কমোডিটি এক্সচেঞ্জ
জটিলতায় আটকে আছে
- ২০০৭ সালে আলোচনা শুরু হলেও চূড়ান্ত নিবন্ধন পায় ২০২৪ সালে

বিশ্বের উন্নত দেশসহ পার্শ্ববর্তী ভারত ও পাকিস্তানে অনেক আগে থেকে সক্রিয় ‘কমোডিটি এক্সচেঞ্জ’। দেশেও এটি চালু করতে কাজ চলছে। সব প্রস্তুতি শেষ হলেও নীতিগত কিছু জটিলতায় আটকে আছে এ উদ্যোগ। চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) মধ্যে তিনটি মৌলিক বিষয়ে মতভেদই এখন মূল বাধা।
যেখানে আটকে আছে উদ্যোগ: সব প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও প্রকল্পটি থমকে আছে তিনটি কারণে। প্রথমত, ব্রোকার লাইসেন্স অনুমোদন। কমোডিটি এক্সচেঞ্জে ট্রেডিং পরিচালনায় সাধারণ শেয়ারবাজারের মতো বিদ্যমান লাইসেন্স যথেষ্ট নয়; এখানে প্রয়োজন আলাদা ‘কমোডিটি ব্রোকার লাইসেন্স’। এটি চূড়ান্ত হলেও প্রায় ছয় মাস অনুমোদন মেলেনি। ফলে সিএসইর পরিকল্পিত ‘গো-লাইভ’ একাধিকবার পিছিয়েছে।
দ্বিতীয়ত, পণ্য নির্বাচন নিয়ে রয়েছে মতবিরোধ। সিএসই শুরুতে স্বর্ণ (গোল্ড), রুপা (সিলভার) ও অপরিশোধিত পাম অয়েল দিয়ে লেনদেন শুরু করতে চাইলেও কমিশন এখনো সায় দেয়নি। আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম স্বচ্ছ ও ঝুঁকিব্যবস্থাপনা সহজ হওয়ায় এটি দিয়ে শুরু করা যৌক্তিক বলে মনে করে সিএসই। কিন্তু এই প্রস্তাবিত পণ্য নির্বাচন নিয়েই আপত্তি তুলেছে কমিশন।
তৃতীয়ত, সিএসইর স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারের শেয়ার সংক্রান্ত বিষয়। কমিশন চায়, স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার তাদের ধারণকৃত শেয়ার ছেড়ে দিক। কিন্তু জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নিষেধাজ্ঞা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার শর্তের দ্বৈরথ সিদ্ধান্ত গ্রহণকে করে তুলেছে জটিল।
সিএসইর প্রস্তুতি: অনিশ্চয়তার মধ্যেও আশার আলো দেখাচ্ছে সিএসইর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা। আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক ম্যাচিং ইঞ্জিন, অর্ডার ম্যানেজমেন্ট এবং রিস্ক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম এরই মধ্যে স্থাপন করা হয়েছে। শ্রীলঙ্কাভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের কারিগরি সহায়তায় মূল সিস্টেম এবং ভারতীয় ভেন্ডরদের মাধ্যমে যুক্ত করা হয়েছে ডেরিভেটিভস ট্রেডিং সফটওয়্যার।
এখানে সরাসরি পণ্য কেনাবেচা হবে না; বরং ‘ফিউচারস কন্ট্রাক্ট’-এর মাধ্যমে লেনদেন হবে। ভবিষ্যতের দামের ওপর ভিত্তি করে হওয়া এ চুক্তি নির্দিষ্ট সময় শেষে নগদে নিষ্পত্তি হবে। এতে ব্যবসায়ীরা দামের অস্থিরতা সামলে কমাতে পারবেন ঝুঁকি।
প্রযুক্তির পাশাপাশি মানব সম্পদ উন্নয়নেও জোর দিয়েছে সিএসই। গত দুই বছরে কয়েক হাজার মানুষকে ধারণা দেওয়ার পাশাপাশি প্রায় ২০০ ট্রেডারকে প্রশিক্ষণ দিয়ে সনদ দেওয়া হয়েছে। প্রস্তুত করা হয়েছে অন্তত ১৫টি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান। প্রকল্পটির জন্য নির্ধারিত ১২০ কোটি টাকার বাজেটের মধ্যে এরই মধ্যে ব্যয় করা হয়েছে ৮০ কোটি টাকা।
সিএসইর প্রত্যাশা: আটকে থাকা তিনটি সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলেই দুই-তিন মাসের মধ্যে কমোডিটি এক্সচেঞ্জ চালু করা সম্ভব। এ বিষয়ে সিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম সাইফুর রহমান মজুমদার আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘কমোডিটি এক্সচেঞ্জ চালুর জন্য আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতিসম্পন্ন। প্রযুক্তি, জনবল, প্রশিক্ষণ— সবকিছুই এখন প্রস্তুত অবস্থায় আছে। আশা করছি খুব শিগগির বাজার চালু করা সম্ভব হবে। এই এক্সচেঞ্জ চালু হলে শেয়ারবাজারে একটি নতুন মাত্রা যোগ হবে। বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে, বাজারে স্বচ্ছতা বাড়বে।
কারসাজিমুক্ত স্বচ্ছ বাজার: দেশের শেয়ারবাজারের বড় সমস্যা তথ্য গোপন বা ইনসাইডার ট্রেডিং। কিন্তু কমোডিটি এক্সচেঞ্জে এই ঝুঁকি নেই বললেই চলে। স্বর্ণ বা তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকায় কারসাজির সুযোগ থাকবে না। এটি চালু হলে হেজিং সুবিধার পাশাপাশি স্বচ্ছতা বাড়বে।
বিএসইসির পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘কমোডিটি এক্সচেঞ্জের বিষয়টি কমিশন গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। সবকিছু
যাচাই-বাছাই করে টেকসই ও বিনিয়োগবান্ধব কাঠামো নিশ্চিত করেই অনুমোদনের সিদ্ধান্ত। বাজারের স্বচ্ছতা, ঝুঁকিব্যবস্থাপনা এবং বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই কমিশনের প্রধান অগ্রাধিকার।’
২০০৭ সালে শুরু হওয়া এই স্বপ্ন ২০২৪ সালে চূড়ান্ত নিবন্ধন পায়। ভারতের মাল্টি কমোডিটি এক্সচেঞ্জ (এমসিএক্স) এবং পাকিস্তান মার্কেন্টাইল এক্সচেঞ্জের (পিএমইএক্স) অভিজ্ঞতায় অনুপ্রাণিত হয়েই গড়ে উঠছে বাংলাদেশের এই প্রথম কমোডিটি এক্সচেঞ্জ। এখন শুধু চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষা।




