৭৪ শতাংশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানই দেয়নি রিটার্ন জমা

সংগৃহীত ছবি
কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) থাকলেও রিটার্ন জমা দেয়নি ১ লাখ ১৮ হাজার ৩০০ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। টিআইএন থাকা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১ লাখ ৬০ হাজার। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হিসাবে সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে রিটার্ন দাখিলের বাইরে আছে ৭৪ শতাংশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, বৈশ্বিক সংকটে মুনাফায় ধাক্কা ও দুর্বল নজরদারির কারণে মূলত এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এনবিআরের তথ্য বলছে, সদ্য বিদায়ী (২০২৫-২৬) অর্থবছরে রিটার্ন জমা দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে আয়কর আদায় হয়েছে প্রায় ৫৫ হাজার কোটি টাকা। এ প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানালেন, অনেক প্রতিষ্ঠান রিটার্ন জমা দেওয়ার বাইরে থাকায় বড় ধরনের রাজস্ব আদায় কমছে। তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তুলনায় আয় বাড়ছে এ খাতে। ওই বছর রিটার্ন জমা দিয়েছিল প্রায় সাড়ে ৩৯ হাজার প্রতিষ্ঠান এবং সেখান থেকে রাজস্ব আদায় হয় প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা।
বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন আগামীর সময়কে বললেন, ‘শুধু টিআইএন নিবন্ধন বাড়ালেই হবে না, কতজন নিয়মিত রিটার্ন দিচ্ছেন এবং কর পরিশোধ করছেন, সেটিই আসল বিষয়। কর প্রশাসনের সক্ষমতা বাড়িয়ে নিবন্ধিত করদাতাদের নিয়মিত অনুসরণ (ফলোআপ) করতে হবে। একই সঙ্গে ঝুঁকিভিত্তিক অডিট, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং আইন প্রয়োগ জোরদার না করলে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো কঠিন হবে।’
তার মতে, আগে বিদ্যমান করদাতাদের কাছ থেকেই পূর্ণাঙ্গ কর আদায় নিশ্চিত করা গেলে সরকারের রাজস্ব বাড়তে পারে উল্লেখযোগ্যভাবে।
বিদ্যমান আয়কর আইন অনুযায়ী, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের রিটার্ন দাখিলের শেষ সময় ছিল ১৫ মার্চ। পরে রিটার্ন জমা বাড়াতে এনবিআর দুই দফায় সময় বাড়িয়ে যথাক্রমে ১৫ এপ্রিল এবং ১৫ মে পর্যন্ত সুযোগ দেয়। এরপরও প্রত্যাশিত সংখ্যক প্রতিষ্ঠান দাখিল করেনি রিটার্ন।
এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তৎকালীন সরকার-সমর্থক অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিক দেশ ছেড়েছেন বা আত্মগোপনে রয়েছেন। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকেই রিটার্ন জমা দিতে পারেনি।
এ ছাড়া কর আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন না হওয়া, কোম্পানির অডিটে দীর্ঘসূত্রতা, কর সচেতনতার অভাব, কর্মকর্তাদের দুর্বল নজরদারি এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির বিস্তারও রিটার্ন দাখিল কম হওয়ার অন্যতম কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। অনেক নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান ব্যবসা বন্ধ করে দিলেও আইনগত জটিলতার কারণে এখনো এনবিআরের তালিকায় সক্রিয় হিসেবে রয়েছে।
তবে এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, এখন আগের মতো রিটার্ন না দিয়ে পার পাওয়া সহজ নয়। কারণ ব্যাংকঋণ নেওয়া, ঋণপত্র (এলসি) খোলা, সরকারি দরপত্রে অংশগ্রহণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র প্রয়োজন হয়। ফলে ধীরে ধীরে রিটার্ন দাখিলের প্রবণতা বাড়বে বলে তারা আশা করছেন।
নাম প্রকাশে অনাগ্রহী এনবিআরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বললেন, যেসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এখনো আয়কর রিটার্ন জমা দেয়নি, তাদের বিরুদ্ধে ধাপে ধাপে নোটিস জারি করা হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নোটিসের জবাব না দিলে ব্যাংক হিসাব জব্দ, ব্যাংক হিসাব স্থগিতসহ আয়কর আইনে থাকা অন্যান্য ব্যবস্থা নিতে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি জানালেন, বর্তমানে ব্যাংকঋণ, ঋণপত্র (এলসি) খোলা, সরকারি দরপত্রে অংশগ্রহণসহ বিভিন্ন সেবা পেতে প্রয়োজন হয় আয়কর রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র। ফলে ব্যবসা কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে চালিয়ে যেতে রিটার্ন দাখিল না করে পার পাওয়ার সুযোগ দিন দিন সীমিত হয়ে আসছে।




