মধ্যপ্রাচ্যে কর্মী যাওয়া কমেছে ২৬ শতাংশ
- যুদ্ধের কারণে ধীরগতি, গত বছর ৭ মাসে গেছে ৫ লাখ ৯২ হাজার ৪৯০ জন
- এ বছর ৭ মাসে গেছে ৪ লাখ ৩৬ হাজার ৭৫১ জন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কুমিল্লার হোমনার মো. আবদুল্লাহ ২০০৮ সালে একটি রিয়েল এস্টেট কোম্পানিতে অ্যালুমিনিয়ামের শ্রমিক হিসেবে দুবাই শহরে যান। ২০১২ সালে একই কোম্পানির অধীনে তাকে ইরানে নিয়োগ দেওয়া হয়। সবকিছু ভালোই যাচ্ছিল তার। কিন্তু গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এতে মো. আবদুল্লাহর মতো লাখ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসীর স্বপ্ন এলোমেলো হয়ে যায়। তিনি প্রাণ বাঁচাতে চাকরি ছেড়ে দেশে ফিরে আসেন।
আবদুল্লাহ গত সোমবার মোবাইল ফোনে আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘আমি তবু চাকরি ছেড়ে দিয়ে আসতে পেরেছি। কিন্তু যারা মধ্যপ্রাচ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য করেন, তাদের অবস্থা ভয়াবহ। ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের ভয়াবহতা ও আতঙ্ক তাড়া করে ফিরছে তাদের।’
বাংলাদেশের প্রবাসী আয় মূলত মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। দুই-তৃতীয়াংশ শ্রমিক শুধু এ অঞ্চলেই কাজ করেন। ইরানে হামলার প্রতিশোধ নিতে মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলোয় অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করছে তেহরান। সংঘাতে এ পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন ১২ বাংলাদেশি।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত (৭ মাস) বিদেশে কর্মী গেছেন ৫ লাখ ৯২ হাজার ৪৯০ জন। অথচ এ বছর জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ৭ মাসে কর্মী যাওয়ার সংখ্যা ৪ লাখ ৩৬ হাজার ৭৫১ জন। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় ২৬ দশমিক ২৮ শতাংশ কম। সবচেয়ে কম কর্মী গেছেন মার্চ মাসে, মাত্র ৪৪ হাজার ৬৫৮ জন। তবে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের মধ্যে সবচেয়ে বেশি, ৭১ হাজার ৮৪ জন কর্মী গেছেন গত জুলাইয়ে।
বিএমইটির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের প্রথম ৭ মাসে শুধু সৌদি আরবে কর্মী হিসেবে যান ৪ লাখ ৪ হাজার ৬৭২ জন, যা মোট বিদেশে যাওয়া কর্মীর ৬৮ শতাংশ। কিন্তু এ বছর ৭ মাসে গেছেন ২ লাখ ৪৭ হাজার ৭৪২ জন, যা মোট কর্মীর প্রায় ৫৭ শতাংশ। গত জানুয়ারিতে সৌদি আরবে ৬৫ হাজার ৪১০ জন গেলেও ২৫ হাজারের নিচে নেমে যান মার্চ ও এপ্রিলে। গত জুলাইয়ে গেছেন ৩৩ হাজার ১৭২ জন।
শ্রম অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের একমাত্র ভরসা হিসেবে টিকে আছে সৌদি আরবের শ্রমবাজার। এর বাইরে মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে ওমান, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্রবাসী আয় আসে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের পাশাপাশি সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্থানীয়করণ নীতির কঠোর প্রয়োগের ফলে কমে এসেছে অদক্ষ শ্রমিকের চাহিদা। বিশেষ করে, সাধারণ নির্মাণশ্রমিক ও ক্লিনার ক্যাটাগরিতে ভিসা ইস্যু কমেছে ২০ শতাংশের বেশি। এ ছাড়া কাতার ও কুয়েতে নির্মাণ প্রকল্পের সংখ্যা কমে আসা এবং পেশাদারিত্বের নতুন শর্তাবলি বাংলাদেশের অদক্ষ কর্মীদের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবশ্য সরকার দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে কাজ করছে বলে দাবি করেছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক নুর। আগামীর সময়কে তিনি বললেন, ‘তাদের জন্য (প্রবাসী কর্মী) বিভিন্ন ট্রেডের উপযোগী প্রশিক্ষণ ও জ্ঞান যেন থাকে, ওখানে গিয়ে যেন কাজ করতে পারেন, সে রকম দক্ষ জনসম্পদ তৈরিতে আমরা জোর দিচ্ছি। পারতপক্ষে এখান থেকে যাওয়ার আগেও যেন কাজের নিশ্চয়তা তাদের থাকে।’ পাশাপাশি তিনি যোগ করেন, ‘তাদের যে গলাকাটা অভিবাসন ব্যয়, এটার আমরা একটা স্ট্যান্ডার্ড ঠিক করে দিতে চাই; কম খরচে তারা যেন যেতে পারেন।’
মধ্যপ্রাচ্য আর আগের মতো নেই: ডিজিটাল রূপান্তর মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারের চাহিদা বদলে দিচ্ছে— এক গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য দিয়েছে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)। ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে আইএলও দেখিয়েছে, দু-এক বছরের মধ্যে আরব অঞ্চলে প্রায় ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ চাকরি (প্রায় ৮০ লাখ) কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে আরও প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠবে। প্রায় ২ দশমিক ২ শতাংশ চাকরি (প্রায় ১২ লাখ) স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির কারণে বিলুপ্ত বা প্রতিস্থাপনের ঝুঁকিতে রয়েছে। অর্থাৎ ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে অদক্ষ শ্রমের পরিবর্তে দক্ষ ও প্রযুক্তিসক্ষম কর্মীর চাহিদা বাড়বে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান রূপান্তরের প্রেক্ষাপটের বাস্তবতায় বাংলাদেশের অভিবাসননীতিতে মৌলিক পরিবর্তন জরুরি বলে মনে করেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর মাইগ্রেশন স্টাডিজের সহযোগী অধ্যাপক সেলিম রেজা। আগামীর সময়কে তিনি বললেন, ‘কীভাবে দক্ষ কর্মী তৈরি করা যায়, যাদের জন্য বিদেশি নিয়োগকর্তারা প্রতিযোগিতা করবেন— সরকারের অভিবাসন নীতিতে চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে এটি।’
আগামী দিনগুলোয় মধ্যপ্রাচ্য আর সস্তা শ্রম কিনবে না উল্লেখ করে তিনি বললেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ শ্রমবাজারে টিকে থাকবে সেই দেশ, যে শুধু সংখ্যায় বেশি কর্মী বিদেশ পাঠায় না; বরং অত্যাধুনিক দক্ষতা ও প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন কর্মী তৈরি করে পাঠায়। এ প্রতিযোগিতায় জিততে হলে মানুষ রপ্তানি নয়, দক্ষতা রপ্তানির নীতিগ্রহণ করতে হবে।’




