জাবির ১০ বিভাগে সেশনজট
- চারুকলা বিভাগে সেশনজট প্রায় সাড়ে তিন বছর
- ছয়টি শ্রেণিকক্ষে চলছে আট ব্যাচের ক্লাস
- ইংরেজি বিভাগে পাঁচ মাস আইআইটিতে এক বছরের জট

সংগৃহীত ছবি
দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি)। তবে নির্ধারিত সময়ে পড়াশোনা শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশের কথা থাকলেও সেশনজটে আটকে আছে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ। নিয়মিত ক্লাস-পরীক্ষা না হওয়া, শিক্ষক, শ্রেণিকক্ষ সংকটসহ নানা কারণে বিশ্ববিদ্যালয়টির অন্তত ১০টি বিভাগে দীর্ঘ হচ্ছে শিক্ষাজীবন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সেশনজটে রয়েছে চারুকলা বিভাগ, যেখানে অনার্স ও মাস্টার্স শেষ করতে সময় লাগছে স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ।
সেশনজটের কবলে থাকা বিভাগগুলো হলো চারুকলা, নাটক ও নাট্যতত্ত্ব, ফার্মেসি, ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজি (আইআইটি), ইংরেজি, তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি ইনস্টিটিউট, বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, রসায়ন, অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম ও পরিবেশবিজ্ঞান।
সেশনজটের দিক থেকে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছে চারুকলা বিভাগ। বিভাগটিতে অনার্স ও মাস্টার্স শেষ করতে স্বাভাবিক সময়ের প্রায় দ্বিগুণ লাগছে। বর্তমানে একসঙ্গে চলছে আটটি ব্যাচের শিক্ষা কার্যক্রম। শিক্ষার্থীদের দাবি, বিভাগটিতে প্রায় সাড়ে তিন বছরের সেশনজট রয়েছে। অনেক সময় একটি বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষা শেষ করতেই লেগে যায় প্রায় তিন মাস।
তবে বিভাগটির শিক্ষকদের দাবি, এখনো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি করোনাভাইরাস মহামারির কারণে সৃষ্টি হওয়া সেশনজট। এর পাশাপাশি রয়েছে শ্রেণিকক্ষের সংকট। আটটি ব্যাচের ক্লাস নিতে হয় ছয়টি শ্রেণিকক্ষে। শ্রেণিকক্ষ খালি না পেলে করিডরেও ক্লাস নিতে হয় বলে জানিয়েছেন তারা।
নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগেও নিয়মিত ক্লাস ও পরীক্ষা না হওয়ায় বাড়ছে সেশনজট। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, শ্রেণিকক্ষের সংকট এবং শিক্ষকদের নিয়মিত ক্লাস না নেওয়ার কারণে দীর্ঘ হচ্ছে তাদের শিক্ষাজীবন। তাদের ভাষ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০তম ব্যাচের অধিকাংশ বিভাগের শিক্ষার্থীরা মাস্টার্স পর্যায়ে পড়াশোনা করলেও চারুকলা বিভাগের ওই ব্যাচের শিক্ষার্থীরা এখনো পৌঁছাতে পারেননি অনার্স চতুর্থ বর্ষে।
সেমিস্টার পদ্ধতি চালুর পর থেকে ইংরেজি বিভাগেও সেশনজট সৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি, শিক্ষকদের অবহেলায় প্রায় পাঁচ মাস পিছিয়ে রয়েছেন তারা। বিভাগটিতে প্রকট শ্রেণিকক্ষের সংকটও। শিক্ষার্থীরা বলছেন, বিভাগটির জন্য বরাদ্দ রয়েছে মাত্র দুটি শ্রেণিকক্ষ এবং একটি শ্রেণিকক্ষের কিছু অংশ। পাঁচটি ব্যাচের ক্লাস পরিচালনার কথা থাকলেও পদ্ধতিগত কারণে বর্তমানে কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে সাতটি ব্যাচের।
এ ছাড়া কলা অনুষদের ডিন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিবেচনায় কিছু বিভাগকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বিভাগটির শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের একাংশ। তাদের দাবি, প্রভাবশালী শিক্ষকদের বিভাগগুলো অগ্রাধিকার পাওয়ায় অন্য বিভাগগুলো প্রয়োজনীয় গুরুত্ব পাচ্ছে না।
আইআইটি বিভাগের ৫০তম ব্যাচে রয়েছে প্রায় এক বছরের সেশনজট। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, তাদের সমসাময়িক অন্য বিভাগের শিক্ষার্থীরা স্নাতকোত্তর শেষ করে চাকরির বাজারে প্রবেশ করলেও তারা শুধু সম্পন্ন করছেন স্নাতক।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের পর এক শিক্ষকের বিচারের দাবিতে ক্লাস বর্জন করেছিলেন বিভাগের শিক্ষার্থীরা। এ কর্মসূচির কারণে শিক্ষকদের বিরাগভাজন হয়েছেন বলে মনে করেন তারা।
অন্যদিকে, পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগে ভাঙাচোরা ও অপর্যাপ্ত পরীক্ষাগারের কারণে ব্যাহত হচ্ছে ব্যবহারিক শিক্ষা কার্যক্রম। শিক্ষার্থীদের দাবি, এর ফলে বিভাগটিতে সৃষ্টি হয়েছে প্রায় এক বছরের সেশনজট। ফার্মেসি বিভাগে প্রায় দেড় বছর এবং তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি ইনস্টিটিউটে সেশনজট রয়েছে প্রায় এক বছরের।
এ ছাড়া রসায়ন, বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এবং অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের শিক্ষার্থীরাও ভুগছেন সেশনজটে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, শিক্ষকদের নিয়মিত ক্লাস নিতে অনাগ্রহ, ক্লাস টেস্ট নিয়মিত না হওয়া এবং নির্ধারিত সময়ে ক্লাস ও পরীক্ষা আয়োজন না করায় বাড়ছে সেশনজট। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব সমস্যার পাশাপাশি কয়েকটি বিভাগে রয়েছে শিক্ষক সংকটও। প্রয়োজনীয়সংখ্যক শিক্ষক না থাকায় সম্ভব হচ্ছে না সময়মতো ক্লাস নেওয়া। এ ছাড়া শ্রেণিকক্ষের অভাবেও ব্যাহত হচ্ছে নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম।
সেশনজটে থাকা বিভাগগুলোর শিক্ষার্থীদের মতে, নিয়মিত ক্লাস-পরীক্ষা নিশ্চিত করা, ক্লাস টেস্ট সময়মতো নেওয়া এবং বিভাগগুলোর অবকাঠামোগত ও জনবল সংকট দূর করা গেলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।
সেশনজটের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক শামছুল আলম জানালেন, সেশনজটে থাকা বিভাগগুলোর সমস্যা সমাধানে এরই মধ্যে আলোচনা হয়েছে অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের সঙ্গেও করা হয়েছে যোগাযোগ।
সেশনজট নিরসনে অটোমেশন ব্যবস্থা চালুর বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে। আশা করা হচ্ছে, খুব অল্প সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সেশনজটের সমস্যা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে— যোগ করলেন তিনি।



