এবারও কি ঢাকা ডোবাবে পলিথিন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বৃষ্টি আর জলজট; জাদুর শহর ঢাকায় এ দুটি যেন একে অন্যের পরিপূরক। প্রতিবছরই বর্ষা মৌসুমে ভোগান্তিতে পড়েন নাগরিকরা। আর তাদের সব রাগ গিয়ে পড়ে সিটি করপোরেশন কিংবা সরকারের ওপর। রাস্তায় জমে থাকা হাঁটুপানির ক্ষোভ তারা উগড়ে দেন ফেসবুকের পাতায় কিংবা গণমাধ্যমের মাইক্রোফোনের সামনে। কিন্তু একটু ঠান্ডা মাথায় ভাবলেই দেখা যেত, এই ভোগান্তিতে নাগরিকদের দায়ও কম নয়।
গত শনিবার (২ মে) ঢাকায় ১ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করেছিল আবহাওয়া অধিদপ্তর। আর এই বৃষ্টিতেই গেন্ডারিয়া, পুরান ঢাকা, বংশাল, আরামবাগ, শান্তিনগর, সায়েদাবাদ, শনির আখড়া, ধানমন্ডি, মালিবাগ, কারওয়ান বাজার, আগারগাঁও, ফার্মগেট, তেজগাঁও, মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় তৈরি হয় জলাবদ্ধতা।
সেদিন পুরান ঢাকার ধোলাইখাল হাজি আবদুল মজিদ লেন, নাসিরউদ্দিন সরদার লেন, জনসন রোড, বংশাল, গুলিস্তান, নিউ মার্কেট, নীলক্ষেত, কারওয়ান বাজারের রাস্তার দুই পাশের ম্যানহোল ও নর্দমায় জমে থাকতে দেখা গেল প্লাস্টিক ও পলিথিন বর্জ্য।
নীলক্ষেত মোড়ে একটি ম্যানহোল তুলনামূলক নিচু হওয়ায় সেটি দিয়ে ময়লা পানি উপচে রাস্তায় চলে আসছিল। পাশের ঢাকনার ভেতর দিয়ে কিছুক্ষণ পানি যাওয়ার পরই বন্ধ হয়ে তৈরি হলো জলাবদ্ধতা। কিছুক্ষণ পর এক পথচারী পা দিয়ে ঢাকনার মুখ থেকে সরিয়ে দিলেন পলিথিন, এরপর ফের ঠিক হলো পানিপ্রবাহ।
এই যে, যেখানে-সেখানে পলিথিন ফেলে দেওয়া, নির্দিষ্ট স্থানের বদলে পুরো শহরকে ডাস্টবিন বানিয়ে রাখা; এসবই তো নাগরিকদের অভ্যাস।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন প্রতিদিন প্রায় ৩০০০ থেকে ৩২০০ টন বর্জ্য সংগ্রহ করে। যার ১৫ শতাংশই প্লাস্টিক ও পলিথিন। অর্থাৎ প্রতিদিন অন্তত ৪৮০ টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয়, মাসের হিসাবে যা দাঁড়ায় ১৪ হাজার ৪০০ টনে। আর বছরে ১ লাখ ৭৫ হাজার ২০০ টন।
এটি শুধু ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের চিত্র। ঢাকা উত্তর সিটিতে এর চেয়েও বেশি বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়। দুই সিটি মিলিয়ে ঢাকায় প্রতিদিন গড়ে এক হাজার টন প্লাস্টিক-পলিথিন বর্জ্য উৎপন্ন হয়।
প্লাস্টিক তৈরি হয় জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায়। এর ভেতর ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করতে পারে না, ফলে এটি সহজে পচেও না। বাজারে বহুল ব্যবহৃত প্লাস্টিকের ব্যাগগুলো মাটিতে মিশতে সময় লাগে প্রায় ২০ বছর। চা, কফি ও কোমলপানীয় খাওয়ার ওয়ান টাইম কাপগুলো মিশতে সময় লাগে প্রায় ৫০ বছর আর প্লাস্টিকের বোতল মাটিতে মিশতে সময় নেয় ৪০০ বছর।
অথচ আমাদের দেশে দেদার পথে-ঘাটে-মাঠে-প্রান্তরে ফেলা হচ্ছে প্লাস্টিক। বিশেষ করে, রাস্তার ধারের খাবারের দোকান, চায়ের স্টলগুলোর সামনে তাকালে দেখা মিলবে স্তূপ করে রাখা প্লাস্টিকসামগ্রী। যেখানে আছে ওয়ান টাইম কাপ থেকে শুরু করে পাউরুটি-বিস্কুটের প্যাকেট, পানির বোতলসহ নানা কিছু।
নিউ মার্কেটের রাস্তার ধারে ফুটপাতগুলোর সামনে পড়ে থাকতে দেখা গেল মার্কেটে ব্যবহৃত পলিথিনের পুরোটাই। এসব পলিথিন ম্যানহোলের ঢাকনায় গিয়ে পানির প্রবাহ বন্ধ করে দিচ্ছে, সৃষ্টি করছে জলাবদ্ধতা।
সেখানেই কথা হলো ব্যাটারিচালিত রিকশাচালক মো. আশরাফ হোসেনের (৫৫) সঙ্গে। তিনি সায়েদাবাদ এলাকায় থাকেন। বৃষ্টি এলে গ্যারেজ থেকে রিকশা নিয়ে বের হতে ভয় পান তিনি। কারণ সামান্য বৃষ্টিতেই সেখানে পানি জমে। আর রিকশার ইঞ্জিনে পানি ঢুকলে থাকে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি।
আশরাফও বলছিলেন, সায়েদাবাদ এলাকার নর্দমা, ম্যানহোলগুলোর মুখে আটকে থাকে প্লাস্টিকের কাপ, পলিথিন ব্যাগসহ নানা সামগ্রী। স্থানীয়রা যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলেন, এমনকি তিনি নিজেও ফেলেন বলে স্বীকার করলেন। তার ভাষ্য, ‘রাস্তায় ময়লা ফেললে কেউ তো কিছু বলে না। সরকারের লোকজনও তো কোনো দিন বলে দেয় নাই, কোথায় ময়লা ফেলতে হবে।’
রিকশাচালক থেকে শুরু করে শিক্ষিত ব্যক্তি; কারও ভেতরেই এই সচেতনতা সৃষ্টি করা যায়নি। যার ফল বর্ষা এলেই জলজট আর ভোগান্তি। এবারও বর্ষা মৌসুম শুরু হতে না হতেই সেই একই সংকট সামনে এসেছে।
পরিস্থিতির কারণে প্লাস্টিক বর্জ্যের দিকে আলাদা করে নজর দিচ্ছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপক মাহবুবুর রহমান তালুকদার বললেন, ‘বিদেশি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে চুক্তি করে আমরা প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে পোশাক ও জ্বালানি তৈরির ব্যবস্থা করছি। সেই সঙ্গে প্রতি শুক্র ও শনিবার আমরা শহরের বিভিন্ন জায়গা সশরীরে পরিদর্শন করছি এবং সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে লিফলেট বিতরণ করছি।’
একা সিটি করপোরেশনের পক্ষে প্লাস্টিক বর্জ্যের কারণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা নিরসন সম্ভব নয় উল্লেখ করে নাগরিকদেরও সচেতন হতে বললেন তিনি।
২০০২ সালে দেশে প্রথমবারের মতো দেশে আইন করে পলিথিন নিষিদ্ধ করা হয়। এরপরও বেড়ে চলেছে পলিথিন ব্যবহার। যার ৮০ শতাংশই পুনর্ব্যবহার বা সংগ্রহ করা হয় না। যেগুলো রাস্তা থেকে নর্দমা হয়ে পৌঁছে যায় ডোবা, খাল আর নদীতে। সর্বশেষ এসব প্লাস্টিকের স্থান হয় সমুদ্রে।
পচনশীল ও প্লাস্টিক বর্জ্য আলাদাভাবে না ফেলায়, সব একসঙ্গে যাচ্ছে ভাগাড়ে। সূর্যের অতি বেগুনি রশ্মিতে সেই প্লাস্টিকের কণা ভেঙে তৈরি হচ্ছে আরও ক্ষুদ্র মাইক্রোপ্লাস্টিক, যা মানুষসহ সব প্রাণীর জন্যই ক্ষতিকর।
পরিবেশবিদ অধ্যাপক আকতার মাহমুদ বলেন, সিটি করপোরেশনের মতে, তারা ৭০ ভাগ বর্জ্য সংগ্রহ করতে পারে। অর্থাৎ বাকি ৩০ শতাংশ রয়ে যায়। সেগুলোই পরে রাস্তায় থেকে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করে এবং খাল, ডোবা ও নদীতে গিয়ে পড়ে। এই দায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকেরও।
নাগরিকরা যেন যেখানে-সেখানে প্লাস্টিক-পলিথিন না ফেলেন, সেদিকে তাদের সচেতন হতে হবে; যোগ করলেন তিনি। তা না হলে, বর্ষা এলেই ডুববে ঢাকা, ভোগান্তিতে পড়বে সাধারণ মানুষ।


