এইচএসসির আগেই ঝরে যাচ্ছে প্রতি চার শিক্ষার্থীর একজন

সংগৃহীত ছবি
টানা ১০-১২ বছর পড়াশোনা। পাবলিক পরীক্ষার জন্য নিবন্ধনও সম্পন্ন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত পরীক্ষার হলে আর দেখা মেলে না লাখো শিক্ষার্থীর। এসএসসি পাস করেও অনেকে পৌঁছাতে পারছে না এইচএসসির গণ্ডিতে। গত এক দশকের চিত্র বলছে, এইচএসসি পরীক্ষার আগেই গড়ে প্রতি চার শিক্ষার্থীর একজন শিক্ষার মূলধারা থেকে ছিটকে যাচ্ছে। আর চলতি বছর এসএসসি পাস করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৪৩ শতাংশই এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়নি।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল ১৬ লাখ ৭২ হাজার ১৫৩ শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে মাত্র ৯ লাখ ৪৭ হাজার ৯৪৩ জন। অর্থাৎ দুই বছরে শিক্ষার মূলধারা থেকে ছিটকে গেছে ৭ লাখ ২৪ হাজার ২১০ শিক্ষার্থী, যা মোট উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর ৪৩ দশমিক ৩১ শতাংশ।
আরও উদ্বেগজনক তথ্য হলো, ২০১৭ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে এইচএসসি পরীক্ষার জন্য নিবন্ধিত ১ কোটি ৪৫ লাখ ১১ হাজার ৪৩ শিক্ষার্থীর মধ্যে চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নেয়নি ৩৬ লাখ ৪০ হাজার ৯৮৫ জন। গড়ে ঝরে পড়ার হার ২৫ দশমিক ৯ শতাংশ। চলতি বছর এই হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬ শতাংশে, যা এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ।
এটি শুধু এইচএসসির চিত্র নয়। নবম থেকে এসএসসি এবং প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক—সব স্তরেই একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তাই শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার প্রকৃত কারণ জানতে দেশব্যাপী অনুসন্ধানী জরিপ ও গবেষণায় নামছে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড। বাংলাদেশ পরীক্ষা উন্নয়ন ইউনিটের (বেডু) মাধ্যমে ঝরে পড়ার কারণ, এর প্রভাব এবং প্রতিরোধে করণীয় নিয়ে সরকারের কাছে সুপারিশ দেওয়া হবে।
জরিপসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এতদিন শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার প্রধান কারণ হিসেবে আর্থিক অসচ্ছলতাকে দায়ী করা হলেও সাম্প্রতিক সময়ের তথ্য ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। ২০২৫ সালে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের একটি পাইলট জরিপে দেখা যায়, এসএসসি পরীক্ষায় অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের ৪২ শতাংশের পড়াশোনা বন্ধ হয়েছে বাল্যবিয়ের কারণে। তাদের ৯৭ শতাংশই মেয়ে। এ ছাড়া পারিবারিক অসচ্ছলতা, জীবিকার প্রয়োজনে কাজে যুক্ত হওয়া এবং অন্যান্য কারণও রয়েছে। এই জরিপের ভিত্তিতেই এবার জাতীয় পর্যায়ে অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার আগামীর সময়কে বললেন, ‘১০-১২ বছর পড়াশোনা করার পর এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর পরীক্ষা থেকে হারিয়ে যাওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এ বিষয়ে আগে কখনো জাতীয় পর্যায়ে অনুসন্ধান হয়নি। প্রকৃত কারণ বের করে ঝরে পড়া কমাতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত, সে বিষয়ে সরকারের কাছে সুপারিশ পাঠানো হবে।’
আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত এইচএসসি পরীক্ষার নিবন্ধন করেও ৩৬ লাখ ৪০ হাজার ৯৮৫ শিক্ষার্থী চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। ১০ বছরে নিবন্ধিত ১ কোটি ৪৫ লাখ ১১ হাজার ৪৩ শিক্ষার্থীর মধ্যে গড়ে ২৫ দশমিক ৯ শতাংশ ঝরে পড়েছে। চলতি বছরে এ হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬ শতাংশে, যা এক দশকের সর্বোচ্চ।
চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা ২০১৮ সালে প্রাথমিক সমাপনী (পিইসি) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল। ওই বছর ২৬ লাখ ৫২ হাজার ৬০৯ শিক্ষার্থী পাস করলেও এবার এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে ১২ লাখ ৬৭ হাজার ৪৮৬ জন। অর্থাৎ আট বছরের শিক্ষাযাত্রায় ঝরে গেছে ১৩ লাখ ৮৫ হাজার ১২৩ শিক্ষার্থী, যা মোট উত্তীর্ণের ৫২ দশমিক ২২ শতাংশ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক মজিবুর রহমানের মতে, ঝরে পড়ার কারণ শুধু বাল্যবিয়ে বা আর্থিক সংকট নয়। বিদ্যালয়ে মানসম্মত শিক্ষার অভাব, শিক্ষক সংকট ও শিখন ঘাটতিও এর জন্য দায়ী। তিনি বললেন, ‘শিক্ষার্থীদের ট্র্যাক করতে নেওয়া ‘ইউনিক আইডি’ প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়ায় ঝরে পড়ার প্রকৃত কারণ এখনো নির্ভুলভাবে জানা যাচ্ছে না।’
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের ২০২৫ সালের একটি পাইলট জরিপে দেখা যায়, এসএসসি পরীক্ষায় অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের ৪২ শতাংশের পড়াশোনা বন্ধ হয়েছে বাল্যবিয়ের কারণে। তাদের ৯৭ শতাংশই মেয়ে। মানবিক বিভাগে ঝরেপড়ার হার সবচেয়ে বেশি, ৬৮ শতাংশ। জরিপে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের অর্ধেকের বেশি জানিয়েছেন, তারা আর পড়াশোনা করবেন না।
তবে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বললেন, ‘নিবন্ধিত সব শিক্ষার্থীই ঝরে পড়ে না। অনেকে ব্যক্তিগত বা একাডেমিক কারণে এক বছর বিরতি দিয়ে পরের বছর পরীক্ষায় অংশ নেন।’
অন্যদিকে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমেদ এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর শিক্ষা থেকে ছিটকে পড়াকে দেশের জন্য ‘অশনিসংকেত’ বলে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, এ প্রবণতা রোধে সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার ও সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।






