সামান্য দিয়ে শুরু বিশাল তার সাম্রাজ্য

মারা যাওয়ার আগে আনোয়ার হোসেনের বাবা রহিম বাকস্ ছিলেন সে সময়ের ধনী ব্যবসায়ী। মহিষের শিং দিয়ে তৈরি বোতাম-চিরুনির কটেজ ফ্যাক্টরি ছিল। সেগুলো রপ্তানি করতেন ভারতের রাজধানী দিল্লিসহ বিভিন্ন শহরে। এরকম কারখানা খুব কম মানুষেরই ছিল তখন। রপ্তানি ব্যবসাও এত সহজ ছিল না। তখনকার দিনে এটি ছিল মর্যাদাপূর্ণ ব্যবসা। এক অর্থে তিনি ছিলেন কিংবদন্তি।
রহিম বাকস্ যখন মারা গেলেন, তখন সাত বছর বয়সী ছোট্ট আনোয়ার হোসেন তার বাবার ব্যবসার কোনো মালিকানা ফিরে পেলেন না। যারা ব্যবসাগুলো পরিচালনা করতেন, তারা সব আত্মসাৎ করে বসলেন। এই বেহাল অবস্থায় একটুও ভেঙে পড়লেন না তিনি। দিকভ্রান্তও হননি। মনে প্রচণ্ড সাহস তার। ওই বয়সে শুরু করলেন পুরান ঢাকার চকবাজারে কাপড়ের দোকানে চাকরি। প্রতিবেশীরা দেখে মুচকি হাসত। তাকে দেখে প্রশ্ন করত— কীরে, এত বড়লোকের ছেলে দোকানের কর্মচারীর চাকরি? পাড়ার মানুষের তিরস্কার আর অবহেলা অবুঝ শিশুর মনে আরও জেদ চেপে বসে।
এক বছর অন্যের দোকানে চাকরির পর আট বছর বয়সে পুরান ঢাকার চকবাজারে নিজেই শুরু করেন কাপড় কেনাবেচা। আস্তে আস্তে ব্যবসায় আলো ফুটতে লাগল। কাজের চাপে প্রাইমারি স্কুল থেকে শিক্ষার ইতি টানলেন। অনেক সংগ্রাম, রাত-দিনের অক্লান্ত পরিশ্রম, নিষ্ঠা-সততা-একাগ্রতা ও সহজাত বুদ্ধিমত্তা তাকে বাণিজ্যের জগতে এমন চূড়ায় তুলল, আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। আনোয়ার হোসেনের বাবার যেসব ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান কর্মচারীরা হাতিয়ে নিয়েছিল, একে একে সব প্রতিষ্ঠান কিনে ফেললেন ১৪-১৫ বছর ব্যবসা করার পর।
আনোয়ার হোসেন দেশি-বিদেশি বিজনেস ডেলিগেট, সাপ্লাইয়ার ও শিল্পপতিদের সঙ্গে কঠিন-জটিল ব্যবসার সমীকরণও অনায়াসে সহজ করে ফেলতেন। সেখানেও ছিল তার জাদু। কথায়-যুক্তি-পরিকল্পনা-আগাম ধারণা (প্রেডিকশন) এসব এমনভাবে উপস্থাপন করতেন, যাতে সবাই সহজে উপলব্ধি করতে পারতেন ‘আনোয়ার ইজ রাইট’।
আনোয়ার হোসেন দেশি-বিদেশি বিজনেস ডেলিগেট, সাপ্লাইয়ার ও শিল্পপতিদের সঙ্গে কঠিন-জটিল ব্যবসার সমীকরণও অনায়াসে সহজ করে ফেলতেন
২০২১ সালের ১৭ আগস্ট আনোয়ার হোসেন এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন ৮৩ বছর বয়সে। মৃত্যুর আগে রেখে গেছেন তার স্বপ্নের অনেক কীর্তিগাথা। নাম-সুনাম-অহংকার-আত্মবিশ্বাসের নাম ‘আনোয়ার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ’। দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান। ১৪ হাজার কর্মী। ৪০টি শিল্প ইউনিট।
১৯৬৫ সালে আনোয়ার ক্লথ স্টোর দিয়ে যাত্রা শুরু। বাংলাদেশে প্রথম বিয়ের শাড়ি তৈরির কারখানা বানালেন ১৯৬৮ সালে। নাম দিলেন আদরের মেয়ে সেলিনা তারেক মালার নামে ‘মালা শাড়ি’।
মালা শাড়ি, মনোয়ার কাটলারির মাধ্যমে এ বাংলায় ব্যবসার নতুন দিগন্তের অভিযাত্রা শুরু আনোয়ার হোসেনের। এক অর্থে তিনি পাইওনিয়র।
স্বাধীন বাংলাদেশে অনেক বছর পরে স্মার্ট আধুনিক ব্যাংকিং জগতের পুরোধাও তিনি। বিশেষ সুনাম ও ব্যবসাসফল আর্থিক প্রতিষ্ঠান সিটি ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ছিলেন আনোয়ার হোসেন।
এই যে বছরের পর বছর এত সফল ও নামি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুললেন তিনি— কী ছিল তার ম্যাজিক? ১৯৩৮ সালে জন্ম। অর্থাৎ ব্রিটিশ আমলে। দেখলেন পাকিস্তান আমল। শেষে স্বাধীন বাংলাদেশও। তিন আমলের বৈচিত্র্যপূর্ণ শাসনব্যবস্থার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পেরেছিলেন যে আনোয়ার হোসেন, তার গড়া প্রতিষ্ঠান তো ডানা মেলবে— কথা বলবে।
তিন ছেলে ও চার মেয়েসহ সাত সন্তান তার। মনোয়ার হোসেন (চেয়ারম্যান), হোসেন মেহমুদ (ভাইস চেয়ারম্যান) ও হোসেন খালেদ (ব্যবস্থাপনা পরিচালক)। আনোয়ার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের হাল ধরেছেন এই তিন ছেলে। ছেলেদের সঙ্গে আছেন আনোয়ার হোসেনের নাতিরাও। মেয়ে সেলিনা তারেক মালা নিজে গড়েছেন ‘মালা ডিজাইন অ্যান্ড আর্কিটেকচার’। বড় মেয়ে শাহীন বেগম ছিলেন বাবার সমাজসেবার ডান হাত। কাকে কোথায় কী করতে হবে, কী দিতে হবে এসব দায়িত্ব শাহীনের। এখনো তিনি এসবই করেন। সবার কাছে তিনি খুব পপুলার। হাসিনা বেগম একসময় বাবার ব্যবসা দেখতেন। এখন গৃহিণী। শাহনাজ বেগম তার স্বামীর ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
আনোয়ার হোসেনের ছিল দুই জগৎ। ব্যবসা আর পরিবার। তিনি দুটিকেই সমান গুরুত্ব দিতেন। ঘুম থেকে উঠতেন সকাল ৬টায়। ২০ মিনিট ধরে পেপার পড়তেন। ৪০ মিনিট ব্যায়াম করতেন। নাশতা করতেন ব্রিটিশ স্টাইলে। থাকত দুই পিস পাউরুটি, বাটার, ডিম, সুজির হালুয়া ও পেঁপে। ৯টা বাজার আগেই অফিসে ঢুকতেন। দেখা যেত তখনো অনেক স্টাফ আসেননি।
৫টায় অফিস থেকে বের হয়ে সরাসরি বাসায়। ক্লাব, পার্টি এসব থেকে থাকতেন অনেক দূরে। বাসায় আসার পরের সময়টুকু একান্তই তার নিজস্ব জগৎ। এখানেও তিনি দায়িত্বশীল অভিভাবক। ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনি সবার সঙ্গে সময় কাটাতে পছন্দ করতেন। পরিবার নিয়ে বিদেশে ঘোরা ছিল তার বিশেষ পছন্দ। সবাইকে বলতেন, ‘যত দেশ ঘুরবে তত জানবে, বুঝবে, জ্ঞান অর্জন করবে, স্বাধীন হবে, আত্মবিশ্বাস বাড়বে, স্বাবলম্বী হবে।’
জীবন তাকে যা দিয়েছে তিনি তার চেয়ে অনেকগুণ বেশি দিয়ে গেছেন আত্মীয়স্বজন, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দেশ-জনগণের জন্য। বছরে কত হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়, সেই তথ্য আনোয়ার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ওয়েবসাইটে উল্লেখ নেই। হতে পারে এটি তাদের বিজনেস কৌশল। কিন্তু ওয়েবসাইটে ঢুকলেই প্রথমে ভেসে ওঠে তার বিশাল ছবি। তাতে লেখা— ‘স্মৃতিতে ও শ্রদ্ধায় আনোয়ার হোসেন’।
উত্তরসূরিদের এমন বিরল সম্মান শুধুই তাদের বাবার জন্য। যিনি গড়ে দিয়ে গেছেন ব্যবসার বিশাল এক সাম্রাজ্য।
এত অবদান, এত কীর্তি, এত কর্মসংস্থান করে বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানের সম্মাননা পেয়েছেন; কিন্তু রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পায় না আমাদের অহংকারের এসব বীর ব্যবসায়ী। আনোয়ার হোসেনও এমনি এক রাষ্ট্র অবহেলিত ব্যবসা-বাণিজ্যের পথিকৃৎ। তিনি থাকবেন মানুষের হৃদয়ে। একুশে পদক, স্বাধীনতা পদকের মতো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মাননা না পেয়েও জ্বলতে থাকেন ‘দূর আকাশের তারা হয়ে’।






