‘স্টার ট্রেক’ ও ‘এক্স-মেন’ অভিনেতা প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট আর নেই

প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট
‘স্টার ট্রেক’-এর ক্যাপ্টেন জিন-লুক পিকার্ড কিংবা ‘এক্স-মেন’-এর প্রফেসর চার্লস জেভিয়ার, আইকনিক সব চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের হৃদয় জয় করা কিংবদন্তি ব্রিটিশ অভিনেতা স্যার প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট আর নেই। দীর্ঘ দিন আলঝেইমার ও ডিমেনশিয়ার সঙ্গে লড়াই শেষে লস অ্যাঞ্জেলেসে নিজ বাসভবনে ৮৬ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
১৯৮০-র দশকে রয়্যাল শেক্সপিয়ার কোম্পানির হয়ে মঞ্চ কাঁপানো প্যাট্রিক যখন আমেরিকার পর্দায় আসেন, তখন তাকে কেউ চিনতই না। ‘স্টার ট্রেক’ সিরিজের নির্মাতা জিন রোডেনবেরি তো শুরুতে সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, কোনো টাক মাথার ব্রিটিশ অভিনেতাকে তিনি সিরিজের মূল মুখ করবেন না।
তবে অডিশনে শেক্সপীয়রীয় ভঙ্গিতে সংলাপ বলে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন স্টুয়ার্ট। শুরু হয়েছিল ‘নেক্সট জেনারেশন’-এর যাত্রা, যা পরবর্তীতে মহাকাশভিত্তিক সায়েন্স ফিকশনের ইতিহাসে এক মহাকাব্যিক অধ্যায়ে পরিণত হয়।
স্টার ট্রেক শেষ হওয়ার পর টাইপকাস্টিংয়ের ভয়ে থাকা স্টুয়ার্ট ২০০০ সালে হাত মেলান মার্ভেল কমিকসের সিনেমা ‘এক্স-মেন’-এর সঙ্গে। সেখানে হুইলচেয়ারে বসা অতিমানবীয় ক্ষমতাধর ‘প্রফেসর চার্লস জেভিয়ার’ চরিত্রে তার অভিনয় এক নতুন যুগের সূচনা করে।
দীর্ঘ দুই দশক ধরে ‘লোগান’, ‘ডক্টর স্ট্রেঞ্জ’সহ মোট ৮টি সিনেমায় তার এই চরিত্রটি কালজয়ী হয়ে থাকে। চলতি বছরেও ‘অ্যাভেঞ্জার্স: ডুমসডে’-তে ক্যামিও শুট করেছিলেন তিনি।
প্যাট্রিক স্টুয়ার্টের এই আকাশচুম্বী সাফল্যের পেছনে লুকিয়ে ছিল অত্যন্ত বেদনাময় এক শৈশব। ১৯৪০ সালের ১৩ জুলাই ইংল্যান্ডের ইয়র্কশায়ারের মিরফিল্ডে জন্মগ্রহণ করেন প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট। তার বাবা আলফ্রেড ছিলেন একজন সাধারণ শ্রমিক ও যুদ্ধফেরত সৈনিক। তিন ভাইয়ের মধ্যে প্যাট্রিক ছিলেন সবার ছোট। তার শৈশব ছিল বেশ ভীতিপ্রদ ও কঠিন। অতিরিক্ত মদ পানের পর বাবা প্রায়ই তার মায়ের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালাতেন।
যদিও তিনি সন্তানদের গায়ে হাত তুলতেন না, তবুও ছোট ছেলে হিসেবে প্যাট্রিকের মনে সবসময় আতঙ্ক কাজ করত এবং মায়ের ওপর নির্যাতন ঠেকাতে তিনি প্রায়ই বাবা ও মায়ের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াতেন।
পরবর্তী সময়ে প্যাট্রিক জানতে পারেন যে, যুদ্ধের ভয়াবহ স্মৃতি বা পিটিএসডি-এর কারণেই তার বাবা এমন হিংস্র আচরণ করতেন। এই কঠিন শৈশবের অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি পরবর্তীতে পারিবারিক নির্যাতন ও যুদ্ধফেরত সৈনিকদের পাশে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা পান।
ঘরের এই ভীতিপ্রদ পরিবেশ থেকে বাঁচতেই তিনি অভিনয়ের দুনিয়ায় আশ্রয় খুঁজে নেন। ২০০৯ সালে লেখা তার স্মৃতিকথা অনুযায়ী, বাড়ির বন্দিদশা থেকে পালিয়ে অন্য কোনো মানুষ, সময় বা জায়গায় হারিয়ে যাওয়ার জন্য নাটকের মঞ্চটি তার কাছে যেকোনো ঘরের চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ মনে হতো।
মাত্র ১৫ বছর বয়সে স্থানীয় একটি খবরের কাগজে কাজ শুরু করলেও প্যাট্রিক স্টুয়ার্টের মন সবসময় নাটকেই পড়ে থাকত। সম্পাদক যখন তাকে সাংবাদিকতা ও অভিনয়ের মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নিতে বলেন, তিনি তাৎক্ষণিকভাবে চাকরি ছেড়ে দেন।
এরপর আসবাবপত্রের দোকানে কাজ করার পাশাপাশি তিনি মাত্র ১৮ বছর বয়সে ব্রিস্টল ওল্ড ভিক থিয়েটার স্কুলে স্কলারশিপ পান এবং ২৬ বছর বয়সে রয়্যাল শেক্সপিয়ার কোম্পানির সদস্য হন।
আশির দশকে হলিউডে পা রেখে তিনি ‘এক্সক্যালিবার’ ও ‘ডিউন’-এর মতো সিনেমায় অভিনয় করেন। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ‘মোবি ডিক’, ‘দ্য লায়ন ইন উইন্টার’, ‘এক্সট্রাস’ এবং ‘ব্লান্ট টক’-এর মতো বৈচিত্র্যময় চরিত্রে কাজের সুবাদে তিনি বেশ কয়েকটি এমি ও গোল্ডেন গ্লোব মনোনয়ন লাভ করেন।
এছাড়া জনপ্রিয় অ্যানিমেটেড সিরিজ ‘আমেরিকান ড্যাড!’-এ কণ্ঠ দেওয়া ছাড়াও তিনি ২০১৯ সালের ‘চার্লিস অ্যাঞ্জেলস’ সিনেমা এবং বিভিন্ন জনপ্রিয় প্রজেক্টে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করে গেছেন।
২০০১ সালে রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের হাত থেকে ‘নাইটহুড’ প্রাপ্ত এই মহীরুহ অভিনেতার প্রয়াণে শোকস্তব্ধ পুরো হলিউড ও বিশ্ববিনোদন জগত। পর্দার ক্যাপ্টেন পিকার্ড হয়তো মহাকাশের বহুদূরে পাড়ি জমিয়েছেন, কিন্তু সায়েন্স ফিকশনের আকাশে তার তারাটি উজ্জ্বল হয়ে জ্বলবে চিরকাল।





