শরীরই যখন শ্রেষ্ঠ শিল্প

কিম কার্দাশিয়ান, কেন্ডাল জেনার, লিসা ও কাইলি জেনার
আধুনিক যুগের ধনীরা প্রদর্শন করতে ভালোবাসেন নিজেদের দামী পোশাক আর দামী শরীরকে সমানভাবে। মেট গালার এবারের প্রদর্শনী সুযোগ করে দিয়েছে এই দুই শখকে একসাথে মেটানোর জন্য। মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অফ আর্ট সংগ্রহ করেছে এই এক সন্ধ্যাতেই প্রায় ৪২ মিলিয়ন ডলারের রেকর্ড পরিমাণ অর্থ। আমাজন প্রধান জেফ বেজোস আর তার স্ত্রী লরেন সানচেজ দিয়েছেন প্রায় ১০ মিলিয়ন ডলারের বিশাল এক অনুদান। আন্না উইন্টুরের সেই বিশেষ তালিকায় জায়গা পেতে অতিথিরা লিখেছেন ১ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত মোটা অংকের চেক।
এবারের অনুষ্ঠানের মূল থিম ছিল ‘ফ্যাশনই হলো শিল্প’ নামের এক চমৎকার ভাবনা। তবে বিত্তশালীদের দুনিয়ায় নিয়মগুলো তৈরি হয় আসলে টাকার জোরেই। আন্না উইন্টুরের কড়া নির্দেশকে এই অভিজাত ভিড় বদলে নিয়েছে নিজেদের ইচ্ছা আর খেয়াল খুশি মতো। লাল গালিচার লড়াইটি ভাগ হয়ে গিয়েছিল শিল্পের ইতিহাস আর শরীরের আধুনিক প্রদর্শনীর মাঝে। শরীরকে যারা মাস্টারপিস মনে করেন, তারাই জমিয়ে দিয়েছেন এবারের আসরের সবটুকু রঙ।
কোন পক্ষটি বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে তা বুঝতে খুব একটা মাথা ঘামাতে হয় না। ভেতরের প্রদর্শনীর চেয়ে মানুষের বেশি আগ্রহ ছিল রেড কার্পেটের সেই উন্মুক্ত বক্ষ আর কঙ্কাল সারের পোশাকের ওপর। এবারের মেট গালা মনে করিয়ে দিচ্ছিল মাদাম তুসো জাদুঘরের সেই সাজানো গোছানো আর কৃত্রিম গ্ল্যামারের কথা। সস্তা প্রচারণার বাইরেও কিছু ডিজাইনার চেষ্টা করেছেন ফ্যাশন আর শিল্পের মেলবন্ধন ঘটাতে। বিশ্বখ্যাত সব চিত্রকর্মের সেই রঙগুলো জীবন্ত হয়ে ওঠে তারকাদের পরিহিত রাজকীয় সব পোশাকে।
বিয়ন্সে সেজেছিলেন পৃথিবীর সবথেকে গ্ল্যামারাস ‘কঙ্কাল’ হিসেবে নিজের শরীরকে হাড়ের আবরণে ঢেকে। ডিজাইনার অলিভিয়ার রুস্টেইং তৈরি করেছেন এই স্বচ্ছ পোশাকটি হাড়ের ওপর স্ফটিকের কারুকাজ দিয়ে। কার্দাশিয়ান পরিবারের কন্যারা মেতেছিলেন স্তনবৃন্ত প্রদর্শনের এক অদ্ভুত আর সাহসী খেলায়। কিম কার্দাশিয়ান পরেছিলেন চকচকে এক বক্ষবন্ধনী যা তৈরি করেছেন ব্রিটিশ শিল্পী অ্যালেন জোন্স। কাইলি জেনারের পোশাকটি মনে করিয়ে দিচ্ছিল ভেনাস ডি মাইলোর সেই প্রাচীন আর বিখ্যাত ভাস্কর্যের কথা।
পরাবাস্তব এই আসরে দেখা গেছে আরও অনেক বিচিত্র আর চোখ ধাঁধানো দৃশ্য। ব্ল্যাকপিঙ্ক ব্যান্ডের লিসা যোগ করেছেন নিজের পোশাকে থ্রি-ডি প্রযুক্তিতে তৈরি দুটি অতিরিক্ত হাত। ডিজাইনার রবার্ট উন এই হাত দুটি সাজিয়েছেন থাই নাচের চিরাচরিত আর সুন্দর এক ভঙ্গিমায়। র্যাপার স্কেপ্টা ফুটিয়ে তুলেছেন নিজের শরীরের ট্যাটুগুলো তার দামি স্যুটের ওপর এমব্রয়ডারি করে। একই আসরে হাজির ছিলেন তিনজন ‘মাদাম এক্স’ যারা অনুকরণ করেছেন জন সিঙ্গার সার্জেন্টের সেই বিখ্যাত চিত্রকর্মকে।
লরেন সানচেজ বেজোস পছন্দ করেছেন শিয়াপারেলি গাউন নিজের শরীরের ভাঁজগুলো দর্শকদের সামনে তুলে ধরতে। সমালোচকরা তার রুচি নিয়ে কথা বললেও তিনি ঠিকই বুঝিয়েছেন সেই বিতর্কিত চিত্রের আসল মাহাত্ম্য। সানচেজ যেমন তার বিলাসী বিয়ে দিয়ে সমাজকে চমকে দেন, এই পোশাকটিও ছিল তেমনি এক ঝলকানি। জুলিয়ান মুর আর ক্লেয়ার ফয়ও পরেছিলেন এমন পোশাক যার একদিকের ফিতা ঝুলে ছিল কাঁধের নিচে। তারা সবাই মিলে ফিরিয়ে এনেছেন সেই ১৯ শতকের সাহসী আর চর্চিত ফ্যাশনের স্মৃতি।
ভোগ সম্পাদক ক্লো ম্যাল ধারণ করেছেন ফ্রেডরিক লেইটনের ‘ফ্লেমিং জুন’ চিত্রের সেই আম-রঙা আভা। অ্যাঞ্জেলা ব্যাসেটও বেছে নিয়েছেন ১৯২৭ সালের ‘গার্ল ইন পিঙ্ক ড্রেস’ ছবির সেই গোলাপি রূপ। গ্রেসি আব্রামস সেজেছেন গুস্তাভ ক্লিমটের আঁকা সেই বিখ্যাত সোনালী প্রতিকৃতির আদলে। লিনা ডানহ্যাম পরেছেন ভ্যালেন্টিনোর তৈরি লাল পালকের এক রক্তিম আর নজরকাড়া পোশাক। এই লাল রঙটি তিনি নিয়েছেন ১৬২০ সালের এক বিভীষিকাময় চিত্রকর্মের ছিটকে আসা রক্তের দাগ থেকে। ম্যাডোনা পরেছেন এক ভুতুড়ে শিরস্ত্রাণ যা মনে করিয়ে দিচ্ছিল পরাবাস্তববাদী চিত্রশিল্পী লিওনোরা ক্যারিংটনের কথা।
টাকার জোরে টেক বিলিয়নেয়াররা মেট মিউজিয়ামের মতো জায়গায় জায়গা করে নেওয়ায় দেখা দিয়েছে এক ধরণের চাপা অস্বস্তি। টেক জগতের এই রাঘব বোয়ালরা অবশ্য রেড কার্পেটে ছিলেন কিছুটা আড়ালে আর শান্ত মেজাজে। গুগলের প্রতিষ্ঠাতা সের্গেই ব্রিন পরেছেন মানুষের মুখ আঁকা নীল রঙের এক সাদামাটা স্যুট। জেফ বেজোস এড়িয়ে গিয়েছেন রেড কার্পেটের সেই ভিড় আর সরাসরি ঢুকে পড়েছেন ভেতরে স্ত্রীর হাত ধরে। মার্ক জাকারবার্গ আর তার স্ত্রী প্রিসিলা চ্যানও প্রবেশ করেছেন খুব সাধারণভাবে সবার অলক্ষ্যে। তবে জাকারবার্গ দম্পতি বসেছিলেন আন্না উইন্টুরের সেই বিশেষ টেবিলে সবথেকে সম্মানিত অতিথি হিসেবে।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান






