সংকটেও সম্ভাবনার এসএমই

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশের কর্মসংস্থানের ৮৫ শতাংশ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রায় এক-তৃতীয়াংশের চালিকাশক্তি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাত। ১ কোটি ১৭ লাখেরও বেশি উদ্যোক্তার হাত ধরে গড়ে ওঠা এই খাতটির ওপর দেশের ৩ কোটি ৬ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। গ্রামীণ ও নগর অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হওয়া সত্ত্বেও নিজস্ব পুঁজির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, প্রযুক্তির অভাব এবং কাঁচামালের চড়া মূল্যের কারণে বর্তমানে বাংলাদেশের এই সম্ভাবনাময় খাতটি এক মিশ্র বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি ও করপোরেট দুনিয়ার সামগ্রিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট বোঝা যায়, এসএমই হলো প্রবৃদ্ধির আসল ইঞ্জিন। গত এক দশকে দেশে নতুন করে ৩৯ লাখ ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, যার বড় অংশই ছড়িয়ে আছে গ্রামগঞ্জে। শহরের ৪৩ লাখ প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি গ্রামে গড়ে ওঠা প্রায় ৭৪ লাখ প্রতিষ্ঠান এখন গ্রামীণ অর্থনীতির মূল শক্তি। আর এই পুরো রূপান্তরের সবচেয়ে ইতিবাচক দিকটি হলো নারী উদ্যোক্তাদের জোয়ার— গত ১০ বছরে তাদের সংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি।
দেশের মোট শিল্প কর্মসংস্থানের সিংহভাগ, অর্থাৎ প্রতি ১০০ জনের মধ্যে ৮৫ জনেরই কর্মসংস্থান হয় এই খাতে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রায় এক-তৃতীয়াংশই আসে এই ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের হাত ধরে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের দিকে তাকালে দেখা যায়, সম্ভাবনার তুলনায় বাংলাদেশের অর্জন এখনো কিছুটা কম। জিডিপিতে এ দেশের এসএমই খাতের অবদান যেখানে ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ, সেখানে চীন কিংবা শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলোয় এটি অর্ধেক বা তারও বেশি। এমনকি ভারত ও পাকিস্তানের চেয়েও বাংলাদেশ কিছুটা পিছিয়ে আছে।
তবে এই খামতি পুষিয়ে নিতে ২০৩০ সালের মধ্যে এই অবদান ৩৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার একটি বড় লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। বিশেষ করে চামড়া, পাট, হস্তশিল্প কিংবা আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি, হালকা প্রকৌশল ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের মতো সম্ভাবনাময় খাতগুলো এই লক্ষ্য ছোঁয়ার মূল হাতিয়ার হতে পারে।
কিন্তু এই সুন্দর সম্ভাবনার পিঠে এক মস্ত বড় সংকটের গল্পও আছে। মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় দেশের লাখ লাখ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এখন এক কঠিন সময় পার করছেন। ব্যাংক ঋণের নানা জটিলতার কারণে এই খাতের বড় দুর্বলতা হলো— এগুলো এখনো সিংহভাগ ক্ষেত্রে নিজস্ব জমানো পুঁজির ওপর ভর করে চলে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তির অভাব। বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর অটোমেশনের যুগে পা রাখছে, তখন পুঁজি আর দক্ষতার অভাবে ছোট ব্যবসায়ীরা সেই পুরনো পদ্ধতিতেই লড়ে যাচ্ছেন।
এর ফলে তাদের ব্যবসার স্থায়িত্ব বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়ছে। সাম্প্রতিক জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে কাঁচামালের দাম যখন আকাশচুম্বী, তখন সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা চিন্তা করে উদ্যোক্তারা পণ্যের দাম বাড়াতে পারছেন না। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়লেও লভ্যাংশ আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে, যা অনেক ব্যবসাকেই বন্ধের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
তবে এই সংকটের অন্ধকারেই লুকিয়ে আছে উত্তরণের নতুন পথনকশা। এ দেশের উদ্যোক্তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো যেকোনো দুর্যোগে পিঠ ঠেকলেও আবার ঘুরে দাঁড়ানোর এক জাদুকরী ক্ষমতা। এখন প্রয়োজন শুধু রাষ্ট্র ও নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট নীতিগত সহযোগিতা।
উদ্যোক্তারা বলছেন, এই খাতকে বাঁচাতে হলে সবার আগে নিজস্ব পুঁজির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ব্যাংক থেকে সহজে ঋণ পাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। জামানতহীন ঋণের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিমকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত করা দরকার, যাতে প্রান্তিক ও নারী উদ্যোক্তারা সহজে ঋণ পান। পাশাপাশি, সরকারি উদ্যোগে ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য ডিজিটাল বিপণন ও আধুনিক প্রযুক্তির বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি।
দেশের বড় বড় করপোরেট কোম্পানিগুলো যাতে তাদের প্রয়োজনীয় কাঁচামালের একটা অংশ দেশীয় হালকা প্রকৌশল বা গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিজের মতো এসএমই খাত থেকে কেনে, সেই বাধ্যবাধকতা তৈরি করতে হবে। এর সঙ্গে যদি কর ও ভ্যাট প্রদানের প্রক্রিয়া পুরোপুরি অনলাইনে এনে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আগামী কয়েক বছরের জন্য একটু বাড়তি ছাড় দেওয়া যায়, তবে তারা হয়রানি ভুলে ব্যবসার প্রসারে পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারবেন।
বাংলাদেশ যদি সামনের দিনগুলোয় একটি ট্রিলিয়ন ডলারের শক্তিশালী অর্থনীতির দিকে সফলভাবে পা বাড়াতে চায়, তবে এই কোটি উদ্যোক্তাকে সুরক্ষিত রাখার কোনো বিকল্প নেই। মাঠপর্যায়ের এই বাস্তব সংকটগুলোকে দ্রুত সমাধান করা এখন সময়ের দাবি; কারণ এই সাধারণ উদ্যোক্তাদের টিকে থাকার লড়াইয়ের ওপরেই নির্ভর করছে বাংলাদেশের আগামী দিনের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি।




