সাক্ষাৎকার
এক মিনিটেই সিদ্ধান্ত দেওয়ার নির্দেশনা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আগামীর সময়: বাবার কথা মনে পড়ে?
মনোয়ার হোসেন: প্রতিদিন প্রতি পদক্ষেপেই মনে পড়ে।
আগামীর সময়: বিশেষ করে কী মনে পড়ে?
মনোয়ার হোসেন: যখন অসুস্থ ছিলেন তখন বাড়ি থেকে অফিস যাওয়ার সময় বাবাকে দেখে যেতাম। অফিস থেকে ফিরে প্রথমেই তার কাছে ছুটে যেতাম। এটি এখনো আমাকে বেশ কষ্ট দেয়।
আগামীর সময়: তার কোন নির্দেশনা এখনো মেনে চলেন?
মনোয়ার হোসেন: তিনি বলতেন কাউকে অপেক্ষায় দাঁড় করিয়ে রাখবে না। কোনো কাজ জমিয়ে (পেন্ডিং) রাখা যাবে না। ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ যাই হোক এক মিনিটে সিদ্ধান্ত। এক মিনিট দেরি করা মানে ১৪ হাজার মিনিট ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ ১৪ হাজার কর্মী আমাদের।
আগামীর সময়: বেশি পড়ালেখা না করেও কত স্মার্ট ছিলেন তিনি।
মনোয়ার হোসেন: জীবন থেকে সবকিছু শিখেছেন। ঠেকে শিখেছেন, ঠকে শিখেছেন। লাভ-লোকসানেও শিখেছেন। আল্লাহর রহমত ও মায়ের দোয়া ছিল ওনার ওপর।
আগামীর সময়: একটা উদাহরণ দেন?
মনোয়ার হোসেন: আনোয়ার ল্যান্ডমার্কের এমডি যখন বাবার কাছে গেলেন, তাকে জিজ্ঞেস করলেন বিল্ডিং তো বানিয়েছো, জানালা রেখেছো। আলো-বাতাসের সঙ্গে সঙ্গে আজানের ধ্বনিও শোনা যাবে।
আগামীর সময়: আপনার দাদির সঙ্গে বাবার কোনো স্মৃতি আছে?
মনোয়ার হোসেন: বাবা দাদিকে অসম্ভব সম্মান করতেন। একবার এক অনুষ্ঠানে মা মানে কী— এ রকম প্রশ্ন করা হয়েছিল তাকে। তিনি প্রথমে কেঁদে দিলেন। তারপর বললেন, মা মানে ‘মা’ই। যার মা নেই তার মতো অভাগা এই পৃথিবীতে আর কেউ নেই। দাদিকে বলা ছাড়া বাবা কোনো কাজ শুরু করতেন না।
আগামীর সময়: আর কোনো নির্দেশনার কথা মনে পড়ে?
মনোয়ার হোসেন: বাবা বলতেন, কেউ গরিব হয়ে জন্মায় না। কাউকে নিচু বা ছোট করে দেখবে না। কোনো বিষয়ে যদি কেউ মনে কষ্ট পায় এবং বদদোয়া দেয়, আল্লাহ যদি কবুল করে নেন, তাহলে তোমার জীবনে সর্বনাশ হয়ে যাবে।
আগামীর সময়: বাবার কি কোনো ইস্যুতে কোনো কঠিন নির্দেশ ছিল?
মনোয়ার হোসেন: তিনি বলতেন— বিড়ি-সিগারেটের ব্যবসায় অনেক লাভ। এই লাভজনক ব্যবসায় যাতে আমরা কখনো না জড়িয়ে পড়ি। বড় ছেলে হিসেবে আমার প্রতি অনেক গোপন নির্দেশনা ছিল; যার সবগুলো আমি বলতে পারব না। সেভাবে আমাকে তৈরিও করেছেন। যেন ওনার অনুপস্থিতিতে বাবার অভাব পূরণ করে পরিবারের দায়িত্ব পালন করতে পারি।
আগামীর সময়: তার প্রিয় কোন জিনিস আপনাকে এখনো ভাবায়?
মনোয়ার হোসেন: তিনি কাউকে খালি হাতে ফেরাতেন না। কিন্তু ভিক্ষুকদের খুব তিরস্কার করতেন। বলতেন— ভিক্ষা দিলে এরা কাজ করবে না। ভিক্ষা না পেলে ঠিকই পেটের তাগিদে কোনো না কোনো কাজ করবে।
আগামীর সময়: শুনেছি তিনি তো অনেক দান-খয়রাত ও সমাজসেবা করতেন?
মনোয়ার হোসেন: (কিছুক্ষণ চুপ) ঠিকই শুনেছেন। কিন্তু বিস্তারিত বলতে চাই না। বাবার নিষেধ আছে।
আগামীর সময়: তিনি সবচেয়ে গুরুত্ব দিতেন কোন বিষয়ে?
মনোয়ার হোসেন: সব কর্মীকে তুমি করে সম্বোধন করতেন। কর্মীদের বলতেন, তোমার ছেলেমেয়ে যেন ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হয়ে আমার প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে আসে। ছোটখাটো চাকরির জন্য যেন না আসে। আমাদের একজন গার্ড ছিল। নামটা এই মুহূর্তে মনে করতে পারছি না। তার দুই সন্তান ডাক্তার হওয়ার পেছনে বাবার উৎসাহ ও প্রেরণা ছিল।
আগামীর সময়: বাবা যেদিন মারা গেলেন?
মনোয়ার হোসেন: আমি কী কাঁদব! আশপাশের লোকজন পাড়া-প্রতিবেশী এত বেশি কাঁদছিলেন, তাদের আবেগ দেখে আমি নিজেই অবাক। বাবা ছোট-বড় সবার সঙ্গে সহজে মিশতে পারতেন। খোঁজখবর রাখতেন। তাই বাবার প্রতি তাদের এত দরদ।
আগামীর সময়: আপনাদের ১৪ হাজার কর্মী। তাদের বেতন দেন কখন?
মনোয়ার হোসেন: মাস শেষ হওয়ার আগে— অর্থাৎ ২৫ তারিখে। রমজানে বোনাস দেওয়া হয় ঈদের ১৫ দিন আগে। কোরবানির ঈদেও একই রকম।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: রফিকুল বাহার
যুগ্ম সম্পাদক, আগামীর সময়






