বিনোদনের মাঠে ব্যর্থ হ্যারি-মেগান

প্রিন্স হ্যারি ও মেগান মার্কেল। ছবি: নেটফ্লিক্স
২০২০ সালে বড় স্বপ্ন নিয়ে প্রিন্স হ্যারি ও মেগান মার্কেল প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান আর্চেওয়েল প্রোডাকশনস প্রতিষ্ঠা করেন। লক্ষ্য ছিল সিনেমা, ডকুমেন্টারি ও সিরিজ তৈরি করে একটি শক্তিশালী কনটেন্ট সাম্রাজ্য গড়ে তোলা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই লক্ষ্য যেন ফিকে হয়ে গেছে। গত প্রায় দেড় বছরে প্রতিষ্ঠানটি মূলত মেগান মার্কেলের লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড ‘অ্যাজ এভার’-এর প্রচারণার প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে।
সম্প্রতি নেটফ্লিক্স ‘অ্যাজ এভার’ ব্র্যান্ড থেকে বিনিয়োগ তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এ ঘটনাই নতুন করে জল্পনার আগুন জ্বালিয়েছে, নেটফ্লিক্সের সঙ্গে এ জুটির সম্পর্ক কি ভেঙে যাচ্ছে? হলিউডের একাধিক সূত্র বলছে, এই সম্পর্ক কখনোই ততটা মসৃণ ছিল না, যতটা বাইরে থেকে মনে হয়েছে। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুই পক্ষের মধ্যে দূরত্বই বেড়েছে।
নেটফ্লিক্সের ভেতরের কিছু সূত্রের দাবি, হ্যারি ও মেগান বারবার রাজপরিবার ছেড়ে আসার একই গল্পকে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন, যা ধীরে ধীরে ক্লান্তিকর হয়ে উঠেছে। দর্শকদের আগ্রহ ধরে রাখার বদলে, এই পুনরাবৃত্তি নেটফ্লিক্সের ভেতরে বিরক্তি তৈরি করেছে। বিশেষ করে ‘উইথ লাভ, মেগান’-এর মতো লাইফস্টাইল শো প্রত্যাশা অনুযায়ী সাড়া ফেলতে পারেনি। যদিও অফিসিয়ালি বলা হচ্ছে, এটি অন্য লাইফস্টাইল কনটেন্টের মতোই পারফর্ম করেছে, কিন্তু ভেতরের ফলাফল ভিন্ন।
এই প্রেক্ষাপটে নেটফ্লিক্সের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মনোভাব নিয়েও নানা কথা শোনা যাচ্ছে। সহ-প্রধান নির্বাহী টেড সারান্ডোস এবং প্রধান কনটেন্ট কর্মকর্তা বেলা বাজারিয়া বিষয়টি নিয়ে খুব বিরক্ত বলে শোনা যাচ্ছে। যদিও নেটফ্লিক্স এসব তথ্যকে পুরোপুরি অস্বীকার করেছে এবং বলেছে, হ্যারি ও মেগানের সঙ্গে তাদের কাজের সম্পর্ক এখনো ইতিবাচক।
এই সম্পর্কের শুরু হয়েছিল বেশ প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে। যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসার পর, এই দম্পতি ডিজনি, অ্যাপল, ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভারিসহ বড় বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত নেটফ্লিক্স তাদের সঙ্গে একটি বহুল আলোচিত চুক্তি করে, যার মূল্য আনুমানিক ছয় কোটি ডলার বলে জানা যায়।
তাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য আসে ডকুসিরিজ ‘হ্যারি অ্যান্ড মেগান’–এর মাধ্যমে। এই সিরিজটি মুক্তির পরপরই ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা পায় এবং নেটফ্লিক্সের ইতিহাসে অন্যতম সফল ডকুমেন্টারি হিসেবে জায়গা করে নেয়। কিন্তু সেই সাফল্য স্থায়ী হয়নি। পরবর্তী প্রজেক্টগুলো সেই উচ্চতা ছুঁতে পারেনি।
এর মধ্যে ঘটে যায় আরও কিছু ঘটনা, যা নেটফ্লিক্সের সঙ্গে সম্পর্ককে জটিল করে তোলে। দ্য অপরা উইনফ্রে ইন্টারভিউতে দেওয়া তাদের বিস্ফোরক সাক্ষাৎকার কিংবা প্রিন্স হ্যারির আত্মজীবনী ‘স্পেয়ার’ প্রকাশ— এসব ক্ষেত্রে নেটফ্লিক্সের সঙ্গে যথাযথ সমন্বয় হয়নি বলে অভিযোগ ওঠে। এতে করে কোম্পানির ভেতরে অসন্তোষ তৈরি হয়।
শুধু নেটফ্লিক্স নয়, অন্যান্য প্ল্যাটফর্মেও তাদের যাত্রা খুব একটা সফল হয়নি। স্পটিফাইয়ের সঙ্গে চুক্তি করেও তারা মাত্র একটি সিরিজ তৈরি করে আলাদা হয়ে যায়। এমনকি স্পটিফাইয়ের নির্বাহী বিল সিমন্স প্রকাশ্যে তাদের সমালোচনা করে বিতর্ক তৈরি করেন। এসব মন্তব্য ধীরে ধীরে হলিউডে তাদের ভাবমূর্তিকে প্রভাবিত করতে শুরু করে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বড় নির্মাতা ও তারকারাও তাদের সঙ্গে কাজ করতে অনাগ্রহী হয়ে ওঠেন। পরিকল্পিত অনেক প্রজেক্ট বাতিল হয়ে যায়। বিশেষ করে অ্যানিমেটেড সিরিজ ‘পার্ল’ বাতিল হওয়া ছিল বড় ধাক্কা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নেটফ্লিক্সে প্রায় ছয় বছর থাকার পরও তারা একটি সফল স্ক্রিপ্টেড সিরিজ বা চলচ্চিত্র তৈরি করতে পারেননি।
পরিস্থিতি বদলাতে ২০২৪ সালে তাদের চুক্তির ধরন পরিবর্তন করা হয়। এক্সক্লুসিভ চুক্তির বদলে ‘ফার্স্ট-লুক ডিল’ করা হয়, যার ফলে নেটফ্লিক্সের ওপর নির্ভরতা কমে যায়। একই সময় মেগান তার লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড ‘অ্যাজ এভার’–এ বেশি মনোযোগ দেন। নেটফ্লিক্সও এই ব্র্যান্ডে বিনিয়োগ করে নতুন ধরনের ব্যবসায়িক মডেল পরীক্ষা করতে চেয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই পরীক্ষাও সফল হয়নি।
বর্তমানে আর্চেওয়েল প্রোডাকশনসের কিছু প্রজেক্ট প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, যেমন জনপ্রিয় উপন্যাস অবলম্বনে নতুন সিনেমা তৈরির পরিকল্পনা। তবে সামগ্রিকভাবে চিত্রটি খুব আশাব্যঞ্জক নয়। অনিয়মিত কনটেন্ট, বারবার কৌশল পরিবর্তন এবং হলিউডে কমতে থাকা প্রভাব হ্যারি ও মেগানকে বিনোদন অঙ্গন থেকে যেন দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
সূত্র: ভ্যারাইটি




