ঢাবি অধ্যাপক আল-আমিন
অনিয়মে কম্প্রোমাইজে গেলে শেয়ারবাজার টিকবে না

ঢাবির ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন আল-আমিন। ছবি: আগামীর সময়
শেয়ারবাজারের অনিয়মের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আপস বা ‘গিভ অ্যান্ড টেকিং’ করা হলে এ বাজার টিকবে না বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন আল-আমিন। তার ভাষ্য, শেয়ারবাজারকে স্বাধীনভাবে পরিচালনা করতে হবে। একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে সরকারের প্রয়োজনীয় কর্তৃত্ব নিশ্চিত করা জরুরি।
মঙ্গলবার ‘ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টর উইক ২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে এসব কথা বলেন তিনি। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজ (বিএপিএলসি) ও বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমবিএ) যৌথভাবে সেমিনারটির আয়োজন করে।
আল-আমিন উল্লেখ করেন, শেয়ারবাজারের বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো ‘পাম্প অ্যান্ড ডাম্প’। এতে কোনো শেয়ারের দাম দ্রুত বাড়িয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করা হয়। পরে বড় পরিমাণ শেয়ার বিক্রি করে বের হয়ে যান কারসাজিকারীরা। এ ধরনের কারসাজি দ্রুত শনাক্ত করে ব্যবস্থা না নিলে বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তিনি বলেন, শেয়ারের দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদেরও যুক্ত করা হয়। পরে বড় বিনিয়োগকারীরা বের হয়ে গেলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ক্ষতির মুখে পড়েন। এতে বিনিয়োগকারীদের অর্থ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি বাজারে তারল্য সংকট তৈরি হয়।
অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধির ক্ষেত্রে কারা শেয়ার কিনছে, তা শনাক্ত করা কঠিন নয় বলে মন্তব্য করেন আল-আমিন। তিনি উল্লেখ করেন, কোনো শেয়ারের দাম মৌলভিত্তির বাইরে অস্বাভাবিকভাবে বাড়লে কারা শেয়ার কিনছে এবং কীভাবে লেনদেন হচ্ছে, তা তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলেই বোঝা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর হস্তক্ষেপের সদিচ্ছা থাকা জরুরি।
বড় অঙ্কের শেয়ার কেনার ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত থাকে বলেও উল্লেখ করেন ঢাবির এই শিক্ষক। তাই শুধু বড় অঙ্কের শেয়ার কেনা হয়েছে বলে বিষয়টি এড়িয়ে না গিয়ে লেনদেনের উদ্দেশ্য ও ধারাবাহিকতা বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে বাইরে থেকে প্রশ্ন তোলার আগে তাদের এনফোর্সমেন্ট অ্যাকশনের তথ্য দেখা উচিত বলে মন্তব্য করেন আল-আমিন। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) বিভিন্ন এনফোর্সমেন্ট অ্যাকশনে অনিয়ম কীভাবে শনাক্ত হয়েছে, কোন বিধান লঙ্ঘন হয়েছে এবং কার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তার বিস্তারিত তথ্য থাকে।
তিনি বলেন, এসব তথ্য না দেখে শুধু টকশোতে এসে কেন জরিমানা করা হলো বা কেন ব্যবস্থা নেওয়া হলো, এ ধরনের প্রশ্ন তোলা বাজারের জন্য ইতিবাচক নয়। এতে অনিয়মের দায় নেওয়ার সংস্কৃতিও তৈরি হয় না।
শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে আর্থিক প্রতিবেদনকে বিশ্বাসযোগ্য করার ওপর গুরুত্ব দেন আল-আমিন। তিনি বলেন, বিনিয়োগকারীরা যদি কোম্পানির আর্থিক বিবরণী বিশ্বাস করতে না পারেন, তাহলে শুধু বিনিয়োগ শিক্ষা দিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব নয়।
দেশে বিনিয়োগযোগ্য কোম্পানি ও পণ্যের সংকটকেও শেয়ারবাজারের বড় সমস্যা হিসেবে তুলে ধরেন তিনি। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের তালিকার তথ্য উল্লেখ করে আল-আমিন জানান, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ৩২টি কোম্পানি উৎপাদন বন্ধ অবস্থায় ছিল। এর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা একটি কোম্পানির শেয়ারের দাম ২০০২ সাল থেকে উৎপাদন বন্ধ থাকার পরও ১৪ টাকা থেকে বেড়ে ১২০ টাকা হয়েছে।
এ ধরনের ঘটনা শেয়ারবাজারের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি করে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আল-আমিন বলেন, বাজারে বিনিয়োগযোগ্য ভালো পণ্য না থাকলে শুধু বিনিয়োগ শিক্ষা দিয়ে মানুষকে বাজারে ধরে রাখা যাবে না। ট্রেজারি বিল ও বন্ডে তুলনামূলক কম ঝুঁকিতে ভালো রিটার্ন পাওয়া গেলে এবং শেয়ারবাজারে প্রতিদিন অস্থিরতা থাকলে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা কেন এ বাজারে আসবেন, সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, শেয়ারবাজারকে বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় করতে হবে। পাশাপাশি আর্থিক বিবরণীর বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে হবে। তাহলে দেশীয় বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীদেরও আকৃষ্ট করা সম্ভব হবে।
শেয়ারবাজারে কোনো ধরনের আপস না করার আহ্বান জানিয়ে আল-আমিন মন্তব্য করেন, আগের কমিশনও অনিয়মের ক্ষেত্রে ‘গিভ অ্যান্ড টেকিং’-এ যায়নি বলে তিনি মনে করেন। কারণ নিয়ন্ত্রক সংস্থা আপসের পথে গেলে শেয়ারবাজারের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়বে।



