আম্মারকে থামাবে কে
- একের পর এক অপরাধে জড়ালেও ব্যবস্থা নেই

বেলচা হাতে রাবি কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের দিকে তেড়ে যাচ্ছেন রাকসু জিএস সালাউদ্দিন আম্মার। গতকাল সোমবার বিকেলের ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ক্যাম্পাসের ‘ওয়ানম্যান আর্মি’ তকমা পাওয়া ছাত্রনেতা সালাহউদ্দিন আম্মার। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে রাবি ক্যাম্পাসে যে নামটি বারবার আতঙ্কের কারণ হয়েছে, তা হলো সালাহউদ্দিন আম্মার। খুলনার প্রত্যন্ত জনপদ কয়রা থেকে আসা এ ছাত্রনেতা ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে কোটায় ভর্তি হন ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে। সেই আম্মারই চব্বিশের কোটাবিরোধী আন্দোলনে যোগ দিয়ে হয়ে যান নেতা। সাধারণ শিক্ষার্থীদের আবেগকে পুঁজি করে পান পরিচিতি। নির্বাচিত হন বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সাধারণ সম্পাদক (জিএস)।
খুব অল্প সময়ে ছাত্ররাজনীতির ময়দানে তুমুল জনপ্রিয়তা পেলেও আম্মারের ভাবমূর্তি এখন বিবর্ণ। লেগেছে বিস্তর নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের কালো দাগ, যা ক্রমেই হচ্ছে দীর্ঘ। একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে রাকসু তথা বিশ্ববিদ্যালয়কেই ফেলছেন ভাবমূর্তির সংকটে। কখনো শিক্ষকের শার্টের কলার ধরছেন, কখনো উপাচার্যের কার্যালয়ে ঝুলিয়ে দিচ্ছেন তালা, আবার কখনো ছাত্রদল নেতাকে ছাত্রলীগ তকমা দিয়ে পিটিয়ে করছেন আহত। তার বিরুদ্ধে উঠেছে চাঁদাবাজি এবং নিয়োগবাণিজ্যের অভিযোগও।
ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ্য ফৌজদারি অপরাধে জড়ানোর পরও আম্মারের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না প্রশাসন। সব ঘটনাতেই পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দেখাচ্ছে নীরবতা। বেশ কিছুদিন আগে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে আম্মারের তোলা একটি ছবি ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এরপরও তাকে আইনের আওতায় আনতে আগ্রহী হয়নি পুলিশ। কয়েকটি ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন গঠন করে তদন্ত কমিটি কিন্তু তার আলোকে নেই দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ। এসব তদন্ত কমিটিকে ‘আইওয়াশ’ বলে মনে করছেন অনেকেই। এমন প্রেক্ষাপটে রাবির শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বড় একটি অংশের প্রশ্ন— আম্মারকে থামাবে কে?
জানতে চাইলে রাবির প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান বললেন, ‘এর আগে শিক্ষক লাঞ্ছনার বিষয়ে তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। সোমবারের ঘটনা নিয়েও তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা কাজ শুরু করেছেন।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলছিলেন, ‘প্রক্টর দপ্তরে এবং লাইব্রেরিতে যে বিষয়গুলো হয়েছে, তা গ্রহণযোগ্য ছিল না।’
আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেষ্টা এ এইচ এম খোরশেদ আলমের ভাষ্য, ‘সাম্প্রতিককালে আম্মার যেসব কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন, সেগুলো শিক্ষার্থীসুলভ নয়। তার বিরুদ্ধে শিক্ষক লাঞ্ছিতের ঘটনার তদন্ত চলমান। এ বিষয়ে আমি আর কোনো মন্তব্য করতে চাচ্ছি না।’
গত সোমবার ক্যাম্পাসে তিন শিক্ষার্থীকে দফায় দফায় পিটিয়ে নতুন করে আলোচনায় আসেন আম্মার। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, তার নেতৃত্বে রাকসু ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা প্রথম দফায় প্রক্টরের দপ্তরে তিন শিক্ষার্থীকে (আনাস, হাসিব ও মাহমুদুল) মারধর করেন। পরে বেলা ৩টার দিকে রাকসু ভবনে গিয়ে আম্মার এবং রাকসুর তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক বিএম নাজমুস সাকিবের ওপর পাল্টা হামলা চালান তারা। এরপর কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে প্রক্টরের সামনেই কয়েক দফা আনাস, হাসিব ও মাহমুদুলকে মারধর করেন আম্মার এবং তার অনুসারী শিবির নেতাকর্মীরা। হামলাকারীরা কাঠ, বাঁশ, রড, বেলচা দিয়ে তাদের বেধড়ক পেটান। হামলা ঠেকাতে গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষে থাকা শিক্ষার্থীরা এগিয়ে এলে তাদেরও মারধর করা হয়। এ ঘটনায় উল্টো মারধরের শিকার দুই শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ঘটনা তদন্তে কমিটি করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
এর আগে পাকিস্তানি এক নারী শিক্ষার্থীকে নিয়ে ফেসবুকে বিতর্কিত মন্তব্য করে সমালোচিত হন আম্মার। ডাকসু নেত্রী উম্মে সালমার করা একটি ফেসবুক পোস্টে পাকিস্তানি নারী শিক্ষার্থীকে ইঙ্গিত করে আম্মার লেখেন— ‘নিয়ে আসেন আমার জন্য’।
‘৩৬ জুলাই: মুক্তির উৎসব’ কনসার্ট আয়োজনের নামে ৭০টি প্রতিষ্ঠানের কাছে ৭৬ লাখ টাকা অনুদান চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছিলেন আম্মার। তা জানাজানি হলে চরম বিতর্কিত হন তিনি। নাম প্রকাশে অনাগ্রহী রাবির এক শিক্ষকের ভাষ্য, সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীবের সঙ্গে বেশ ঘনিষ্ঠতা ছিল আম্মারের। তার সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পদে অনেকের নিয়োগের নেপথ্যে আম্মারের তদবির ছিল। নিয়োগবাণিজ্যের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়েছেন তিনি। ৫ আগস্টের পর নগর ভবন থেকে ল্যাপটপ লুটের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এ ছাড়া রাজশাহীর একটি শিল্পগ্রুপ এক এনসিপি নেতার (সাবেক শিবির নেতা) মাধ্যমে আম্মারের কাছে নিয়মিত মাসোহারা পৌঁছে দেয় বলেও রয়েছে অভিযোগ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেল, আম্মারের জন্ম খুলনার কয়রা উপজেলায়। ঢাকার উপকণ্ঠ টঙ্গীর তামিরুল মিল্লাত মাদ্রাসা থেকে আলিম পাস করে রাবির ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে কোটায় ভর্তি হওয়া আম্মার ছিলেন ছাত্রশিবিরের সাথী। কিন্তু আগে তা কখনোই প্রকাশ করেননি। আম্মার তার ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে প্রকাশ করেন ব্যঙ্গচিত্র। এর প্রতিবাদে কয়রা বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা তাকে এলাকায় অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে।
আম্মারের যত কাণ্ড
আগামীর সময়ের রাবি প্রতিনিধি জাহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, ক্যাম্পাসে আম্মারের বিতর্কিত কাণ্ডের শেষ নেই। বিশ্বকাপ ফুটবল ম্যাচ দেখাকে কেন্দ্র করে লতিফ হল ছাত্র সংসদের জিএস নুরুল ইসলাম শহিদকে মারধর করেন আম্মার। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের প্ল্যাটফর্ম ‘বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক’ বন্ধের আহ্বান জানিয়ে বিতর্কে জড়ান।
গত বছরের শেষের দিকে ভর্তিতে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সন্তানদের পোষ্য কোটা পুনর্বহাল ইস্যুতে আন্দোলনের সময় তৎকালীন উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ মাঈন উদ্দীনসহ কয়েকজন শিক্ষককে লাঞ্ছিত করেন আম্মার। রেজিস্ট্রারের দপ্তরে ঢুকেও হাঙ্গামা করেছেন আম্মার ও তার অনুসারীরা। প্রথম আলো-ডেইলি স্টারসহ বেশ কিছু গণমাধ্যমকে ‘সুশীল’ আখ্যা দিয়ে বন্ধের হুমকি দিয়েও হন আলোচিত। বিশ্ববিদ্যালয়ে আওয়ামী লীগপন্থী কোনো শিক্ষক-কর্মকর্তা চাকরিতে থাকলে তাদের প্রশাসনিক ভবনের সামনে বেঁধে রাখার হুমকি দেন। ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ও মেডিকেল সেন্টারের কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মাসুদকে পিটিয়ে হত্যার সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয় ডিনকে পদত্যাগ করতে কুরুচিপূর্ণ ভাষায় হুমকি দেন আম্মার। একই সঙ্গে আওয়ামীপন্থী শিক্ষক-কর্মকর্তাদের প্রশাসনিক ভবনের সামনে বেঁধে রাখার হুঁশিয়ারি দেন। এরপর ২১ ডিসেম্বর তিন ডিনের কার্যালয়, উপাচার্য, দুই উপ-উপাচার্যসহ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের দপ্তরে তালা লাগিয়ে দেন তিনি।
রাবি শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহি বললেন, ‘একজন শিক্ষার্থী হয়ে সে (আম্মার) বারবার ক্যাম্পাস অস্থিতিশীল করে তুলছে। কার প্ররোচনায়, কাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে সে ক্যাম্পাসে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে, তা খতিয়ে দেখার সময় এসেছে। তার কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জঙ্গি তৎপরতার মিল রয়েছে। তাকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করে সবকিছু বের করা দরকার।’
এ প্রসঙ্গে রাবির আইন বিভাগের শিক্ষক ড. মোর্শেদুল আলম পিটার বলছিলেন, ‘দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, কোনো শিক্ষার্থী যদি অন্য কোনো শিক্ষার্থী বা শিক্ষককে শারীরিকভাবে আঘাত করে কিংবা প্রকাশ্যে হুমকি-ধমকি দেয়, তবে তা স্পষ্টত ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। বাংলাদেশের দণ্ডবিধি অনুযায়ী, এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ বা জিডি করা এবং আদালতে মামলা করার সুযোগ রয়েছে। হুমকি দেওয়া বা আঘাত করার মতো বিষয়গুলো আইনের আওতায় বিচারযোগ্য।’
এর আগে আম্মারের আচরণের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম। ফোরামের বিবৃতিতে বলা হয়, যখন-তখন বিভিন্ন দপ্তরে তালা লাগিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি এবং তাদের সঙ্গে অশোভন আচরণের মাধ্যমে পুরো ক্যাম্পাসে ভীতিকর ও নৈরাজ্যকর পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন আম্মার। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মান ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে।
তবে আত্মপক্ষ সমর্থন করে সালাউদ্দিন আম্মার গতকাল মঙ্গলবার মোবাইল ফোনে আগামীর সময়কে বললেন, ‘গতকালকের (সোমবার) বিষয়টা সবার সামনে আইনের হাতে তুলে দিয়েছি। কিন্তু আইন তো আমাকে রক্ষা করতে পারেনি। বরং রাকসু ভবনে গিয়ে আমার ওপর হামলা করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণে এমন পরিস্থিতি। এর দায় আমি কাকে দেব? আইনকে? প্রশাসনকে? যখন তারা দায় নিতে পারছে না, তখন তো সেটা আমাকে নিতে হবে।’
চাঁদাবাজির অভিযোগের বিষয়ে আম্মারের ভাষ্য, ‘আমাদের দেওয়া রাসিকের চিঠিটি নিয়ে মিডিয়াগুলো সংঘবদ্ধ হয়ে মিডিয়া ট্রায়াল চালাচ্ছে, নোংরামি করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যারের সুপারিশ নিয়ে, যথাযথ নিয়ম মেনেই প্রপোজাল দেওয়া হয়েছে। উপাচার্য প্রতিটি প্রপোজালে সিল, স্বাক্ষর দিয়েছেন। সিটি করপোরেশনে আমরা চিঠি দিয়ে বলেছিলাম, আপনাদের পক্ষ থেকে যতটুকু করা যায় আপনারা করবেন। আমাদের ব্যানার হবে ৬৮ থেকে ৭২ পর্যন্ত সব ব্যাচের সাধারণ শিক্ষার্থীদের আয়োজন। এর আগেও রাসিক বিভিন্ন সংগঠনকে অর্থায়ন করেছে। আয়োজনটা যেন না করতে পারি, সেজন্য এটা নিয়ে একটা পক্ষ নোংরামি শুরু করেছিল।’





