সম্ভাবনার বিপরীতে বহুমুখী সংকট
- ভোলার জিআই পণ্য ‘মহিষা দই’

ভোলার ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী মহিষের দুধের কাঁচা টক দই ‘মহিষা দই’। স্বাদ ও পুষ্টিগুণের কারণে সারা দেশে সমাদৃত এ দই পেয়েছে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি। জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ৮৫টি চরে ৩ হাজার ২৫০ জন খামারি ১ লাখ ২৪ হাজার মহিষ পালন করে প্রতিদিন ৯ টন দই উৎপাদন করছেন। বছরে ৮২ কোটি টাকার দই বিক্রির মাধ্যমে ৬ শতাধিক প্রতিষ্ঠান ও অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। দেশব্যাপী ব্যাপক চাহিদা ও বিদেশে রপ্তানির সুযোগ থাকলেও নানা প্রতিবন্ধকতায় পণ্যটি অস্তিত্ব সংকটে।
মহিষ পালনের বড় চ্যালেঞ্জ চারণভূমির তীব্র সংকট। এপ্রিল থেকে নভেম্বর পর্যন্ত চরে মহিষ পালনের সুযোগ থাকলেও ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত জমির দুই-তৃতীয়াংশ তরমুজ ও সবজি চাষিদের দখলে যায়। বৈরাগী চরের মহিষ মালিক মো. মামুন আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘আমরা কয়েকজন মিলে ৮৩ একর জমি আট মাসের জন্য একরপ্রতি ৮ হাজার টাকায় অধিগ্রহণ করে ১ হাজারের বেশি মহিষ পালন করি। কিন্তু বাকি চার মাস তরমুজ চাষিরা দ্বিগুণ দামে জমি নেওয়ায় ঘাস ও পানির সংকট দেখা দেয়। মহিষ দুর্বল হয়ে মারা যায় এবং বাধ্য হয়ে লোকসানে মহিষ বিক্রি করতে হয়।’
চারণভূমি ও ঘাস সংকটে দুধ উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাজারে দইয়ের সরবরাহ হ্রাস পায়। ঘাস সংকটে মহিষের দুধ পাতলা হয়ে দইয়ের মান খারাপ হয়। এ কারণে ভোলা সদরের চেয়ে ঢাল চর বা মনপুরার দই বেশি ঘন ও সুস্বাদু। এ ছাড়া উৎসব ও বিয়ের মৌসুমে দইয়ের চাহিদা ব্যাপক বেড়ে যায়। তখন কিছু অসাধু বিক্রেতা মহিষের দুধের সঙ্গে গরুর দুধ ও পানি মিশিয়ে আসল স্বাদ নষ্ট করেন। দীর্ঘ সময় পরিবহনের কারণেও দইয়ের গুণগত মান দিনের পর দিন খারাপ হচ্ছে, যা নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে জিআই পণ্যটির ওপর।
দুধ বাজারজাতকরণেও চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয় বিক্রেতাদের। চরের বাতান থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরের ঘাটে হেঁটে দুধ আনতে হয়। ভোরে দোহন করা দুধ কুলিং ব্যবস্থা ছাড়া বাজারে পৌঁছাতে বিকাল গড়িয়ে যায়। নতুন বাজারের পাইকারি বিক্রেতা মো. অলিউর রহমান বললেন, ‘চরের পাশ দিয়ে খাল থাকলে ট্রলার বাতানের কাছে যেতে পারত। দীর্ঘ সময় লাগায় প্রতিদিন ৩০০-৪০০ লিটার দুধ নষ্ট হচ্ছে, তবু পৈতৃক ব্যবসা কোনোমতে ধরে রেখেছি।’
যাতায়াত সমস্যার পাশাপাশি চরে ডাকাতদের প্রভাব খামারিদের নিরাপত্তাহীনতায় ফেলেছে। প্রায়ই অস্ত্রের মুখে মহিষ লুট হলেও দুর্গম চরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি নেই। অন্যদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগে মহিষ রক্ষার জন্য ২২টি সরকারি ও চারটি বেসরকারি কিল্লা থাকলেও তা অপর্যাপ্ত এবং দূরে হওয়ায় জোয়ারের পানিতে মহিষ ভেসে যায়। এর বাইরে সুপেয় পানি ও শৌচাগারের অভাবে রাখালরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। খামারিদের অভিযোগ, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের চিকিৎসকদের সহায়তা না পেয়ে বাইরে থেকে ওষুধ কিনে খাওয়াতে গিয়ে ভুল চিকিৎসায় মহিষ মারা যাচ্ছে। প্রয়োজনে ঠিকমতো পাওয়া যায় না সরকারি ওষুধ।
সার্বিক সংকট নিয়ে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম খাঁন বললেন, ‘পণ্যটি জিআই স্বীকৃতি পেলেও চারণভূমি সংকটই প্রধান সমস্যা। কুলিং ট্যাংক ব্যবহার করলে গুণগত মান নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমবে। দুর্গমতার কারণে সরকারি সেবা ও ওষুধ পৌঁছানো কঠিন। তবে সমস্যা লাঘবে খামারিদের প্রশিক্ষণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা গৃহীত হলে চর এলাকাতেই তারা প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে পারবেন।’
সব মিলিয়ে সম্ভাবনাময় এই জিআই পণ্যটি নানা সংকটে রয়েছে। তবে সমন্বিত উদ্যোগ, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও আধুনিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে এটি দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখার পাশাপাশি তৈরি করতে পারে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির সুযোগ।







