নিজস্ব মতামত রক্ষার লড়াইটাও জরুরি

ক্রিস্তিয়ান মুনজিউ -কান উৎসব
রোমানিয়ান নিউ ওয়েভ চলচ্চিত্র আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতা । ‘ফিয়র্ড’ সিনেমার মাধ্যমে ১৯ বছর পর দ্বিতীয়বার কান চলচ্চিত্র উৎসবের গোল্ডেন পাম জিতেছেন তিনি। ৫৮ বছর বয়সী এই নির্মাতার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জনি হক
‘ফিয়র্ড’-এর গল্প থেকে কোন মূল্যবোধ গ্রহণ করবে, সেটি কি ইচ্ছে করেই দর্শকের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন?
এটি কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ চলচ্চিত্র। প্রচলিত অর্থে এমন কোনো স্বস্তিদায়ক চলচ্চিত্র নয়, যেখানে দর্শককে বলে দেওয়া হয় কোন বিষয়টি বিশ্বাস করতে হবে। বরং দর্শকের সামনে মূল্যবোধের দুটি ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরেছি। তাদেরই সেখান থেকে নিজস্ব উপলব্ধিতে পৌঁছাতে বলেছি। ‘ফিয়র্ড’ সিনেমার মূল পরিবারটি একপর্যায়ে ভেবেছে, নতুন দেশে এসেও নিজেদের মূল্যবোধ ধরে রাখার এবং সেই মূল্যবোধ পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে। কিন্তু পরে তারা বুঝতে পেরেছে, নতুন সমাজে টিকে থাকতে হলে অন্যদের মূল্যবোধের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে হবে। এ ধরনের পরিবর্তন রাতারাতি ঘটে না। এজন্য সময় লাগে, প্রজ্ঞা লাগে। মানুষের মূল্যবোধ, সমাজের প্রত্যাশা এবং পারস্পরিক সম্পর্কের জটিলতা বোঝার জন্য ধৈর্য ও বিচক্ষণতা থাকতে হয়।
২০০৭ সালে ‘ফোর মান্থস, থ্রি উইকস অ্যান্ড টু ডেজ’ গোল্ডেন পাম জিতেছিল। এবার ‘ফিয়র্ড’-এর জন্য আবারও সেই পুরস্কার পেলেন। দ্বিতীয়বার গোল্ডেন পাম জয় কি আপনাকে সৃজনশীলতার ক্ষেত্রে আরও বেশি স্বাধীনতা দিচ্ছে?
সত্যি বলতে, এ বিষয়ে এখনই কিছু বলতে পারছি না। কারণ গোল্ডেন পাম জয়ের পর খুব বেশি সময় পেরোয়নি। পরবর্তী সিনেমার কাজ শুরু করলে বুঝতে পারব, এই পুরস্কার আমার কাজের ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য তৈরি করে কি না। তবে সৃজনশীল স্বাধীনতার কথা যদি বলেন, দ্বিতীয়বার গোল্ডেন পাম জয়ের আগেও যথেষ্ট স্বাধীনতা উপভোগ করেছি। নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, এ ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণের চর্চা চালিয়ে যাব। বিশেষ করে রোমানিয়ায় এ ধরনের সিনেমা বানাতে গিয়ে অনেক স্বাধীনতা পাই। হ্যাঁ, আমাকে তুলনামূলক কম বাজেটে কাজ করতে হয়। কিন্তু সৃজনশীলতার সঙ্গে সম্পর্কিত সব সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে পারি। ফলে কাজের দিক থেকে কোনো সমস্যা হয়নি।
প্রশ্ন হলো, যখন বড় বাজেটের কোনো চলচ্চিত্রে কাজ করবেন, তখন পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে ভেবেছেন?
আমার ক্যারিয়ারে এই প্রথম তুলনামূলকভাবে পরিচিত অভিনেতাদের (সেবাস্তিয়ান স্ট্যান, রেনাতে রাইন্সভে) নিয়ে কাজ করেছি। এর ফলে সিনেমাটি নিয়ে মানুষের আগ্রহ ও মনোযোগ কতটা বেড়েছে, তা দেখেছি। অনেকেরই মনে হয়েছে, এবার অন্য ধরনের কিছু করেছি। অথচ চলচ্চিত্র নির্মাণের যে নিজস্ব পদ্ধতি অনুসরণ করি, তাতে কোনো পরিবর্তন আনিনি। পার্থক্য শুধু এটুকু, এবারের সিনেমায় ইংরেজি ভাষা শোনা গেছে। এর ফলে এটি অন্যরকম মনোযোগ পেয়েছে। পাশাপাশি পর্দায় পরিচিত অভিনেতাদের দেখে দর্শকও আগ্রহী হয়েছেন। সব মিলিয়ে সিনেমাটি নিয়ে আলোচনা অনেক বেড়েছে।
গোল্ডেন পাম নিঃসন্দেহে অসাধারণ একটি পুরস্কার। একটি চলচ্চিত্রের প্রতি মানুষের কৌতূহল বাড়িয়ে তুলতে এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ‘ফিয়র্ড’-এর ক্ষেত্রে এই স্বীকৃতি বিশেষভাবে কাজে এসেছে। সত্যিকার অর্থেই গোল্ডেন পাম আমাদের জন্য অনেক সহায়ক হয়েছে। সিনেমাটিকে দর্শকের সামনে তুলে ধরার ক্ষেত্রে পুরস্কারটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে এই গল্প কতটা প্রাসঙ্গিক, তা বোঝা যাবে ১০, ১৫ কিংবা ২০ বছর পর। তখনই হয়তো বিচার করা যাবে, এভাবে চলচ্চিত্র নির্মাণ করা কতটা যথার্থ।
‘ফোর মান্থস, থ্রি উইকস অ্যান্ড টু ডেজ’-এ মানুষকে নিপীড়নমূলক শাসনব্যবস্থার মধ্যে অসহায়ভাবে সংগ্রাম করতে দেখা যায়। অন্যদিকে, ‘ফিয়র্ড’ সিনেমায় একটি পরিবার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যেও নিজেদের অসহায় মনে করে। সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি রাজনৈতিক ব্যবস্থায় মানুষের এই অসহায়ত্বের কোন দিক আপনাকে সবচেয়ে বেশি ভাবায়?
আমরা যে গণতন্ত্রকে এতদিন চিনে এসেছি, তার সীমাবদ্ধতা কোথায়; বিশেষ করে মানুষকে শিক্ষিত করার পেছনে যথেষ্ট বিনিয়োগ না করলে কী ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, সেটিই আমার ভাবনার বিষয়। গণতন্ত্র তো শুধু একটি নির্বাচনী ব্যবস্থা হতে পারে না, তাই না? সমাজ সম্পর্কে মানুষের মতামত জানতে চাওয়ার আগে আমাদের নিশ্চিত করতে হবে, তারা যেন যথেষ্ট তথ্য জানে এবং শিক্ষিত হয়। তা না হলে আমরা এমন পরিস্থিতিতে পৌঁছাতে পারি, যেখানে মানুষ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ভোট দিয়ে এমন একটি সিদ্ধান্ত নেবে, যা নৈতিকতার বিচারে গ্রহণযোগ্য নয়।
গণতন্ত্র মানেই কি সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত অন্যদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার অধিকার বলে মনে করেন?
আমার মনে হয় না, গণতন্ত্রকে এভাবে দেখা উচিত। সমাজ কোন পথে এগোবে, সেই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারি আমরা। কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় অন্যদেরও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং তাদের মতামতের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কিংবা উত্তেজিত জনতা সবসময়ই শক্তিশালী হবে। তারা নিজেদের মতামত অন্য সবার ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবে। কিন্তু সংখ্যায় বেশি হলেই যে তারা সঠিক, এমন কোনো কথা নেই। বিপদটা তৈরি হয় তখনই, যখন আমরা ধরে নিই— গণতন্ত্র মানেই সংখ্যাগরিষ্ঠের নিজেদের মতামত অন্যদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার অধিকার রয়েছে।
‘ফিয়র্ড’: পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও আইনি লড়াইয়ের গল্প
রক্ষণশীল মূল্যবোধে বিশ্বাস করে এক রোমানীয়-নরওয়েজীয় দম্পতি। তারা রোমানিয়া থেকে স্ত্রীর নিজ শহর নরওয়ের একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে ফিরে আসে। শহরটির বাসিন্দারা তুলনামূলকভাবে উদার ও প্রগতিশীল চিন্তাধারায় বিশ্বাসী। সেখানে বসবাস শুরু করার পর নানা প্রশ্ন ও সামাজিক পর্যবেক্ষণের মুখে পড়ে দম্পতি। গত মে মাসে কান চলচ্চিত্র উৎসবের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে প্রদর্শন শেষে প্রায় ১২ মিনিট ধরে দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে সিনেমাটির প্রশংসা করেন দর্শক। উৎসবের সর্বোচ্চ পুরস্কার স্বর্ণ পাম জিতে নেয় ‘ফিয়র্ড’। ৯৯তম অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডসে সেরা আন্তর্জাতিক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বিভাগে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য রোমানিয়ার পক্ষ থেকে নির্বাচিত হয়েছে সিনেমাটি।






