সংলাপ নেই, তবু দর্শকের হৃদয়ে ‘মকবুল’, ‘মাস্তুল’ প্রিমিয়ারে বাবুর প্রশংসা

ছবি: আগামীর সময়
দেশের দর্শকদের সামনে এলো মোহাম্মদ নূরুজ্জামান পরিচালিত চলচ্চিত্র ‘মাস্তুল’। আগামী শুক্রবার দেশব্যাপী মুক্তির আগে গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ধানমন্ডির রাশিয়ান কালচারাল সেন্টারে অনুষ্ঠিত হলো সিনেমাটির বিশেষ প্রদর্শনী। সেখানে উপস্থিত ছিলেন দেশের চলচ্চিত্র, সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনের বিশিষ্টজনেরা।
অনুষ্ঠানের শুরুতে ‘মাস্তুল’-এর দীর্ঘ যাত্রা তুলে ধরে একটি বিশেষ প্রমো প্রদর্শন করা হয়। প্রমোতে নির্মাতা মোহাম্মদ নূরুজ্জামানের প্রথম চলচ্চিত্র ‘আম কাঁঠালের ছুটি’ থেকে শুরু করে ‘মাস্তুল’-এর নির্মাণ যাত্রা তুলে ধরা হয়।
কবি ও নির্মাতা জুয়েইরিযাহ মউয়ের সঞ্চালনায় ‘মাস্তুল’-এর মস্কো যাত্রা নিয়ে আরো একটি বিশেষ প্রমো দেখানো হয়। ৪৭তম মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ‘মাস্তুল’-এর অংশগ্রহণের স্মৃতি। উৎসবের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে জায়গা করে নেওয়া ছবিটি সেখানে ‘স্পেশাল মেনশন’ সম্মাননা অর্জন করে।
বিশেষ প্রদর্শনীর মঞ্চে ডেকে আনা হয় ছবির নির্মাতা, অভিনয়শিল্পী ও কলাকুশলীদের। এ সময় দর্শকদের উদ্দেশে নূরুজ্জামান বলেন, “সিনেমা শুরুর আগে আসলে কথা বলার কিছু নেই। আমাদের যা বলার, তা সিনেমায় বলেছি। আপনারা সিনেমাটি দেখুন। যদি কোনো প্রশ্ন বা কৌতূহল থাকে, সিনেমা শেষে আমরা সেগুলোর উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব।”
সন্ধ্যা পৌনে ৭টায় শুরু হয় ছবিটির প্রদর্শনী। বিশেষ প্রদর্শনীতে উপস্থিত ছিলেন ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’খ্যাত নির্মাতা মসীহউদ্দিন শাকের, কথাসাহিত্যিক শাহীন আখতার, নির্মাতা কামার আহমাদ সাইমন, সারা আফরীন, শাহীন দিল রিয়াজ, এন রাশেদ চৌধুরী, আকরাম খান, চিত্রগ্রাহক রাশেদ জামান, নির্মাতা হুমায়রা বিলকিস, শবনম ফেরদৌসী, কাইউম চৌধুরী, কবি ও গদ্যকার ফরিদ কবীর, সাংবাদিক খায়রুল বাশার শামীম, গল্পকার মোজাফফর আহমেদ, কবি স্নিগ্ধাবাউলসহ চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতি অঙ্গনের বহু পরিচিত মুখ।
বিশেষ প্রদর্শনী শেষে কৌতূহলী দর্শকের করা প্রশ্নে নিজের চরিত্র নিয়ে কথা বলেন অভিনেতা ফজলুর রহমান বাবু। সিনেমায় তিনি অভিনয় করেছেন জ্বালানিবাহী তেলের ট্যাংকারের বৃদ্ধ পাচক মকবুল চরিত্রে। ছবিতে তার কোনো সংলাপ নেই। তবে এ বিষয়টিকে কখনোই সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখেননি বলে জানান এই অভিনেতা।
তিনি বলেন, “সিনেমায় আমাদের কিছু অভিনেতা-অভিনেত্রী আছেন, যারা স্ক্রিপ্ট পেলে আগে দেখেন কয়টা সংলাপ আছে। কিন্তু থিয়েটার থেকে আমরা যারা এসেছি, আমরা কখনো সেটা করি না। অভিনয় শুধু সংলাপ নয়, এটি অ্যাকশন এবং রিঅ্যাকশন। আমার চরিত্রটির মনস্তাত্ত্বিক যাত্রা কেমন, সেটাই আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”
তিনি বলেছেন, “সবাইকে অনুরোধ করব পরিবার নিয়ে হলে এসে ‘মাস্তুল’ দেখুন। সিনেমাটি দেখে অন্তত একটি গল্প সঙ্গে নিয়ে ফিরবেন।
এসময় ‘মাস্তুল’-এ চরিত্র বাছাই নিয়েও দর্শকের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন নির্মাতা মোহাম্মদ নূরুজ্জামান। তিনি বলেন,“আমার কাস্টিং ফিলোসফি খুবই সহজ। আমার কল্পনার চরিত্রটির সঙ্গে যখন কোনো অভিনেতার অবয়ব মিলে যায়, তখন তাকেই নির্বাচন করি। ‘মাস্তুল’-এ সবচেয়ে বেশি অডিশন দিতে হয়েছে ‘সুকানি’ চরিত্রটির জন্য। অনেক পরিচিত অভিনেতা এই চরিত্রের দৌড়ে ছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত দীপক সুমনকে বেছে নিয়েছি। তার কাজের কোনো তুলনা নেই।”
নিজের চলচ্চিত্র ভাবনা প্রসঙ্গে নুরুজ্জামান বলেছেন, “আমি যে সিনেমা দেখতে চাই, সেটাই বানাতে চাই। আমি বিশ্বাস করি, এই ধরনের সিনেমা দেখার মতো দর্শক বাংলাদেশে আছে। হয়তো সংখ্যায় খুব বেশি নয়, তবে সেই দর্শক প্রতিনিয়ত বাড়ছে।”
সিনেমা দেখার পর এক দর্শক ‘মাস্তুল’ টিমকে মঞ্চে দেখে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। অন্য একজন অভিনেতা দীপক সুমনকে দেখিয়ে মন্তব্য করেন,“সিনেমাটা দেখা শেষে যখন মঞ্চে দেখলাম, আমার স্রেফ ঘৃণা হলো। উনাকে আমার মারতে ইচ্ছে হলো।”
সুকানি চরিত্রে মন্দ মানুষের চরিত্রে অভিনয় করেছেন দীপক সুমন। দর্শকের এমন মন্তব্য শুনে তিনি ওই দর্শকের উদ্দেশে বলেন,“এটাই আমার চরিত্রের সার্থকতা। তবে পর্দার বাইরে আমি বোধহয় এতোটা মন্দ মানুষ না।” এসময় হলজুড়ে হাসির রোল উঠে!
পরে সিনেমার নির্মাণশৈলী ও বিষয়বস্তুর প্রশংসা করেন বরেণ্য নির্মাতা মসীহউদ্দিন শাকের। তিনি বলেন, “পুরো সিনেমাটি আমার খুব ভালো লেগেছে। দেখতে অনেকটা প্রামাণ্যচিত্রের মতো মনে হলেও এর ভেতরে অসাধারণ একটি গল্প রয়েছে। বিশেষ করে নদী ও বন্দরকেন্দ্রিক যে জীবনচিত্র এখানে উঠে এসেছে, তা আমাদের অনেকের কাছেই অচেনা। এমন ভিন্নধর্মী বিষয় নিয়ে কাজ করার জন্য পরিচালককে ধন্যবাদ।” নির্মাতা হুমায়রা বিলকিস ও শাহীন দিল রিয়াজও সিনেমাটির প্রশংসা করেন।
‘মাস্তুল’-এর গল্প আবর্তিত হয়েছে একটি জ্বালানিবাহী তেলের ট্যাংকারের বৃদ্ধ পাচক মকবুল এবং বন্দর এলাকার পথশিশু নূরাকে ঘিরে। তাদের সম্পর্কের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে নদী ও বন্দরনির্ভর প্রান্তিক মানুষের জীবন, একাকীত্ব, স্নেহ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং টিকে থাকার সংগ্রাম। সিনেমায় আরও অভিনয় করেছেন দীপক সুমন, আমিনুর রহমান মুকুল, আরিফ হাসানসহ অনেকে।
‘সিনেমাকার’ প্রযোজিত ‘মাস্তুল’-এর ডিজিটাল ডিস্ট্রিবিউশন ও প্রচারণায় রয়েছে টঙঘর টকিজ, ওটিটি ও টেলিভিশন পার্টনার হিসেবে আছে আইস্ক্রিন ও চ্যানেল আই। সিনেমাটোগ্রাফি করেছেন মোহাম্মদ আরিফুজ্জামান, শিল্প নির্দেশনায় হুসনাইন লিঙ্কন, সংগীতে চৈতন্য রাজবংশী এবং কাস্টিং ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করেছেন যুবরাজ শামীম। প্রচারণার গানের সংগীত পরিচালনা করেছেন লাবিক কামাল গৌরব।






