আমেরিকার মঞ্চে বন্যা, তমালিকা ও হৃদি

(বাঁ থেকে) বন্যা মির্জা, তমালিকা কর্মকার ও হৃদি হক
দেশের মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে পরিচিত কয়েকজন অভিনেত্রী এখন স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন যুক্তরাষ্ট্রে। ভিনদেশে জীবনযাত্রার ব্যস্ততার ফাঁকে বাংলা নাটক নিয়ে নিজেদের মঞ্চভাবনা তুলে ধরছেন তারা
প্রবাসের ব্যস্ত জীবনেও মঞ্চের টান ভুলতে পারেননি বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনের পরিচিত মুখ বন্যা মির্জা, তমালিকা কর্মকার ও হৃদি হক। দেশ থেকে হাজার মাইল দূরে নাটক ও অভিনয়ের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক যেন আরও গভীর হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে বাংলা ভাষার নাটক মঞ্চায়নের পাশাপাশি নতুন প্রযোজনা ও ভিন্নধর্মী নাট্যভাবনার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন তারা। কেউ বহু বছর পর আবারও মঞ্চে উঠে অনুভব করছেন অভিনয়ের সেই পুরনো উত্তেজনা, কেউবা নির্দেশনার মাধ্যমে নির্মাণ করছেন নতুন মঞ্চভাষা।
‘অমানুষ’ নিয়ে তমালিকা
বেশ কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন অভিনেত্রী তমালিকা কর্মকার। প্রবাসে প্রথমবার মঞ্চে অভিনয় করতে যাচ্ছেন তিনি। নাট্যকার ও নির্দেশক মামুনুর রশীদের লেখা ‘অমানুষ’ নাটক দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মঞ্চে অভিষেক হচ্ছে তার। সূচনা থিয়েটারের প্রযোজনায় এর নির্দেশনা দিচ্ছেন জান্নাতুল তম্পা। ভার্জিনিয়ার আলেকজান্দ্রিয়ায় জেফারসন স্ট্রিটের ন্যানি জে. লি রিক্রিয়েশন সেন্টারে স্থানীয় সময় ৪ অক্টোবর বিকাল ৫টা ৩০ মিনিটে নাটকটির মঞ্চায়ন হবে। প্রায় ৩১ বছর আগে লেখা ‘অমানুষ’ নাটকে সমাজের অবক্ষয় এবং নানা সামাজিক অসংগতি ও বৈপরীত্য উঠে এসেছে।
মঞ্চে অভিনয় প্রসঙ্গে তমালিকা বললেন, ‘একজন অভিনেত্রী হিসেবে যতই অভিজ্ঞ হই না কেন, প্রতিবার মঞ্চে উঠলে দর্শকের সামনে আমাকে নতুন একটি পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়। থিয়েটার শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি শ্রেণিসংগ্রামের একটি তীক্ষ্ণ হাতিয়ার। মঞ্চে অভিনয় শেষ করার পর সরাসরি দর্শকের প্রতিক্রিয়া জানতে পারার বিষয়টি আমার কাছে এক ধরনের নেশায় পরিণত হয়েছে। সেই অনুভূতির মধ্যে বারবার ডুবে যেতে চাই।’
টেলিভিশন, চলচ্চিত্র, মঞ্চ— তিন মাধ্যমেই কাজ করেছেন তমালিকা। তার অভিনীত টিভি নাটকের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘কোন কাননের ফুল’, ‘কোথাও কেউ নেই’ ও ‘সাঁঝবেলা’। ‘অন্য জীবন’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করে প্রশংসা কুড়িয়েছেন তিনি। পরে মামুনুর রশীদ তাকে আরণ্যক নাট্যদলে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। ১৯৯২ সালে মামুনুর রশীদের লেখা ও আজিজুল হাকিমের নির্দেশনায় ‘পাথর’ নাটকের মধ্য দিয়ে মঞ্চে অভিষেক হয় তমালিকার। এরপর আরণ্যকের ‘ময়ূর সিংহাসন’, ‘জয় জয়ন্তী’, ‘রাঢ়াং’, ‘শত্রুঘ্ন’, ‘উপরওয়ালা’, ‘ভাঙাভাঙা’, ‘দ্য জুবিলি হোটেল’, ‘ইবলিশ’, ‘হেলাখেলা’ ও ‘প্রাকৃতজন কথা’সহ বিভিন্ন নাটকে অভিনয় করেছেন তিনি।
হৃদি হকের ‘আন্ধার জয়’
অভিনেত্রী ও নাট্যনির্মাতা হৃদি হক নতুন মঞ্চনাটক নির্দেশনা দিচ্ছেন। এর নাম রাখা হয়েছে ‘আন্ধার জয়’। লেডি গ্রেগরির কালজয়ী নাটক ‘দ্য রাইজিং অব দ্য মুন’ অবলম্বনে তার নিজস্ব ভাবনা ও মঞ্চভাষায় রূপ পেয়েছে এটি। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে ৪ অক্টোবর স্থানীয় সময় বিকাল ৫টায় এই নাট্যপ্রযোজনার মঞ্চায়ন হবে। অস্টিন নাট্যমঞ্চের আয়োজনে জর্জটাউন থিয়েটার হলে এটি উপভোগ করা যাবে।
লেডি গ্রেগরির ‘দ্য রাইজিং অব দ্য মুন’ আইরিশ নাট্যসাহিত্যের বহুল পরিচিত একটি কাজ। সেই গল্পকে নতুন আঙ্গিকে রূপ দিতে গিয়ে হৃদি হক এতে যুক্ত করেছেন ব্যঙ্গাত্মক উপস্থাপনা, সংগীত ও কোরিওগ্রাফি। তিনি জানিয়েছেন, মূল নাটকের বক্তব্য অক্ষুণ্ন রেখে ভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট ও মঞ্চভাষায় গল্পটিকে নতুন করে নির্মাণ করা হয়েছে।
‘নেমেসিস’-এ বন্যা মির্জা
অভিনেত্রী বন্যা মির্জা দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে বসবাস করছেন। প্রবাসে তার নাট্যযাত্রায় যুক্ত হয়েছে নতুন এক অধ্যায়। ‘নেমেসিস’ নামের একটি নাটকের মাধ্যমে নিউ ইয়র্কের মঞ্চে প্রথমবারের মতো অভিনয় করেছেন তিনি। এটি নির্দেশনা দিয়েছেন খায়রুল ইসলাম পাখি। গত ৫ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কের জ্যামাইকায় মাসুম রেজা রচিত বাংলা ভাষার নাটকটির দুটি প্রদর্শনী হয়। এর আয়োজন করেছে থিয়েটার ৭১। মঞ্চে আবারও অভিনয়ের সুযোগ পেয়ে বেশ আনন্দিত বন্যা মির্জা।
তিনজনের কাজের ধরন ও নাট্যভাবনা আলাদা হলেও একটি জায়গায় তাদের মিল— মঞ্চের প্রতি গভীর ভালোবাসা। প্রবাসের মাটিতে বাংলা নাটক নিয়ে কাজ করার মধ্য দিয়ে তারা একদিকে নিজেদের শিল্পীসত্তাকে নতুন করে আবিষ্কার করছেন, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দর্শকের সামনে তুলে ধরছেন বাংলাদেশের নাট্যচর্চার বৈচিত্র্য। সব মিলিয়ে আমেরিকার মঞ্চে তাদের এই প্রত্যাবর্তন হয়ে উঠেছে দেশ ও প্রবাসের সংস্কৃতির এক অভিনব সেতুবন্ধ।



