় মনে করি, তরুণ নির্মাতারা হয়তো অভিজ্ঞতায় পিছিয়ে। কিন্তু বাস্তবে তারা অনেক পড়াশোনা করেন, বিশ্ব জুড়ে কী হচ্ছে, কীভাবে গল্প বলা হচ্ছে, সেসব ব্যাপারে তাদের ধারণা আছে। এখন তো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সিনেমা ও সিরিজ দেখার সুযোগ সবার হাতে। ফলে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি অনেক বিস্তৃত। নতুন পরিচালকদের সবসময়ই আমি আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাই, তাদের গল্প শুনি। একসময় আতিকুল হক চৌধুরীদের যেভাবে দেখতাম, ভিকিদের নির্দেশনা সেভাবেই মেনে অভিনয় করি।
‘প্রেশার কুকার’ সিনেমায় দর্শক আপনাকে কিছুটা ভিন্ন রূপে দেখেছে।
দর্শকের কাছে আমার একটি পরিচিত ইমেজ আছে। এর বাইরে গিয়ে কোনো চরিত্রে অভিনয় করলে তাদের কারও কারও কাছে সেটি প্রথমে অপ্রত্যাশিত মনে হতে পারে। কিন্তু একজন অভিনয়শিল্পীর তো বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করা উচিত। আমি সবসময় চরিত্রাভিনেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছি। তাই ‘প্রেশার কুকার’-এর চরিত্রটি আমার ভালো লেগেছে। আমাদের সমাজে নানা রকমের মানুষ আছে। গল্পে সেই মানুষগুলোর চরিত্রই উঠে আসে। আমার চরিত্রকে সমাজের বিচ্ছিন্ন কোনো মানুষে বলে মনে হয়নি। সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে পরিচালক রায়হান রাফীর সঙ্গে দেখা হতেই সে আমাকে বলল, হইচইয়ে মুক্তির পর আমার চরিত্রটি নিয়ে অনেক প্রতিক্রিয়া আসছে। দর্শক কাজটি দেখছেন, আলোচনা করছেন, এটাই একজন অভিনয়শিল্পীর জন্য আনন্দের।
টেলিভিশন নাটকে নিয়মিত কাজ করছেন?
হ্যাঁ। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে ‘বকুলপুর’-এর তৃতীয় সিজনের কাজ শুরু করেছি। দীপ্ত টিভির ধারাবাহিকটি এখন পরিচালনা করছেন হাসান রেজাউল। টেলিভিশনের পাশাপাশি ইউটিউব ও অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের জন্য অনেক ভালো কাজ হচ্ছে। নতুন শিল্পীরা আসছে, নতুন গল্প তৈরি হচ্ছে। আমাদের বয়সী শিল্পীদের জন্যও নতুন ধরনের চরিত্র তৈরি হচ্ছে। পরিবারের গল্পে বাবা, বড় ভাই কিংবা অভিভাবকের চরিত্রগুলো আবার গুরুত্ব পাওয়ায় অভিনয় করার সুযোগ পাচ্ছি।



