ছাদহীন রাতের গল্প থেকে ‘শেষম্লান’
- বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত উদ্যোগে নির্মিত হচ্ছে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘শেষম্লান’।

শেষস্নান চলচ্চিত্রের গল্পের আলোকে এআই ছবি
রাত গভীর হলে শহর ঘুমিয়ে পড়ে। ব্যস্ত সড়কের কোলাহল থেমে আসে, দোকানের ঝাঁপ নেমে যায়, একে একে নিভে যায় জানালার আলো। মানুষ ফিরে যায় আপন ঠিকানায়। কিন্তু শহরের ফুটপাত, রেলস্টেশন, বাসটার্মিনাল কিংবা কোনো এক অচেনা গলির পাশে তখনও জেগে থাকে কিছু শিশু। তাদের ঘরে ফেরার তাড়া নেই, কারণ তাদের অনেকেরই কোনো ঘর নেই। মাথার ওপর নেই নিরাপদ একটি ছাদ, ঘুমানোর জন্য নেই নির্দিষ্ট একটি বিছানা। খেলনা হাতে স্কুলে যাওয়ার বয়সে তাদের কারও হাতে উঠে আসে ফুল, কারও হাতে পানির বোতল, কেউবা মানুষের কাছে বাড়িয়ে দেয় সাহায্যের জন্য ছোট্ট একটি হাত।
দু’মুঠো খাবারের নিশ্চয়তা যেখানে প্রতিদিনের প্রশ্ন, সেখানে স্বপ্ন দেখাটাও যেন বিলাসিতা। অথচ এই শিশুগুলোরও স্বপ্ন আছে। কারও হয়তো ইচ্ছে ছিল স্কুলের পোশাক পরার, কারও স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে ডাক্তার হওয়ার, কেউ হয়তো শুধু চেয়েছিল এমন একটি ঘর, যেখানে বৃষ্টির রাতে পানি পড়বে না। কিন্তু জীবনের কঠিন বাস্তবতা তাদের শৈশবকে অনেক আগেই বড় করে দিয়েছে।
এই ছাদহীন রাত, ক্ষুধা, বেঁচে থাকার সংগ্রাম আর হারিয়ে যাওয়া শৈশবের আবহকে ঘিরেই নির্মিত হতে যাচ্ছে পূর্ণদৈর্ঘ্য অ্যাকশন-থ্রিলার চলচ্চিত্র ‘শেষম্লান’।
তবে ‘শেষস্নান’ সরাসরি কোনো বাস্তব ঘটনা বা নির্দিষ্ট কোনো পথশিশুর জীবনকাহিনি নয়। এটি একটি কাল্পনিক গল্প। সেই গল্পের ভেতর দিয়ে পথশিশুদের জীবন, তাদের সংগ্রাম, স্বপ্ন এবং তাদের চারপাশে থাকা এমন কিছু অদেখা বাস্তবতাকে তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে, যেগুলো প্রতিদিন আমাদের চোখের সামনে থেকেও অনেক সময় চোখের আড়ালেই থেকে যায়।
রহস্য, সংঘাত, বিপদ আর রুদ্ধশ্বাস ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাবে চলচ্চিত্রটির গল্প। কিন্তু সেই উত্তেজনার কেন্দ্রেও থাকবে সমাজের প্রান্তে পড়ে থাকা কিছু মানুষের জীবন। যারা শহরের রাস্তায় প্রতিদিন আমাদের পাশ দিয়ে হেঁটে যায়, অথচ তাদের গল্প খুব কমই আমাদের জীবনের গল্প হয়ে ওঠে।
‘শেষম্লান’ সেই গল্পটিকেই অন্যভাবে বলতে চায়।
চলচ্চিত্রটির আরেকটি বিশেষ দিক এর নির্মাণপ্রক্রিয়া। প্রচলিত প্রযোজনা কাঠামোর বাইরে দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত উদ্যোগে চলচ্চিত্রটি নির্মাণের চেষ্টা করা হচ্ছে। অভিনয়, চিত্রনাট্য, পরিচালনা, চিত্রগ্রহণ, সম্পাদনাসহ চলচ্চিত্র নির্মাণের বিভিন্ন বিভাগে যুক্ত হয়েছেন দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এবং খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট)সহ দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এই চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।
ভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের, ভিন্ন শহরের, ভিন্ন একাডেমিক পটভূমির এসব তরুণ এক জায়গায় এসে মিলেছেন একটি গল্পের কাছে। কেউ ক্যামেরার সামনে, কেউ ক্যামেরার পেছনে। কেউ লিখছেন, কেউ দৃশ্য ধারণ করছেন, কেউ সম্পাদনার টেবিলে বসছেন। প্রত্যেকের কাজ আলাদা হলেও তাদের স্বপ্নটি একই, নিজেদের সামর্থ্য দিয়ে একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করা।
চলচ্চিত্রটির পরিচালনা করছেন সৈয়দ বখতিয়ার। তার নেতৃত্বেই দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা চলচ্চিত্রটির নির্মাণকাজে যুক্ত হয়েছেন।
সৈয়দ বখতিয়ার বর্তমানে নরসিংদী টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে বিএসসি ইন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অ্যাপারেল ম্যানুফ্যাকচারিং বিভাগে অধ্যয়নরত। এর আগে তিনি টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি লেখালেখির সঙ্গেও যুক্ত তিনি। তার লেখা কবিতার বই ‘বিষণ্নতার গান’ এবং ছোট উপন্যাস ‘অন্ধকার’ প্রকাশিত হয়েছে।
চলচ্চিত্র নির্মাণের এই পথটি অবশ্য তার জন্য শুরু থেকেই মসৃণ ছিল না। ছিল নানা বাধা, সীমাবদ্ধতা এবং অনিশ্চয়তা। কিন্তু একটি স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা তাকে থামতে দেয়নি। পরে পাশে দাঁড়িয়েছেন বন্ধুরা। একে একে যুক্ত হয়েছেন অন্য তরুণরাও। ব্যক্তিগত একটি স্বপ্ন ধীরে ধীরে রূপ নিয়েছে একটি সম্মিলিত প্রয়াসে।
চলচ্চিত্রটি নিয়ে নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে পরিচালক সৈয়দ বখতিয়ার বলেন, ‘আমি এই সিনেমাটা নির্মাণের কাজ শুরু করতে পেরে অনেক খুশি। প্রথম দিকে অনেক বাধার সম্মুখীন হয়েছিলাম। পরে আমার বন্ধুরা আমাকে অনেক সাহায্য করেছে। আশা করি ভালো কিছু করতে পারব।’
একজন তরুণ নির্মাতার এই কথার ভেতরে বড় কোনো আয়োজনের গল্প নেই। আছে স্বপ্নের কথা, বাধা পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়ার কথা এবং বন্ধুদের হাত ধরে কিছু একটা করে দেখানোর প্রত্যয়।
‘শেষম্লান’ মূলত একটি অ্যাকশন-থ্রিলারধর্মী পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। কিন্তু এর গল্পের আবহে রয়েছে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত পথশিশুদের জীবন। যে শিশুটিকে প্রতিদিন ট্রাফিক সিগন্যালে গাড়ির কাচে কড়া নাড়তে দেখা যায়, যে শিশুটি ফুটপাতের এক কোণে রাত কাটায়, যে শিশুর শৈশব বই-খাতার চেয়ে ক্ষুধা আর বেঁচে থাকার সংগ্রামের সঙ্গে বেশি পরিচিত, তার জীবন আমাদের চোখের সামনে থাকলেও তার ভেতরের গল্পটি অজানাই থেকে যায়।
‘শেষম্লান’ সেই অজানা জায়গাটির দিকে তাকাতে চায়।
এখানে পথশিশুরা কেবল করুণার চরিত্র নয়। তাদের ঘিরে তৈরি হবে একটি রহস্যময় ও রুদ্ধশ্বাস ঘটনাপ্রবাহ। তাদের জীবন ও বাস্তবতার ভেতর দিয়েই এগিয়ে যাবে গল্প। ফলে দর্শক শুধু তাদের কষ্ট দেখবেন না, একটি কাল্পনিক থ্রিলার গল্পের মধ্য দিয়ে তাদের পৃথিবীর কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগও পাবেন।
একটি শিশুর হাতে কেন বইয়ের বদলে জীবিকার উপকরণ উঠে আসে, কেন কোনো কোনো শিশুর কাছে ফুটপাতই হয়ে ওঠে ঘর, কেন তার শৈশব অন্যদের চেয়ে অনেক আগেই শেষ হয়ে যায়, এসব প্রশ্ন সরাসরি উত্তর না দিয়েও হয়তো গল্পের ভেতর দিয়ে দর্শকের মনে তৈরি করতে চায় ‘শেষস্নান’।
চলচ্চিত্র নির্মাণের এই উদ্যোগে তাই গল্পের পাশাপাশি আরেকটি গল্পও তৈরি হচ্ছে। সেটি একদল তরুণের গল্প। যাদের কেউ হয়তো চলচ্চিত্র নির্মাণের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা নেননি, কেউ পেশাদার অভিনয়ের জগতের মানুষ নন, কেউ ক্যামেরা নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেননি। তবু নিজেদের আগ্রহ, পরিশ্রম ও সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে তারা একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের স্বপ্ন দেখছেন।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী যখন ক্যামেরা হাতে নেন, অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কেউ যখন অভিনয়ের প্রস্তুতি নেন, কেউ যখন রাত জেগে চিত্রনাট্য লেখেন, তখন সেখানে শুধু একটি সিনেমা তৈরির চেষ্টা থাকে না। থাকে নিজেদের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে নতুন কিছু করার আকাঙ্ক্ষাও।
‘শেষম্লান’ সেই আকাঙ্ক্ষারই একটি প্রতিচ্ছবি।
শহরের আলোয় আমরা প্রতিদিন অসংখ্য শিশুকে দেখি। কখনো তাদের দিকে তাকাই, কখনো পাশ কাটিয়ে চলে যাই। কিন্তু তাদের প্রত্যেকের জীবনের পেছনে যে আলাদা একটি গল্প আছে, সেই গল্প জানার সুযোগ আমাদের হয় না। কারও গল্পে হয়তো আছে পরিবার হারানোর বেদনা, কারও গল্পে দারিদ্র্য, কারও গল্পে প্রতারণা, আবার কারও গল্পে আছে এমন কোনো অন্ধকার অধ্যায়, যার কথা সে কাউকে বলতে পারে না।
‘শেষম্লান’ সেই অদেখা জগতের দরজা খুলতে চায় একটি কাল্পনিক গল্পের মাধ্যমে।
তাই এটি শুধু পথশিশুদের নিয়ে একটি চলচ্চিত্র নয়। এটি তাদের জীবনকে ঘিরে তৈরি হওয়া একটি রহস্যের গল্প, একটি থ্রিলারের গল্প, একই সঙ্গে কিছু তরুণের স্বপ্নকে পর্দায় তুলে ধরার গল্প।
যে শহরে রাত নামলে হাজারো জানালায় আলো জ্বলে ওঠে, সেই শহরের কোনো এক ফুটপাতে হয়তো তখনও ঘুমিয়ে থাকে একটি শিশু। তার মাথার ওপর আকাশ ছাড়া আর কোনো ছাদ নেই। আগামীকাল সে কী খাবে, কোথায় ঘুমাবে, আদৌ স্কুলে যেতে পারবে কি না, সে জানে না।
তবু সকাল হলে সে উঠে দাঁড়ায়।
আবার হাঁটে।
আবার বেঁচে থাকার চেষ্টা করে।
সেই শিশুর জীবনের অন্ধকারকে একটি কাল্পনিক, রুদ্ধশ্বাস গল্পের ভেতর দিয়ে পর্দায় নিয়ে আসার চেষ্টা করছে একদল তরুণ। তাদের হাতে হয়তো বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের শক্তি নেই, কিন্তু আছে গল্প বলার ইচ্ছা, আছে নিজেদের মতো করে কিছু করার সাহস।
আর সেই সাহস থেকেই জন্ম নিচ্ছে ‘শেষম্লান’।
একটি সিনেমা, যার গল্প কাল্পনিক। কিন্তু যে পৃথিবীকে ঘিরে গল্পটি তৈরি, সেই পৃথিবীর মানুষগুলো আমাদের খুব পরিচিত। তারা প্রতিদিন আমাদের শহরের রাস্তায় থাকে, আমাদের পাশ দিয়ে যায়, আমাদের চোখের সামনে বড় হয়। তাদের অনেকের শৈশব হারিয়ে যায় নীরবে।
হয়তো সেই নীরবতার মধ্যেই ‘শেষম্লান’ তার সবচেয়ে বড় গল্পটি খুঁজে নেবে।



