আমার বাবা আমার আদর্শ!

আমার বাবা আনোয়ার হোসেন— বাংলাদেশের একজন খ্যাতনামা ব্যবসায়ী, অনেকের কাছে তিনি ছিলেন অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল নাম; আমার কাছে তিনি শুধু একজন সফল মানুষ নন; ছিলেন আমার জীবনের আদর্শ। তার শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনযাপন, কঠোর পরিশ্রম এবং নীতির প্রতি অবিচল বিশ্বাস আমাকে আজও প্রভাবিত করে। আমি তার জীবনকে শুধু দেখিনি, গভীরভাবে অনুভব করেছি— এবং আজও সে পথেই চলার চেষ্টা করি।
আমি যখন মায়ের গর্ভে, তখন থেকেই বাবা প্রায়ই মাকে বলতেন— ছেলে না মেয়ে আসছে জানি না, তবে যে-ই আসুক, আমার জন্য সৌভাগ্য বয়ে আনবে। আশ্চর্যভাবে, সেই সময় থেকেই তার ব্যবসায় একের পর এক সাফল্য আসতে শুরু করে। বাবা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, আমি তার জন্য ভাগ্যবতী। সেই বিশ্বাস থেকেই চার-পাঁচ মাস বয়স থেকেই আমাকে তার সঙ্গে ব্যবসার বিভিন্ন জায়গায়, অফিসে, দোকানে নিয়ে যেতেন। যেন তার বিশ্বাস সত্যি হয়ে উঠছিল।
বাবা অসম্ভব স্নেহ করতেন। ব্যবসার চাকা ঘুরতে থাকলে তিনি সবার কাছে গর্ব করে বলতেন, ‘মালা আমার ভাগ্যবতী মেয়ে।’ নিজের হাতেই আমার যত্ন নিতেন। তার বিশ্বাস ছিল, আমি সঙ্গে রাখলে ভাগ্য সহায় হবে।
১৯৬৮ সালে দেশে বিয়ের জন্য আলাদা কোনো শাড়ির প্রচলন ছিল না। তখনকার সময়ে দূরদর্শী চিন্তা থেকে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন— বিয়ের শাড়ি তৈরি করবেন। এ উদ্যোগের ‘মালা শাড়ি’। অল্প সময়ের মধ্যেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং বিয়ের অনিবার্য অনুষঙ্গ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। সে সময়ে সাড়ে ছয় কোটি মানুষের দেশে নিজস্ব কোনো ব্র্যান্ড ছিল না। ‘মালা শাড়ি’কে জনপ্রিয় করতে তিনি টেলিভিশন বিজ্ঞাপন তৈরি করেন। সাদা-কালো সেই বিজ্ঞাপন, শাড়ির রঙের বৈচিত্র্য, মনোমুগ্ধকর নকশা ও গুণগত মান— সব মিলিয়ে নতুন ধারা সৃষ্টি হয়। বাবা নিজেও শাড়ির ডিজাইন করতেন। তার অ্যাকাডেমিক পড়াশোনা বেশি না হলেও সৃজনশীলতায় ছিলেন অনন্য।
প্রায়ই বলতেন, ‘অ্যাকাডেমিক সনদপত্র সবসময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নয়; জীবনে কিছু অর্জন করতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সাহস এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা।’ উচ্চশিক্ষার প্রতি তার গভীর আগ্রহ ছিল; কিন্তু সুযোগ পাননি— এ নিয়ে তার মনে আক্ষেপ ছিল। তবে কখনো এটিকে দুর্বলতা হিসেবে দেখেননি; বরং সাহস ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে জীবনের প্রতিটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছেন।
বাবা আজ আমাদের মাঝে নেই; কিন্তু সেই শূন্যতাকে আঁকড়ে ধরে রাখতে চাই না; বরং তার আদর্শ ও শিক্ষাকে সঙ্গে নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে চাই। ছোটবেলা থেকেই বাবার সঙ্গে অফিসে যেতাম, ব্যবসার নানা খুঁটিনাটি শিখেছি। তিনি বলতেন, ‘সাহস রাখবে, ভয় পাবে না। কঠোর পরিশ্রম করবে। কোনো সমস্যার সামনে থেকে পিছু হটবে না। কেউ পাশে না থাকলেও সত্য বলতে দ্বিধা করবে না।’
তার একটি বিশেষ ‘বিজনেস থিওরি’ ছিল— ‘হিসাব’। তিনি বলতেন, ব্যবসার মূল শক্তি হলো সঠিক হিসাব জানা। এক কথায়, অ্যাকাউন্টিং, মার্কেটিং— সবক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত শৃঙ্খলাবদ্ধ। সময়, নিয়ম ও শৃঙ্খলাকে তিনি ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে ব্যবসার প্রতিটি ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতেন।
বাবা বেঁচে থাকতে প্রতি সপ্তাহের ছুটির দিনে বাড়িতে উৎসবের পরিবেশ তৈরি হতো। আমরা সাত ভাইবোন এবং আমাদের সন্তানরা যে যেখানে থাকি না কেন, বাবার ডাকে সাড়া দিয়ে একত্রিত হতাম। শুক্রবার ছিল সেই সাপ্তাহিক মিলনমেলা। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলত খাওয়া-দাওয়া, আড্ডা, আনন্দ আর হাসিখুশি। তিনি ছিলেন প্রাণবন্ত, আনন্দপ্রিয় মানুষ— জীবনকে উদযাপন করতেন সহজ, স্বাভাবিকভাবে।
তিনি সবসময় আমাকে উৎসাহ দিতেন এবং বলতেন, ‘তোমাকে নিজের ব্যবসা গড়ে তুলতে হবে।’ তার এ অনুপ্রেরণাই আমাকে এগিয়ে যেতে— আত্মবিশ্বাসী, সৃজনশীল হতে শিখিয়েছে।
বাবার চলে যাওয়ার পর নিজ উদ্যোগে ‘মালা ডিজাইন অ্যান্ড আর্কিটেকচার’ নামে আমার নিজস্ব ইন্টেরিয়র ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করি। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বাসাবাড়ি— নির্মাণ, ডিজাইন ও ইন্টেরিয়রের কাজ করছি।
বাবার একটি কথা আমি আজও ভুলতে পারি না— তিনি বলতেন, ‘আমি মানুষের জন্য কাজ করতে চাই।’ এ কথার গভীরতা অসীম। আমি চাই, আমার কাজের মাধ্যমেও তেমন কিছু করতে— যা মানুষের উপকারে আসে, যা অর্থবহ।
আমি গর্ব করে বলি— আমি আনোয়ার হোসেনের মেয়ে। তিনি একজন অবিস্মরণীয় মানুষ। আমার দেখা ‘শ্রেষ্ঠ বাবা’।
লেখক: আনোয়ার হোসেনের মেয়ে






