উচ্চশিক্ষায় বিদেশ পাঠানোর নামে প্রতারণা
শিক্ষার্থীদের টাকায় কেনা বিএসবির সম্পদ ক্রোক করেছে সিআইডি
- শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে দেওয়া হয় চটকদার বিজ্ঞাপন
- ‘স্কলারশিপ’ পেয়েছে বলে টাকা আত্মসাৎ, পরে নেওয়া হয় না খোঁজ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ক্যামব্রিয়ান স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী লামিয়া (ছদ্মনাম)। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে কলেজ থেকে তাকে জানানো হয়, আমেরিকায় স্কুলিং ভিসার মাধ্যমে তিনি স্কলারশিপ পেয়েছেন। কলেজ অফিস থেকে যোগাযোগ করতে তাকে ক্যামব্রিয়ান স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান খায়রুল বাশার বাহারের পরিচালিত প্রতিষ্ঠান বিএসবি গ্লোবালে পাঠানো হয়। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের এক নাগরিকের উপস্থিতিতে ‘শুভেচ্ছা অনুষ্ঠানের’ আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানের পর বিএসবি গ্লোবালের কর্মকর্তারা জানান, ভিসা প্রসেসিংসহ এক বছরের সেশন ফি বাবদ ৬০ হাজার ডলার খরচ হবে। তবে ‘স্কলারশিপ’-এর আওতায় সবকিছু মিলিয়ে খরচ হবে ১৫ লাখ টাকা।
উৎসাহিত হয়ে প্রাথমিকভাবে লামিয়া ৫ লাখ টাকা জমা দেয়। প্রথমদিকে বিএসবি গ্লোবাল থেকে তার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হতো। কাগজপত্র নিয়ে সবকিছু দ্রুত হয়ে যাবে বলে আশ্বাস দিত তারা। গেল ঈদুল ফিতরের ঠিক দুদিন আগে বিএসবি থেকে তাকে কল করে বলা হয়— আগামীকালের মধ্যে বাকি ১০ লাখ টাকা না দিলে এক বছরের জন্য পুরো প্রক্রিয়া পিছিয়ে যাবে। বাধ্য হয়ে দুটি গরু বিক্রি করে এবং ধার করে ১০ লাখ টাকা দেওয়া হয়। পুরো টাকা জমা দেওয়ার পর থেকে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন বিএসবির কর্মকর্তারা। কল রিসিভ করা বন্ধ করে দেন, অফিসে গেলে বলেন— আটকে রয়েছে ফাইল। একের পর এক তারিখ দিলেও কাজ হয়নি। পরে লামিয়া জানতে পারে সে একা নয়, তার মতো একইভাবে প্রতারণার শিকার হয়েছেন শত শত মানুষ।
উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে বিএসবি গ্লোবাল নেটওয়ার্কের মালিক খাইরুল বাশারের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং মামলা করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সম্প্রতি ওই মামলায় আদালতের নির্দেশে বাশারের প্রায় ৩৩ কোটি টাকার স্থাবর সম্পদ ক্রোক করেছে সিআইডি।
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়ে প্রথম স্ত্রীর নামে রাজধানীর ভাটারা এলাকায় একটি ফ্ল্যাট, দ্বিতীয় স্ত্রী কানিজ ফাতেমা প্রকাশ ডোনার নামে শেলটেক বীথিকা প্রকল্পে একটি ফ্ল্যাট কিনেছেন। এ ছাড়া রাজাবাজার এলাকায় দুটি ফ্ল্যাট এবং রাজধানীর আজিজ সড়কে ৭ তলা ও ৬ তলা বিশিষ্ট দুটি বাড়িসহ নিজ নামে ও প্রতিষ্ঠানের নামে মোট ৩ হাজার ৪৮২ দশমিক ৫ শতাংশ জমি ক্রয় করেছেন। এসব সম্পদের দলিল মূল্য ৩৩ কোটি টাকা।
সিআইডির ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট সূত্র জানায়, খাইরুল বাশার ও তার সহযোগীরা একটি সংঘবদ্ধ প্রতারণা চক্র গড়ে তুলেছিলেন। তারা যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাসহ বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশে স্বল্প খরচে এবং দ্রুত সময়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ দেওয়ার চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতেন। এই বিজ্ঞাপনের ফাঁদে পা দিয়ে অসংখ্য শিক্ষার্থী তাদের হাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ তুলে দেন, যা পরে আত্মসাৎ করা হয়।
শিক্ষাবিদ ও ব্যবসায়ীর আড়ালে প্রতারণা
সিআইডি বলছে, উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বাশার। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ৪ জুন রাজধানীর গুলশান থানায় তার বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে একটি মামলা করে ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট। এতে প্রতিষ্ঠানটির মালিক খায়রুল বাশার বাহার, তার স্ত্রী খন্দকার সেলিমা রওশন ও ছেলে আরশ ইবনে বাশার এবং অজ্ঞাতনামা চার থেকে পাঁচজনকে আসামি করা হয়। পরে ওই বছরের ১৪ জুলাই তাকে রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করে সিআইডি।
মামলার তদন্তে জানা গেছে, বাশার নিজেকে একজন শিক্ষাবিদ ও ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয় দিলেও এর আড়ালে তিনি মূলত একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র পরিচালনা করতেন। বর্তমানে মামলার তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির নামে দেশের বিভিন্ন স্থানে আরও স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির সন্ধান চালানো হচ্ছে।
ঢাকার বাইরেও ৬০০ কোটি টাকার সম্পদ
সূত্র বলছে, ক্রোক করা এসব সম্পদের দলিল মূল্য প্রায় ৩৩ কোটি টাকা দেখানো হলেও প্রকৃতপক্ষে এর মূল্য কয়েক গুণ বেশি হতে পারে। এ ছাড়া ঢাকার বাইরে আরও সম্পদের তথ্য রয়েছে, যাচাই শেষে সেগুলোও ক্রোক করা হবে।
প্রাপ্ত তথ্য বলছে, বিএসবির স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে আরও ১ হাজার ১০৬ শতাংশ জমির তথ্য মিলেছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দুটি মৌজায় থাকা এসব জমির দলিল মূল্য ১০২ কোটি ৬১ লাখ টাকার বেশি। যার বাজার মূল্য অন্তত ৬০০ কোটি টাকা হবে। এ ছাড়াও নামে বেনামে রাজধানীর গুলশান, বারিধারাসহ বিভিন্ন এলাকায় তাদের অসংখ্য ফ্ল্যাট, ভবন ও জমির তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
সিআইডি ছাড়াও একাধিক ভুক্তভোগীর মামলা
সিআইডির মামলা ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে ভুক্তভোগীরা মামলা করেছেন। এরমধ্যে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ১৫ ভুক্তভোগীকে নিয়ে আমির হোসেন মামলা করেন। ৩ কোটি ৯৫ লাখের বেশি অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে ৩৫ জনকে নিয়ে রিতা আক্তার মামলা করেন। ১৬ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ায় জান্নাতুল ফেরদৌস মুক্তা মামলা করেন। এ ছাড়া ভুক্তভোগী তাওসিফ আলম আরাফের মা কানিজ ফাতেমা রুনা মানব পাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন। সিআইডি জানায়, মামলাগুলোর তদন্ত চলছে। এগুলো ছাড়াও তাদের নামে এনআই অ্যাক্টে মামলা চলছে এবং একাধিক ওয়ারেন্ট আছে।
বিদেশে উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের পরামর্শদানের (কনসালট্যান্সি) অনুমতি নিয়ে বিএসবি ২০০৩ সালে কার্যক্রম শুরু করে। এরপর থেকে ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে শিক্ষার্থী পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা নেয়। কিন্তু বহু ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ না করে প্রতিষ্ঠানটি অর্থ আত্মসাৎ করে। এমন দেড় শতাধিক ভুক্তভোগীর লিখিত অভিযোগ পেয়েছে সিআইডি। এর বাইরেও পাঁচ শতাধিক সেবাপ্রত্যাশী প্রতারিত হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।




