সিপিডির পর্যালোচনা
বিদ্যুৎ খাতের বরাদ্দের ৯৮ শতাংশই জীবাশ্ম জ্বালানির দখলে

এআই ছবি
বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে বরাদ্দের মাত্র ২ শতাংশ রাখা হয়েছে নবায়নযোগ্য বা সবুজ জ্বালানির জন্য; বাকি ৯৮ শতাংশই রয়ে গেছে ঐতিহ্যগত জীবাশ্ম জ্বালানির দখলে।
বাইরে থেকে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ও সৌরবিদ্যুতে একধরনের প্রণোদনা দেওয়ার আভাস থাকলেও, সরকারের নীতি ও রাজস্ব কাঠামোতে এখনো জীবাশ্ম জ্বালানির প্রতিই পক্ষপাত স্পষ্ট।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট পর্যালোচনা করে এই পর্যবেক্ষণ দিয়েছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
আজ বুধবার সকালে রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডি কার্যালয়ে আয়োজিত ‘২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট: বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত কী পেল’ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এই তথ্য জানানো হয়। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট হেলেন মাশিয়াত প্রিয়তী।
বরাদ্দের হালচাল
সিপিডির পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রস্তাবিত বাজেটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের জন্য মোট ১৭ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ২ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। তবে মোট জাতীয় বাজেটের আকার অনুযায়ী এই খাতের হিস্যা ২ দশমিক ১৫ শতাংশ থেকে কমে ১ দশমিক ৮৫ শতাংশে নেমে এসেছে।
এর মধ্যে বিদ্যুৎ বিভাগের বরাদ্দ প্রায় ৩ দশমিক ৯ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৯৯৬ কোটি টাকায়। অন্যদিকে, অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের বরাদ্দ বেড়েছে প্রায় ৭২ শতাংশ।
সৌরবিদ্যুৎ ও ইভিতে কর ছাড়ের ইতিবাচক হাওয়া
প্রস্তাবিত বাজেটে প্রথমবারের মতো সৌরবিদ্যুৎ খাতকে বিশেষ কর ছাড় দেওয়া হয়েছে, যাকে স্বাগত জানিয়েছে সিপিডি। এই খাতের জন্য ২০৩৫ সাল পর্যন্ত শূন্য শতাংশ করহার বা কর অবকাশ (ট্যাক্স হলিডে) প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি সোলার প্যানেল, ইনভার্টার ও লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির উচ্চ আমদানি শুল্ক উল্লেখযোগ্য হারে কমানো হয়েছে। ভোক্তারা সৌরবিদ্যুতের বিল পরিশোধে ৫ শতাংশ কর রেয়াত (রিবেট) পাবেন। এ ছাড়া পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক গাড়ির (ইভি) ব্যবহার বাড়াতে চার্জিং স্টেশনের কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার ও নিবন্ধন ফি কমানো হয়েছে।
বহাল কয়লা ও এলএনজির দাপট
একদিকে সৌরবিদ্যুতে ছাড় দেওয়া হলেও, অন্যদিকে এলএনজি ও কয়লার মতো দূষণকারী জ্বালানিতে বিপুল আর্থিক সুবিধা বহাল রাখা হয়েছে। এলএনজি আমদানিতে ভ্যাট অব্যাহতি বজায় থাকায় এটি এখনো সবচেয়ে কম করযুক্ত জ্বালানি। পাশাপশি বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লা আমদানিতে শুল্ক-সুবিধার মেয়াদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। বড়পুকুরিয়া ও দীঘিপাড়া থেকে আগামী অর্থবছরে ৬ লাখ টন দেশীয় কয়লা উত্তোলনের লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেছেন, ‘সরকারের প্রশাসনযন্ত্র এবং মন্ত্রণালয়ের ভেতরে এখনো জীবাশ্ম জ্বালানিকেন্দ্রিক মনমানসিকতা রয়ে গেছে। বাইরের দিক থেকে একরকমের প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে এখনো পছন্দ জীবাশ্ম জ্বালানি। এই প্রস্তাবিত বাজেটটি রাজস্ববৈষম্য উতরাতে পারেনি।’
উপেক্ষিত গ্রিড আধুনিকায়ন ও সৌর সেচ
সংস্থাটি মনে করে, বিদ্যুৎ খাতের মূল সমস্যা এখন উৎপাদন নয়, বরং সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থা। গ্রিড আধুনিক না করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব নয়। কিন্তু ট্রান্সফরমার, কন্ডাক্টর বা মিটারের মতো গ্রিড সরঞ্জামের ওপর এখনো ৬০ থেকে ৯৩ শতাংশ পর্যন্ত উচ্চ করভার বহাল রাখা হয়েছে, যা সংস্কারের গতি কমিয়ে দেবে।
একইভাবে, বাজেট বক্তব্যে মাত্র ৯৮টি সৌর সেচ পাম্প ও ২৭টি সৌর কূপের কথা উল্লেখ করায় কৃষি খাতে সৌর সেচের বিষয়টি বড় পরিসরে উপেক্ষিত রয়ে গেছে বলে মনে করে সিপিডি। প্রান্তিক কৃষকদের জন্য আলাদা প্রণোদনা ছাড়া এই খাতের বিস্তার সম্ভব নয়।
মিডিয়া ব্রিফিংয়ে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআরইএ) সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ, ডেমোক্রেটিক বাজেট মুভমেন্টের জেনারেল সেক্রেটারি মনোয়ার মোস্তফা এবং ইডকলের চিফ রিস্ক অফিসার মোহাম্মদ জাবেদ ইমরান।




