জলবায়ু অর্থায়নে জিডিপির ন্যূনতম ৩ শতাংশ বরাদ্দের আহ্বান

ছবি: আগামীর সময়
জলবায়ু অর্থায়নকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করে বরাদ্দ অন্তত জিডিপির তিন শতাংশে উন্নীত করার আহ্বান জানিয়েছেন জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, প্রস্তাবিত বাজেটে জলবায়ু খাতে ব্যয় জিডিপির মাত্র ০.৭৬ শতাংশ, যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। তাদের অভিযোগ, প্রতি বছর জিডিপি বাড়লেও জলবায়ু খাতে বরাদ্দ সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে আগের মতোই গতানুগতিক ধারা অব্যাহত রয়েছে।
আজ রবিবার ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে কোস্ট ফাউন্ডেশন, বিডিসিএসও প্রসেস ও ইক্যুইটিবিডির যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ ও জলবায়ু বরাদ্দ: উপকূলীয় সুরক্ষার অগ্রাধিকার কতটা?’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন।
সেমিনারে বক্তারা উপকূলীয় পানি ব্যবস্থাপনার জন্য পৃথক অভিযোজন পরিকল্পনা প্রণয়নের দাবি জানিয়ে বলেছেন, ‘পানি ব্যবস্থাপনায় দুটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রথমত, উপকূলীয় সুরক্ষায় অবকাঠামো উন্নয়ন। এর মধ্যে বেড়িবাঁধ, স্লুইস গেট, ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং অন্যান্য পানি অবকাঠামোর উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের পাশাপাশি পুরোনো পোল্ডার ও বাঁধ সংস্কার এবং জলবায়ু-সহনশীল উপকূলীয় সুরক্ষা অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, নিরাপদ পানি ও সেচ ব্যবস্থা উন্নত করতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য পুকুর খনন, মুক্ত জলাশয় ও খাল পুনরুদ্ধার, পানি-সাশ্রয়ী সেচ প্রযুক্তির সম্প্রসারণ এবং লবণাক্ততা-সহনশীল কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হবে। এসব খাতে বাজেটে অগ্রাধিকারভিত্তিতে বরাদ্দ নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা।
বক্তারা আরও জানান, বিশেষ করে কক্সবাজার ও রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে গভীর নলকূপ স্থাপনের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ম ও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা প্রয়োজন। যাতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর রক্ষা করা যায়। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গভীর নলকূপ স্থাপনে অবিলম্বে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। পাশাপাশি সেখানে পানীয় জলের চাহিদা পূরণে নাফ নদীর পানি শোধন করে সরবরাহের প্রস্তাব দেওয়া হয়।
সেমিনারে পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জিয়াউল হক পানি ব্যবস্থাপনায় দুটি প্রধান অগ্রাধিকারের কথা উল্লেখ করেন। প্রথমত, পানি-সম্পর্কিত দুর্যোগ ও পানিবাহিত রোগ থেকে সুরক্ষা এবং দ্বিতীয়ত, কৃষি ও পানীয় জলের জন্য পর্যাপ্ত ও নিরাপদ পানি নিশ্চিত করা।
তিনি বলেছেন, তীব্র পানীয় জলের সংকট মোকাবিলায় সমুদ্রের পানি লবণমুক্তকরণ, পুকুর খনন এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও ব্যবহার বাড়াতে হবে। এসব উদ্যোগ নিরাপদ ও কার্যকরভাবে ব্যাপক পরিসরে বাস্তবায়নের ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
কোস্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক এম রেজাউল করিম চৌধুরী বলেছেন, উপকূলীয় জনগণের জন্য জলবায়ু ন্যায্যতা অবশ্যই জাতীয় বাজেটে প্রতিফলিত হতে হবে।
তিনি লবণাক্ততা, নদীভাঙন, পানি সংকট এবং জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতিকে জীবিকার প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দিয়ে স্বচ্ছ জলবায়ু অর্থায়নের আহ্বান জানান।
মাইক্রোফাইন্যান্স পলিসি অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি বিশেষজ্ঞ মো. মোশাররফ হোসেন বলেছেন, ‘বাজেট ঘাটতি কমাতে সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রয়োজন। তিনি জবাবদিহিতা বৃদ্ধি, দুর্নীতি দমনব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোর সংস্কারের ওপর জোর দেন, যাতে অর্থ ব্যবস্থাপনা আরও দক্ষ ও কার্যকর হয়।’
আরডিআরএস বাংলাদেশের পরিচালক তারিক সাঈদ হারুন বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কমে যাওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেছেন, ‘মাইক্রোফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠান (এমএফআই) জিডিপিতে প্রায় ২২ শতাংশ অবদান রাখলেও এখনো যথাযথ স্বীকৃতি পায়নি।’
তিনি এ খাতকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক উল্লেখ করে সরকারের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি এবং বাংলাদেশ ব্যাংক-এর অর্থায়ন সহায়তার আহ্বান জানান। কোস্ট ফাউন্ডেশনের পরিচালক সৈয়দ আমিনুল হক জাতীয় বাজেটে এমএফআইগুলোর জন্য পৃথক অর্থায়ন ব্যবস্থা চালুর দাবি জানান। তিনি ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি নিয়ন্ত্রণে নীতি প্রণয়ন এবং সিআইবি ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কোস্ট ফাউন্ডেশনের জলবায়ু পরিবর্তন বিভাগের প্রধান এম এ হাসান।
এ ছাড়া সামছুল হক, মোতাহার হোসেন, ওমর ফারুক ভূঁইয়া, ইকবাল উদ্দিন, মো. আহসানুল ওয়াহেদ, নেয়ামত উল্লাহ এবং রায়হান বাদল বক্তব্য দেন।




