সরকারের ১৮০ দিন - সাক্ষাৎকার
কারসাজির বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হবে

মাসুদ খান
নতুন কোম্পানি না আসা, কারসাজি ও আস্থার সংকটসহ নানা অনিয়মের কারণে শেয়ারবাজার থেকে মুখ ফেরাচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। এমন প্রেক্ষাপটে দায়িত্ব নেওয়া নতুন সরকারের ছয় মাস পার হলো। বিনিয়োগকারীদের কতটুকু আস্থা ফিরেছে এবং সংস্কারের অগ্রগতি নিয়ে আগামীর সময়ের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যান মাসুদ খান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিশেষ প্রতিনিধি নুরুজ্জামান তানিম
আগামীর সময়: দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিকল্পনার কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে?
মাসুদ খান: যে সময় দায়িত্ব পেয়েছি, এর তুলনায় কিছুটা এগিয়ে আছি। অর্থনীতি ও ব্যাংক খাত বড় চ্যালেঞ্জের মধ্যে ছিল। এর মধ্যেও ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার, মার্জিন বিধিমালা পরিবর্তন, ডাইরেক্ট লিস্টিং, বন্ড মার্কেট, মিউচুয়াল ফান্ড ও সিকিউরিটিজ আইন সংস্কারের কাজ এগিয়েছে। সব উদ্যোগের ফল একসঙ্গে দেখা যাবে না। লক্ষ্য হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত পরিবর্তন।
আগামীর সময়: বিনিয়োগকারীর আস্থা ফেরাতে কী পরিবর্তন আনতে চান?
মাসুদ খান: দীর্ঘদিনের অনিয়ম, কারসাজি ও দুর্বল নজরদারির কারণে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। শুধু সূচক বাড়িয়ে আস্থা ফেরানো যাবে না। বিনিয়োগকারীকে দেখতে হবে— নিয়ম সবার জন্য সমান, এর অর্থ নিরাপদ এবং অনিয়ম হলে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সুরক্ষিত ও নিয়মতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি হলেই প্রকৃত আস্থা ফিরবে।
আগামীর সময়: কারসাজির বিরুদ্ধে কি ফৌজদারি মামলাও হবে?
মাসুদ খান: সাধারণ ঘটনায় প্রয়োজন অনুযায়ী জরিমানা করা হবে। কিন্তু গুরুতর বা উচ্চ প্রোফাইলের ঘটনায় শুধু জরিমানা করে থামতে চাই না। প্রয়োজন হলে ফৌজদারি মামলাও করা হবে। গুরুতর অনিয়ম করলে শুধু অর্থদণ্ড দিয়ে পার পাওয়া যাবে না।
আগামীর সময়: জরিমানা হয়, কিন্তু আদায় হয় না— এ সংস্কৃতি কীভাবে বদলাবেন?
মাসুদ খান: অতীতে অনেক জরিমানা আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে আদায় হয়নি। এ কারণে সিকিউরিটিজ আইন ও সংশ্লিষ্ট আইনি কাঠামো পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সিকিউরিটিজ ট্রাইব্যুনালের কার্যকারিতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
আগামীর সময়: ব্রোকারেজ হাউজে শতকোটি টাকা লোপাট— এমন ঘটনা আর কতবার?
মাসুদ খান: গ্রাহকের শত শত কোটি টাকা বা সম্পদ নিয়ে অনিয়ম কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাই ঝুঁকিপূর্ণ ব্রোকার চিহ্নিত করে নিয়মিত নজরদারির কাঠামো তৈরি করতে ডিএসইকে বলা হয়েছে। ঘটনা ঘটার পর তদন্তের চেয়ে ঝুঁকি আগে শনাক্ত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়াই লক্ষ্য।
আগামীর সময়: ভালো ও বড় কোম্পানি আনতে ডাইরেক্ট লিস্টিং কতটা কার্যকর?
মাসুদ খান: ভালো ও বড় কোম্পানি ছাড়া বাজারের গভীরতা তৈরি সম্ভব নয়। গত বছরের আইপিও বিধিমালায় কিছু সমস্যা ছিল। তাই বিকল্প পথ হিসেবে ডাইরেক্ট লিস্টিংকে গুরুত্ব দিচ্ছি। আমি নিজেও প্রায় দুই সপ্তাহ কাজ করে বিধিমালার খসড়া তৈরি করেছি। অনুমোদনের পর সম্ভাবনাময় কোম্পানিগুলোকে সরাসরি তালিকাভুক্তির জন্য আহ্বান জানাব।
আগামীর সময়: বন্ড মার্কেটকে এবার কীভাবে কার্যকর করবেন?
মাসুদ খান: বন্ড মার্কেট শক্তিশালী না হওয়ার পেছনে মূল্য নির্ধারণ ও তালিকাভুক্তির খরচ বড় সমস্যা। ডিএসইর সঙ্গে আলোচনা করে মূল বোর্ডে বন্ড তালিকাভুক্তির কনসেন্ট ফি ও সংশ্লিষ্ট খরচ কমানোর বিষয়ে সম্মতি পাওয়া গেছে। আশা করছি, শিগগির কয়েকটি বড় বন্ড মূল বোর্ডে লেনদেন শুরু করবে।
আগামীর সময়: এআইভিত্তিক সার্ভিল্যান্স কি কারসাজি ধরতে পারবে?
মাসুদ খান: আধুনিক বাজারে শুধু মানুষের ওপর নির্ভর করে নজরদারি যথেষ্ট নয়। অস্বাভাবিক মূল্য পরিবর্তন, একই ধরনের অ্যাকাউন্টের লেনদেন বাড়ানোর মতো বিষয় দ্রুত শনাক্ত করতে প্রযুক্তি প্রয়োজন। প্রথমে ডিএসইর স্বয়ংক্রিয় সার্ভিল্যান্স আপগ্রেড হবে, এরপর এআই যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা চালু করতে প্রায় এক বছর সময় লাগতে পারে।
আগামীর সময়: নিজেকে জবাবদিহির মধ্যে আনতে পারবেন?
মাসুদ খান: অবশ্যই। আমার বিরুদ্ধে কোনো আপসের উদাহরণ পাওয়া গেলে সাংবাদিকদের আমাকে প্রশ্ন করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। দীর্ঘ করপোরেট জীবনে অর্থ, ক্ষমতা বা অন্য সুবিধা নেওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু অনিয়মের সঙ্গে আপস করিনি। আমি যতদিন এখানে থাকব, আমার কারণে যেন কোনো অনিয়ম বা আপসের অভিযোগ না আসে— এটাই প্রত্যাশা।
আগামীর সময় : ভবিষ্যতে শেয়ারবাজারকে কোথায় দেখতে চান?
মাসুদ খান: এমন একটি শেয়ারবাজার রেখে যেতে চাই, যেখানে বিনিয়োগকারীর অর্থ নিরাপদ, বাজার স্বচ্ছ, শৃঙ্খলাপূর্ণ ও নিয়মভিত্তিক হবে। আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং ভালো কোম্পানি বাজারে আনার পরিবেশ তৈরি করা, এআইভিত্তিক নজরদারি, ব্রোকারদের জবাবদিহি, কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, শক্তিশালী বন্ড ও কমোডিটি মার্কেট গড়ে তুলতে চাই।






