রকস্টারদের কণ্ঠে কালজয়ী সিনেমার গান

আজম খান, আইয়ুব বাচ্চু, সুমি ও জেমস
আশির শেষ থেকে নব্বই দশকের শুরুর দিকে ব্যান্ড সংগীতের জনপ্রিয়তা এতই বেড়ে যায়, সে সময় বাংলাদেশি চলচ্চিত্রেও রকস্টারদের দিয়ে প্লেব্যাক করানোর জোয়ার আসে। সেসব কালজয়ী গানের শিল্পীদের নিয়ে লিখেছেন পান্থ আফজাল
আজম খান
উচ্চারণ ব্যান্ডের আজম খান। যাকে বলা হয় বাংলা ব্যান্ডের গুরু বা সম্রাট। তিনি চলচ্চিত্রের বেশ কিছু গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। এমনকি শাহীন সুমনের ‘গডফাদার’ চলচ্চিত্রে মাফিয়া সম্রাট চরিত্রে অভিনয়ও করেছেন। তার জনপ্রিয় ‘ওরে সালেকা ওরে মালেকা’ ও ‘আলাল দুলাল’ গান দুটি চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত হয়েছে। এ ছাড়া ‘হীরক বাতি’ চলচ্চিত্রে তিনি আলম খানের সুরে ‘জেলের মেয়ে’ শিরোনামে একটি গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। ‘দুই বধূ এক স্বামী’ চলচ্চিত্রেও একই সুরকারের সুর ও সংগীতে ‘সিগারেটে দে দম’ গানটি গেয়েছেন আজম খান।
তপন চৌধুরী
ব্যান্ড শিল্পীদের মধ্যে প্রথম প্লেব্যাকে কণ্ঠ দেন সোলসের অন্যতম ভোকালিস্ট তপন চৌধুরী। ব্যান্ড ছেড়ে একক ক্যারিয়ার গড়ার পর তিনি বেশ কিছু চলচ্চিত্রে গান গেয়েছেন। প্লেব্যাকে তার যাত্রা শুরু হয় ১৯৮৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত আমজাদ হোসেনের চলচ্চিত্র ‘ভাত দে’র মাধ্যমে। এ ছবিতে ‘কত কাঁদলাম’ গানের কণ্ঠটি তারই। এরপর প্রায় ৩০০ প্লেব্যাকে কণ্ঠ দিয়েছেন। তার জনপ্রিয় প্লেব্যাকের মধ্যে রয়েছে ‘ঢাকা ৮৬’ চলচ্চিত্রের ‘পাথরের পৃথিবীতে কাচের হৃদয়’, ‘জীবনসঙ্গী’র ‘তুমি কেমনে এত নিঠুর হইলা’ ইত্যাদি।
আইয়ুব বাচ্চু
প্লেব্যাক সিঙ্গার হিসেবে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন আইয়ুব বাচ্চু। তার গাওয়া উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের গানের মধ্যে রয়েছে ‘আম্মাজান’-এর টাইটেল সং, ‘তোমার আমার প্রেম’ ও ‘স্বামী আর স্ত্রী বানাইছে কোন মিস্ত্রি’; ‘সাগরিকা’র ‘আকাশ ছুঁয়েছে মাটিকে’, ‘লুটতরাজ’-এর ‘অনন্ত প্রেম তুমি দাও আমাকে’, ‘ব্যাচেলর’-এর ‘আমি তো প্রেমে পড়িনি’, ‘তেজি’র ‘এই জগৎ সংসারে তুমি এমনি একজন’ ইত্যাদি। প্রতিটি গানই তুমুল জনপ্রিয় এবং এখনো শ্রোতাদের মুখে মুখে ফেরে।
মাকসুদ
‘ফিডব্যাক’ ও পরে ‘মাকসুদ ও ঢাকা’র ভোকাল মাকসুদ প্রথম প্লেব্যাকে কণ্ঠ দেন ‘অঞ্জলি’তে। দারাশিকো পরিচালিত এই চলচ্চিত্রে তিনি গেয়েছেন ‘তোমাকে দেখলে একবার’ শিরোনামের তুমুল জনপ্রিয় গানটি। এ ছাড়া এই সিনেমাতে তার গাওয়া ‘লোকে বলে পাগলামি আমি বলি ভালোবাসা’ গানটিও জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এরপর মনতাজুর রহমান আকবরের ‘ডিসকো ড্যান্সার’ চলচ্চিত্রের টাইটেল সং এবং মজিবুর রহমানের ‘আইনের হাত’-এ ‘পিরিত রতন’ শিরোনামে গান গেয়েছেন তিনি।
জেমস
কণ্ঠের জাদুতে প্লেব্যাকের দুনিয়া জয় করে নিয়েছেন নগরবাউল জেমস। শুধু বাংলাদেশের চলচ্চিত্রেই নয়, ভারতীয় চলচ্চিত্রেও প্লেব্যাক করেছেন তিনি। ঢালিউডে তার গাওয়া গানের মধ্যে রয়েছে ‘মনের সাথে যুদ্ধ’ চলচ্চিত্রের ‘আসবারকালে আসলাম একা’, ‘ওয়ার্নিং’-এর ‘এত কষ্ট’, ‘দেশাই দ্য লিডার’-এর ‘পতাকাটা খামচাতে আসে যদি’, ‘সুইটহার্ট’-এর ‘বিধাতা’, ‘সত্তা’র ‘তোর প্রেমেতে অন্ধ’ প্রভৃতি। হিন্দি চলচ্চিত্রের মধ্যে ‘গ্যাংস্টার’-এর ‘ভিগি ভিগি’, ‘লামহে’র ‘চাল চালে আপনি ঘর’ এবং ‘লাইফ ইন আ মেট্রো’র ‘আলবিদা’ ও ‘রিস্তে’ বলিউডি শ্রোতাদের কাছে রীতিমতো আলোড়ন তুলেছে।
কুমার বিশ্বজিৎ
সোলস ব্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও পরে একক ক্যারিয়ার ও প্লেব্যাকে কুমার বিশ্বজিৎ ব্যাপক সফলতা পান। আধুনিক গান হিসেবে তার গাওয়া ‘যেখানে সীমান্ত তোমার’ গানটি ‘শেষ উপহার’ এবং ‘তুমি যদি বলো’ ব্যবহার করা হয় ‘স্বামী-স্ত্রীর যুদ্ধ’ চলচ্চিত্রে।
শাফিন আহমেদ
নব্বইয়ের দশকে ‘মাইলস’ ব্যান্ডটি সরাসরি চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনা ও প্লেব্যাকে অংশ নেয়। ‘অজান্তে’ চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত হয় শাফিনের গাওয়া ‘আজ জন্মদিন তোমার’।
বিপ্লব
প্রমিথিউস ব্যান্ডের লিড ভোকালিস্ট বিপ্লবও বেশ কিছু চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক করেছেন। তার গাওয়া জনপ্রিয় গানের মধ্যে রয়েছে ‘আব্বাজান’ চলচ্চিত্রের টাইটেল সং ও ‘দুনিয়ারে দুনিয়া’, ‘মাটির ফুল’-এর ‘এই বুকেতে কষ্ট’ ও ‘ভালোবাসা সর্বনাশা’, ‘চাঁদের মতো বৌ’র ‘ধোয়া ধোয়া’, ‘মিলন হবে কতদিনে’র ‘জীবন শুধু জীবন’ ইত্যাদি।
হাসান
আর্ক ব্যান্ড তারকা হাসান প্লেব্যাক নিয়ে বরাবরই অনাগ্রহী ছিলেন। অনেক প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন তিনি। তবে একটিমাত্র প্লেব্যাকে কণ্ঠ দিয়েছেন; ‘জোর যার মুল্লুক তার’-এ, ‘একই আকাশ নীড়ে’ শিরোনামে। আলাউদ্দিন আলীর মতো সম্মানিত সুরকার ও সংগীত পরিচালক তাকে বারবার অনুরোধ করলে সেটি হাসান ফেরাতে পারেননি। এর পর আর প্লেব্যাকে পাওয়া যায়নি তাকে।
শারমিন সুলতানা সুমি
‘আয়নাবাজি’ চলচ্চিত্রে ‘দুনিয়া’, ‘আইসক্রিম’-এ ‘ভালো থাকা মন্দ থাকা’, ‘ডুব’-এ ‘আহারে জীবন’, ‘ভয়ংকর সুন্দর’-এ ‘এই শহরের কাকটাও জেনে গেছে’ এবং ‘বিউটি সার্কাস’-এ ‘বয়ে যাও নক্ষত্র’ গানটি গেয়েছেন চিরকুট ব্যান্ডের সুমি।
আরও যারা
বাংলা ব্যান্ডের অন্যতম জনপ্রিয় ভোকালিস্ট ও অর্ণব অ্যান্ড ফ্রেন্ডসের অর্ণব বেশ কিছু চলচ্চিত্রে গান গেয়েছেন এবং সংগীত পরিচালনা করেছেন। ‘মনপুরা’য় তার কণ্ঠে শোনা গেছে ‘আমার সোনার ময়না পাখি’। ‘জাগো’, ‘আয়নাবাজি’, ‘আন্ডার কনস্ট্রাকশন’সহ বেশ কিছু চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন তিনি। অর্থহীন ব্যান্ডের সুমন ‘ঊনপঞ্চাশ বাতাস’ চলচ্চিত্রে ‘প্রথম’ শিরোনামে গান গেয়েছেন। একসময়ের ওয়ারফেজ ব্যান্ডের গিটারিস্ট ও ভোকালিস্ট বালাম ‘প্রিয়তমা’ চলচ্চিত্রে ‘ও প্রিয়তমা’ এবং ‘রাজকুমার’-এ ‘আমি হব রাজকুমার’ গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। ব্যান্ড অ্যাশেজের জুনায়েদ ইভান ‘বিউটি সার্কাস’ চলচ্চিত্রে গেয়েছেন ‘নিরুদ্দেশ’ গানটি। এ ছাড়া তানযীর তুহিন, বাপ্পা মজুমদার ও এস আই টুটুলও একক ও দলগতভাবে বেশ কিছু চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক করেছেন।




