সাক্ষাৎকার
খেলাপি ঋণ কমাতে পাঁচ ফর্মুলা

মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ
দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি ব্যাংক খাত এখন গভীর সংকটে। মূলত লাগামহীন খেলাপি ঋণ এর কারণ। সরকারি হিসাবে খেলাপি ঋণের অঙ্ক ৬ লাখ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে। ব্যাংক খাতের বর্তমান সংকট উত্তরণের উপায়, সংস্কারের যৌক্তিকতা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও খেলাপি ঋণ কমানো নিয়ে আগামীর সময়ের সঙ্গে কথা বলেছেন শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিজনেস এডিটর মিজান চৌধুরী
প্রশ্ন: ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের অঙ্ক ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। পরিস্থিতিকে কীভাবে দেখছেন?
মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ: বিষয়টিকে ঢালাওভাবে দেখার সুযোগ নেই, একটু বিশ্লেষণ করে দেখতে হবে। ৫ আগস্টের আগে এটি ছিল ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা। একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তিমালিকানাধীন গোষ্ঠীর ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাদ দিলে সার্বিক খেলাপি ঋণের চিত্র ভিন্ন হবে। আমরা নির্দিষ্ট ইস্যুকে বাদ দিয়ে পুরো খাতের চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করছি। দেশে ১৫-২০টি ব্যাংক রয়েছে যাদের খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশের নিচে। আবার ২০-২৫টি ব্যাংক আছে, যাদের খেলাপি ঋণ ৯০ শতাংশের ওপরে। খেলাপি ঋণের জন্য শুধু ব্যবসায়িক ব্যর্থতা বা অর্থনৈতিক মন্দা দায়ী নয়; এর পেছনে রাজনৈতিক ও অন্যান্য কারণ রয়েছে। ব্যাংক খাতে সুশাসনের অভাব এবং নিয়মকানুনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
প্রশ্ন: বিপুল খেলাপি ঋণের কারণে আমানতকারী ও সামগ্রিক অর্থনীতি কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে?
মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ: সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে ব্যাংক খাতের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থায় ফাটল ধরা। ব্যাংকের অর্থ মূলত সাধারণ আমানতকারীদের। গ্রাহকরা কষ্টার্জিত সঞ্চয় ফেরত না পেয়ে রাস্তায় ঘুরছেন, ফলে মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখতে ভয় পাচ্ছেন। দ্বিতীয়ত, আটকে থাকা অর্থ ব্যাংক ফেরত না পাওয়ায় নতুন করে বিনিয়োগ বা ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা হারাচ্ছে। সাধারণ ব্যবসায়িক কারণে কোনো শিল্প খেলাপি হলে তা পুনর্গঠন সম্ভব। কিন্তু অস্তিত্বহীন বা ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে বেনামি ঋণ গেলে, যেখানে কোনো শিল্পই নেই, তা আদায় করা প্রায় অসম্ভব। এই অবস্থা মেরামত করতে দীর্ঘ সময় লাগবে এবং অনেক মাশুল দিতে হবে।
প্রশ্ন: খেলাপিরা আদালতের দীর্ঘসূত্রতার সুযোগ নেন। এটি সমাধানে এবং ঋণ আদায়ে কী করা উচিত?
মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ: অনেক গ্রাহক টাকা ফেরত না দিয়ে আদালতে যেতে পছন্দ করেন। এটি ব্যাংক খাতের জন্য সতর্কবার্তা। তবে বর্তমান গভর্নর এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। প্রস্তাবিত আইনে ছয় মাসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি এবং আপিল করতে ৫০ শতাংশ টাকা জমার যে বিধান রাখা হচ্ছে, তা কার্যকর হলে ব্যাংক খাত উপকৃত হবে। পাশাপাশি, অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিগুলো ব্যাংক থেকে খারাপ ঋণ কিনে পেশাদারিত্বের সঙ্গে আদায়ের চেষ্টা করতে পারে। প্রযুক্তির ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চেয়ে ঋণের প্রক্রিয়ায় সিস্টেম অটোমেশন নিশ্চিত করা বেশি প্রয়োজন। নির্দিষ্ট শর্ত ছাড়া ঋণ পাস হবে না, এমন ব্যবস্থা থাকলে মানুষের হস্তক্ষেপ কমবে এবং রেকর্ড সংরক্ষিত থাকবে।
প্রশ্ন: ব্যাংক খাতকে টেকসই জায়গায় নিয়ে যেতে আগামী পাঁচ বছরের জন্য আপনার পরামর্শ কী?
মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ: প্রথমত, ব্যাংকের কার্যক্রমে রাজনৈতিক প্রভাব সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সুপারিশ বা স্বজনপ্রীতির ভিত্তিতে নিয়োগ বন্ধ করতে হবে। তৃতীয়ত, পরিচালনা পর্ষদকে পেশাদার হতে হবে। ঋণ অনুমোদনের কাজ পর্ষদের পরিবর্তে ম্যানেজমেন্টের হাতে ছেড়ে দিতে হবে। পরিচালনা পর্ষদের কাজ পলিসি ও স্ট্র্যাটেজি তৈরি করা। বিদেশি ব্যাংকগুলোয় মালিকরা সরাসরি হস্তক্ষেপ করেন না, প্রফেশনালরা স্বাধীনভাবে ব্যাংক চালান। আমাদেরও সেই মডেলে যেতে হবে। চতুর্থত, ম্যানেজমেন্টের কাজের যথাযথ মূল্যায়ন পদ্ধতি থাকতে হবে। ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে নয়, পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করতে হবে। পঞ্চমত, বিদ্যমান আইনগুলোর কঠোর ও যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
প্রশ্ন: শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ তুলনামূলক কম হওয়ার কারণ কী?
মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ: শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির নামের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। ফলে ব্যাংকটি অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাব থেকে মুক্ত রয়েছে। দ্বিতীয়ত, এখানে পরিচালনা পর্ষদের শতভাগ সদস্য একমত না হলে কোনো ঋণের প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয় না। আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে কোনো সিদ্ধান্ত নিই না। একজন পরিচালকও যদি কোনো প্রস্তাবে ভেটো দেন, আমরা সেই ঋণ অনুমোদন করি না। এটি অত্যন্ত রক্ষণশীল একটি পদ্ধতি। শতভাগ শরিয়াহভিত্তিক এই ব্যাংকটি রক্ষণশীল ও পেশাদার নীতি অনুসরণ করার কারণেই খেলাপি ঋণের বিরূপ প্রভাব থেকে মুক্ত রয়েছে। গত পাঁচ বছরে আমাদের প্রতিটি সূচকে উন্নতি হয়েছে।



