এইচএসসিতে পাস না করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ছে কেন
- গত বছর শূন্যপাস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ২০২টি
- এবার শূন্যপাস প্রতিষ্ঠান বেড়েছে ৯১টি

ফাইল ছবি
২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় শতভাগ ফেলের রেকর্ড গড়েছে দেশের ২৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর ১৮১টি, মাদ্রাসা বোর্ডের ৫৫টি ও কারিগরি বোর্ডের প্রতিষ্ঠান আছে ৫৭টি। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় তিন হাজার শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের।
আজ শনিবার ফল প্রকাশের পর ২৯৩টি প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী পাস না করার নেপথ্য নিয়ে চলছে আলোচনা। কেউ কেউ বলছেন, শূন্যপাস প্রতিষ্ঠান বেড়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে একক কোনো কিছুকে দায়ী করা যায় না। এর পেছনে বেশ কিছু কারণ আছে। এক্ষেত্রে নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক সংকট, প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, ইংরেজি ও আইসিটি ভীতিসহ নানাবিধ কারণ আছে।
সাধারণ বোর্ডগুলোর মধ্যে শূন্যপাশ প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি দিনাজপুরে ৪৯টি। আর সবচেয়ে কম চট্টগ্রাম ও সিলেটে, ৩টি করে। এছাড়া, ঢাকা বোর্ডে ২৬টি, রাজশাহীতে ৩৯টি, কুমিল্লায় ১৫টি, যশোরে ১৬টি, বরিশালে ১১টি, ময়মনসিংহে ১৯টি, মাদ্রাসা ৫৫টি এবং কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের ৫৭টি প্রতিষ্ঠান থেকে কেউ পাস করেননি। গত বছর শূন্যপাস না করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল ২০২টি। সেই হিসাবে এবার শূন্যপাস প্রতিষ্ঠান বেড়েছে ৯১টি।
দিনাজপুর বোর্ডে কেউ পাস না করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেশি কুড়িগ্রামে। জেলার ৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কোনো শিক্ষার্থীই পাস করেননি। এর মধ্যে রৌমারী উপজেলার চর শৌলমারী আদর্শ মহিলা কলেজ থেকে ২৪ জন, নাগেশ্বরী উপজেলার নাগেশ্বরী মডেল কলেজ থেকে ১৫ জন, রাজারহাট উপজেলার সিঙ্গার ডাবরীহাট কলেজ থেকে ১০ জন, একই উপজেলার সিঙ্গার ডাবরীর হাট বি. এল. হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে ৬ জন, নাগেশ্বরী উপজেলার কুটি পেয়ারা ডাঙা স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে ৫ জন; একই উপজেলার চিলাখানা মডেল কলেজ থেকে ৪ জন, উলিপুর উপজেলার হযরত ফাতিমা (রা.) পৌর গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে ৩ জন, চিলমারী উপজেলার দক্ষিণ খাওরিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে ২ জন এবং রাজারহাট উপজেলার পাঙ্গারানী লক্ষ্মীপ্রিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ ১ জনসহ মোট ৭০ শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিয়েছেন।
কুড়িগ্রামের এই ৯টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৮টি নন এমপিও বলে নিশ্চিত করেছে জেলা শিক্ষা অফিস। তবে চিলমারী উপজেলার দক্ষিণ খাওরিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের স্কুল শাখা এমপিওভুক্ত বলে নিশ্চিত করলেও কলেজ শাখা এমপিওভুক্ত কিনা তা জানাতে পারেনি। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ফলাফল বরাবরই অসন্তোষজনক। এর আগেও শতভাগ অকৃতকার্য হওয়ার রেকর্ড আছে তাদের।
একই বোর্ডের অধীন লালমনিরহাটের ৬টি প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন মোট ১৮ শিক্ষার্থী। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো— হাতীবান্ধা মডেল কলেজ, আমিনুর রহমান কলেজ, কালীগঞ্জ উপজেলার সোনারহাট স্কুল অ্যান্ড কলেজ, দুহুলী এসসি হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ, দক্ষিণ ঘনশ্যাম স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং আদিতমারী উপজেলার গন্ধমরুয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সম্প্রতি এমপিওভুক্ত হয়েছে হাতীবান্ধা মডেল কলেজ। গতবছর প্রতিষ্ঠানটি থেকে ৬ জন পাস করেছিলেন। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর স্কুল শাখা এমপিওভূক্ত হলেও কলেজ শাখা নন এমপিও।
অন্যদিকে, খুলনা বিভাগে (যশোর শিক্ষা বোর্ডের অধীন) ১৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি।
প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—কুষ্টিয়ার হাজী নুরুল ইসলাম কলেজ ও জগন্নাথপুর আইডিয়াল কলেজ, মেহেরপুরের মোরেকা জাগরণ কলেজ, ঝিনাইদহের মল্লিক শহিদুল ইসলাম কারিগরি কলেজ, খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলস স্কুল অ্যান্ড কলেজ, খুলনা মডেল মহিলা কলেজ, খুলনা ইনডিপেনডেন্ট আইডিয়াল কলেজ, খুলনার কপিলমুনি সহচারী বিদ্যামন্দির, কয়রা শাকবাড়িয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রূপসার কমরেড রতন সেন কলেজিয়েট গার্লস কলেজ, মাগুরার বুজরুক শ্রীকুন্দি কলেজ ও গোপীনাথপুর এম এ খালেক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, যশোরের সবুজ পল্লী কলেজ, সাতক্ষীরার ইসলামিয়া মহিলা কলেজ ও এ কে ফজলুল হক এমসিএ কলেজ এবং নড়াইলের মাকরাইল করিম খালেক সোলায়মান ইনস্টিটিউট ও কুষ্টিয়ার জগন্নাথপুর আইডিয়াল কলেজ। এর মধ্যে খুলনার পাইকগাছার কপিলমুনি সহচরী বিদ্যা মন্দির কলেজ থেকে ২০২৫ সালে পাঁচজন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে কেউ পাস করেননি।
এ বিষয়ে যশোর শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক ড. আব্দুল মতিন বলেন, ‘যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি, সেসব প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হবে। প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিভুক্তি নবায়ন বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে।’
শূন্যপাস প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশই নন এমপিও, অল্প কয়েকটি এমপিওভুক্ত। তেমনি একটি প্রতিষ্ঠান হাতীবান্ধা মডেল কলেজ। সম্প্রতি এমপিওভুক্ত হওয়া প্রতিষ্ঠানটি থেকে গতবছর ৬ জন পাস করেছিলেন।
নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গড়ে উঠছে নতুন নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। শর্ত পূরণ না করেই পাঠদানের অনুমতি পাচ্ছে তারা। শিক্ষক না থাকলেও বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ খুলে শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলোতে। এরপর নিয়মিত পড়াশোনা না হলেও রেজিস্ট্রেশন ও ফরম পূরণ করিয়ে পরীক্ষায় বসানো হয় শিক্ষার্থীদের।
কুড়িগ্রামের যে ৯টি প্রতিষ্ঠান থেকে কেউ পাস করেননি সেখান থেকে মোট পরীক্ষার্থী ছিলেন মোট ৭০ জন। একই চিত্র খুলনা, যশোর কুষ্টিয়া দিনাজপুর, লালমনিরহাটসহ শতভাগ অকৃতকার্য হওয়া অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা থাকে ৫-১০ জনের মধ্যে। মূলত এমপিওভুক্তির প্রত্যাশায় এসব কলেজ পরীক্ষায় অংশ নেয় বলে অভিযোগ শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের।
এ বছর শতভাগ অকৃতকার্য হওয়া খুলনার ডুমুরিয়া মডেল মহিলা কলেজ থেকে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন মাত্র তিনজন শিক্ষার্থী। কলেজটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ জাকির হোসেন জানালেন, তাদের প্রতিষ্ঠানটি নন-এমপি। শিক্ষকরা বেতন-ভাতা না পাওয়ায় অনেকটা অমনোযোগী হয়ে পড়েছেন।
খুলনা জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার এস এম ছায়েদুর রহমান বলেন, ‘শতভাগ অকৃতকার্য প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশিরভাগ এমপিওভুক্ত নয়। ফলে শিক্ষকরা ঠিকমতো কলেজে আসেন না। অনেক বিষয়ের শিক্ষকও নেই, যার কারণে শতভাগ ফেল করেছে।’
‘স্কুল অ্যান্ড কলেজ’
অকৃতকার্য প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি বড় সংখ্যাই ‘স্কুল অ্যান্ড কলেজ’। কুড়িগ্রামের শতভাগ অকৃতকার্য ৯টি প্রতিষ্ঠানের ৫টিই স্কুল অ্যান্ড কলেজ। এছাড়া, লালমনিরহাটের ৬টির মধ্যে ৪টি, যশোর শিক্ষা বোর্ডের ১৬টির মধ্যে ৪টিসহ বিভিন্ন জেলায় শতভাগ অকৃতকার্যের তালিকায় ‘স্কুল অ্যান্ড কলেজ’ পর্যায়ের প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
এছাড়া, স্কুল অ্যান্ড কলেজ পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশের স্কুল শাখা এমপিওভুক্ত হলেও কলেজ শাখা এমপিওভুক্ত নয়। ফলে সেগুলোতে নিয়মিত শিক্ষক না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান, যার প্রভাব পড়ছে ফলাফলেও।
খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলস স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এ বছর ১২ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে কেউ পাস করতে পারেননি। প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ শাহিনা বেগম বললেন, ‘কলেজশাখা কেবল পাঠদানের অনুমতি পেয়েছে, এখনো এমপিওভুক্ত হয়নি।’ তবে শতভাগ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হওয়ার কারণ সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত জানাতে চাননি।
ইংরেজি-আইসিটি ভীতি
এ বছর এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে ইংরেজি ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে। আজ শনিবার ফলাফল প্রকাশের সময় এ তথ্য জানায় আন্তঃবোর্ড পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কমিটি।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রামীণ ও নতুন প্রতিষ্ঠানগুলোতে দক্ষ শিক্ষক না থাকা এবং যথাযথ প্রস্তুতির অভাবে অকৃতকার্য হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা, যা শতভাগ শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। এক্ষেত্রে, প্রতিষ্ঠানগুলোতে পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি শিক্ষা প্রশাসনের মনিটরিংয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তারা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মজিবুর রহমানের মতে, ইংরেজিতে এমনিতেই শিক্ষক সংকট। এর মধ্যে যারা আছেন তারাও ঠিকঠাকমতো ক্লাসরুমে পড়ান না। তার সঙ্গে এসব শিক্ষকদের বড় অংশই ব্যাকরণ ও শব্দভাণ্ডারের দুর্বলতা; নিয়মিত পড়া, লেখা ও কথা বলার চর্চার অভাব রয়েছে। অন্যদিকে আইসিটিতে ব্যবহারিক শিক্ষার ঘাটতি, পর্যাপ্ত কম্পিউটার ও ল্যাব সুবিধা না থাকা এবং প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব বড় সমস্যা।
আইসিটি শুধু বই পড়ে শেখার বিষয় নয়, এর জন্য ব্যবহারিক দক্ষতা প্রয়োজন বলে মনে করেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. সহিদুজ্জামান। অথচ এই বিষয়ে পড়ান অন্য বিষয়ের শিক্ষক। যিনি নিজেই কম্পিউটার চালাতে পারেন না, তিনিই পড়ান কম্পিউটার ব্যবহার, বিভিন্ন সফটওয়্যারের বিষয়। এই দৈন্যদশা থেকে বের হতে হলে দ্রুত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আইসিটি ল্যাব ও শিক্ষক বাড়াতে হবে।
শিক্ষা অবকাঠামোর সংকট
মফস্বল ও দুর্গম এলাকার অনেক প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং বিষয়ভিত্তিক স্থায়ী শিক্ষক নেই। এই সংকট প্রকট নন এমপিও প্রতিষ্ঠানগুলোতে।
খুলনা ইনডিপেনডেন্ট আইডিয়াল কলেজের এক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তার কলেজ পাঠদান ও পরীক্ষার অনুমোদন পেয়েছে। কিন্তু অর্থাভাবে শিক্ষার্থীদের জন্য ক্লাসরুম, ল্যাব বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় অবকাঠোমো গড়ে তোলা যায়নি। এছাড়া, শুরুর দিকে কয়েকজন শিক্ষক পাঠদান করলেও দীর্ঘদিন বেতন না পেয়ে তারা আর আসছেন না। ফলে প্রতিষ্ঠানটিতে নিয়মিত ক্লাস হয় না।
অন্যদিকে, কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলের শিক্ষকরা জানিয়েছেন, চরাঞ্চল ও সীমান্তবর্তী এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় প্রয়োজনীয় অবকাঠামো না থাকা, শিক্ষক সংকট এবং শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাসে অনুপস্থিতিই এমন বিপর্যয়ের প্রধান কারণ।
আজ শনিবার বেলা ১১টার দিকে এইচএসসির ফল প্রকাশ করা হয়। সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে শূন্যপাস করা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।





