ফেঁসে যাচ্ছে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান
- শ্রীপুর টাউনশিপের বন্ড কেলেঙ্কারি

শেয়ারবাজারে আলোচিত হাজার কোটি টাকার শ্রীপুর টাউনশিপ বন্ড কেলেঙ্কারিতে নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান এমজে আবেদিন অ্যান্ড কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার কারণে প্রতিষ্ঠানটির বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলে (এফআরসি) পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। এর আগে বন্ডের অর্থ ব্যবহারে অনিয়মের অভিযোগটি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) পাঠানো হয়েছিল। এবার সামনে এসেছে নিরীক্ষকের ব্যর্থতার বিষয়টিও।
বিএসইসির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, শ্রীপুর টাউনশিপ লিমিটেডের ১ হাজার কোটি টাকার বন্ডের অনুসন্ধান ও তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান এমজে আবেদিন অ্যান্ড কোম্পানির বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর কার্যক্রমের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানি শেষে কমিশন মনে করেছে, নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠানটি তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। এ কারণে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিষয়টি এফআরসিতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে বিএসইসির এনফোর্সমেন্ট বিভাগ।
তদন্তে উঠে আসে, বন্ডের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থের বড় অংশ প্রকল্পের উন্নয়নকাজে ব্যয় না করে অন্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে স্থানান্তর করা হয়েছে। বেক্সিমকো গ্রুপের আবাসন খাতের প্রতিষ্ঠান শ্রীপুর টাউনশিপ লিমিটেড রাজধানীর কাছে ‘মায়ানগর’ নামে একটি নগর গড়ে তোলার পরিকল্পনায় পাঁচ বছর মেয়াদি এই বন্ড ইস্যু করে। প্রকল্পে প্রায় ১৮ হাজার অ্যাপার্টমেন্টের পাশাপাশি হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পার্ক, শপিং মল ও বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের কথা ছিল। এর মালিকানায় বেক্সিমকোর ৭৫ শতাংশ এবং শ্রীপুর টাউনশিপ লিমিটেডের ২৫ শতাংশ অংশীদারত্ব ছিল। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্যই নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনে ১ হাজার কোটি টাকার জিরো কুপন বন্ডের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করা হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, বন্ডের অর্থের মধ্যে ৮০০ কোটি টাকার বেশি প্রকল্পের উন্নয়ন ব্যয় হিসেবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। তবে বিএসইসির তদন্তে অভিযোগ করা হয়, ওই অর্থের বিপরীতে প্রকল্পে কোনো বাস্তব নির্মাণকাজ হয়নি। তদন্ত চলাকালে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরাও প্রকল্পে কোনো বাস্তব নির্মাণকাজ না করার কথা জানিয়েছিলেন। স্থানান্তরিত অর্থ পরে সংশ্লিষ্ট মালিকপক্ষ ও শ্রীপুর টাউনশিপের ব্যবস্থাপনার কাছে ফেরত দেওয়া হয়েছিল বলেও তদন্তে উঠে আসে।
তদন্তকারীদের দাবি, শ্রীপুর টাউনশিপ ৩৩৫ কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধন দেখালেও ওই অর্থ স্থায়ীভাবে কোম্পানির হিসাবে ছিল না। একই অর্থ বারবার ব্যাংকে জমা ও উত্তোলনের মাধ্যমে কাগজে-কলমে মূলধনের চিত্র তৈরি করা হয়েছিল। তদন্তে এসব লেনদেনকে সম্ভাব্য প্রতারণা, জালিয়াতি, সংঘবদ্ধ আর্থিক অপরাধ ও অর্থ পাচারের অভিযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এ ঘটনায় অধিকতর ফৌজদারি তদন্তের জন্য বিএসইসি গত ২৬ জুলাই তদন্ত প্রতিবেদন সিআইডিতে পাঠায়। কমিশনের তদন্তে সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘনের পাশাপাশি সম্ভাব্য ফৌজদারি অপরাধের বিষয় উঠে আসায় এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এবার নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য এফআরসিতে পাঠানোর সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে বন্ডটির নিরীক্ষা কার্যক্রমও আলাদাভাবে আলোচনায় এসেছে।
বন্ডটির শতভাগ গ্যারান্টার ছিল আইএফআইসি ব্যাংক। প্রায় ৭ হাজার ১৭৩ জন সাধারণ বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে এ বন্ডের মাধ্যমে ১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ
করা হয়েছিল। ফলে অর্থের ব্যবহার নিয়ে ওঠা
অভিযোগের পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব পালনের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
এর আগে বন্ড ইস্যুতে অনিয়মের ঘটনায় বিএসইসি আইএফআইসি ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান ও সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আহমেদ শায়ান ফজলুর রহমানকে আজীবনের জন্য শেয়ারবাজার-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম থেকে নিষিদ্ধ করে এবং যথাক্রমে ১০০ কোটি ও ৫০ কোটি টাকা জরিমানা করে। এ ছাড়া বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামকে আজীবন নিষিদ্ধ, সাবেক কমিশনার ড. শামসুদ্দিন আহমেদকে পাঁচ বছরের জন্য নিষিদ্ধ এবং আইএফআইসি ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহ আলম সারওয়ারকে ৫ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়। আইএফআইসি ইনভেস্টমেন্টের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরান আহমেদকেও পাঁচ বছরের জন্য শেয়ারবাজারে নিষিদ্ধ করা হয়।



