হামে বাড়ছে শিশুমৃত্যু, দায়টা কে নেবে?
- ২৪ ঘণ্টায় আরও ৬ প্রাণহানি
- মোট মৃত্যু দাঁড়াল ৩১৭
- এই রোগ ছড়িয়েছে ১০ দেশে
- টিকা পেয়েছে ১ কোটি ৬১ লাখ শিশু

সংগৃহীত ছবি
মাত্র তিন বছরের শিশু। কয়েক দিন আগেও উঠান জুড়ে খেলত, হাসিতে ভরিয়ে রাখত ঘর। হঠাৎ জ্বর, এরপর শরীরে ফুসকুড়ি— পরিবার ভেবেছিল সাধারণ অসুখ। কিন্তু সেটিই ছিল হাম। কয়েক দিনের ব্যবধানে নিভে গেল একটি প্রাণ। এমন গল্প এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়। দেশের বিভিন্ন হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে সন্তানের জন্য মায়ের কান্না যেন প্রতিদিনের দৃশ্য। মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে। প্রশ্ন উঠছে, এই মৃত্যুর দায় কার?
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামে এই ক্রমবর্ধমান শিশুমৃত্যুর দায় একক কারও নয়। অভিভাবকের অজ্ঞতা, দেরিতে চিকিৎসা নেওয়া ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন সরকার ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনা বন্ধ করে দেওয়া— এই সমন্বিত ব্যর্থতাই আজ প্রাণ কাড়ছে শিশুদের। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভয়াবহ হতে পারে পরিস্থিতি— আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে ৪২ হাজার ৯৭৯ শিশুর মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা গেছে। এর মধ্যে ২৯ হাজার ৮৩১ শিশুকে ভর্তি করতে হয়েছে হাসপাতালে। চিকিৎসা নিয়ে ২৬ হাজার ৩৬৮ শিশু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও, ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি। ল্যাব পরীক্ষায় ৫ হাজার ৭২৬ শিশুর শরীরে শনাক্ত হয়েছে হাম। এরই মধ্যে হামে ও এই রোগের উপসর্গে মৃত্যু হয়েছে ৩১৭ শিশুর।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো— গত ২৪ ঘণ্টায় (সোমবার সকাল ৮টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) আরও ছয় শিশুর মৃত্যু। এর মধ্যে দুজন হামে, অন্যদের শরীরে ছিল উপসর্গ।
এদিকে টিকাদান ক্যাম্পেইনের সর্বশেষ আপডেট অনুযায়ী, দেশে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ কোটি ৮০ লক্ষাধিক শিশু। টিকা পেয়েছে ১ কোটি ৬১ লাখ।
বিভাগভিত্তিক হিসাবে রাজশাহী, রংপুর ও ঢাকায় ৯০ শতাংশের বেশি কাভারেজ পাওয়া গেছে, তবে চট্টগ্রাম তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে। সিটি করপোরেশন পর্যায়ে কুমিল্লা ও ঢাকা দক্ষিণে উচ্চ কাভারেজ থাকলেও সিলেট ও চট্টগ্রামে কম। ডিএইচআইএসটু ও ডিজিএইচএসের তথ্য অনুযায়ী ক্যাম্পেইনটি মোটামুটি সফল হলেও কিছু এলাকায় আরও উন্নতি করা প্রয়োজন।
গোপালগঞ্জ থেকে তিন মাসের শিশু নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন আসা সাজিদুর রহমান। তার কণ্ঠে আতঙ্ক ও অনুশোচনা, ‘প্রথমে ঠান্ডা ভেবেছিলাম। বুঝতে পারিনি এত দ্রুত অবস্থা খারাপ হবে।’
আগে কেন হাসপাতালে আনেননি— এমন প্রশ্নে তিনি জানালেন, এটা যে হাম হতে পারে, সে বিষয়ে ধারণাই ছিল না তাদের।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অজ্ঞতা ও দেরিই অনেক ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে। হামের উপসর্গ দেখা দেওয়ার পরও অনেক অভিভাবক শুরুতে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন না। ফলে হাসপাতালে আসতে দেরি হয়, চিকিৎসাও পান দেরিতে। একই সঙ্গে পরিস্থিতি জটিল করছে স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা। রোগীর তুলনায় অনেক হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স ও শয্যার অভাব। এতে প্রয়োজনীয় সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতালগুলোকে, বাড়ছে সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি।
বিশেষ ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরলেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ইকবাল। তার পরামর্শ, পারিবারিক সচেতনতা বাড়তে হবে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতাও নিরসন প্রয়োজন। জেলাপর্যায়ের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোয় হামের জন্য আলাদা ওয়ার্ড জরুরি।
এসব ব্যবস্থা থাকলে রোগীদের বিভাগীয় শহরে ছুটতে হবে না। দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করাও সম্ভব। পাশাপাশি রোগীর সংখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দক্ষ জনবল নিয়োগও প্রয়োজন- গুরুত্ব বোঝালেন তিনি।
বাংলাদেশের মতোই বিশ্ব জুড়ে ঘটছে হামের বিস্তার। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ছয় মাসে ভারতে ১৫ হাজার ৭৫০, ইয়েমেনে ১১ হাজার ৮৫ এবং পাকিস্তানে ৮ হাজার ৭২১ জন এই রোগে আক্রান্ত হয়েছে। যদিও গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত হামের প্রাদুর্ভাবে শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় বাংলাদেশ ছিল না। তবুও বর্তমান পরিস্থিতি বলছে- এখনো ঝুঁকির বাইরে নয়।
সরকার হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক হালিমুর রশীদ। আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে- তার আশা।
তবে কেবল আশ্বাসে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। টিকাদান জোরদার, গ্রামপর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানোর দাবি জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের।



