চালের বাজারে অশনিসংকেত
- সপ্তাহের ব্যবধানে বস্তাপ্রতি ২০০-৩০০ টাকা বাড়তি
- মাসের শুরুতে কেজিতে বেড়েছে ২-৩ টাকা

চাতালে ধান শুকাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন শ্রমিকরা। সম্প্রতি নওগাঁ শহরের বাইপাস সড়ক সংলগ্ন তছিরন অটোমেটিক রাইস মিল থেকে তোলা। ছবি: আগামীর সময়
বাজারে নতুন ধানের চালের ভরপুর সরবরাহ। অথচ চালের দর কমছে না। ভরা মৌসুমে বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে মিলগেট ও পাইকারি মোকামে। সব ধরনের চালের দরই ঊর্ধ্বমুখী। ভোক্তাকে সপ্তাহের ব্যবধানে বস্তাপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বাড়তি দরে চাল কিনতে হচ্ছে। ফলে বাজারে স্বস্তি মিলছে না। অন্যদিকে ধানের অবৈধ মজুদ গড়ে উঠছে। এতে চালের দর অস্থির হয়ে উঠতে পারে বলে ধারণা করছেন অনেকে।
দেশে চালের চাহিদার বড় জোগান আসে বোরো মৌসুম থেকে। চলতি মৌসুমের পাকা ধান কাটা ও মাড়াই শেষ। চাষিরা ফলনে খুশি, তবে বাজারদর নিয়ে অসন্তোষ। অন্যদিকে, নতুন ধান উঠলেও সুফল পাচ্ছেন না ভোক্তা। বরং ধান-চালের বড় মোকামগুলোতে চলতি মাসের শুরুতে এক লাফে কেজিতে বাড়ানো হয়েছে দুই থেকে তিন টাকা পর্যন্ত।
তথ্য বলছে, মিলার ও ব্যবসায়ীরা ইচ্ছামতো দর বেঁধে দিয়ে হাট থেকে ধান কিনছেন এবং চাল বিক্রি করছেন।
নওগাঁ জেলা ধান-চালের বড় মোকাম। হাটগুলোতে ধানের জোগান বাড়লেও তার কোনো প্রভাব নেই চালের বাজার। পাইকারি আড়ত ও মিলগেটে দুই সপ্তাহের ব্যবধানে মোটা ও মাঝারি চালে দেড় থেকে ২ টাকা এবং সরু চালের কেজিতে ৩ টাকা পর্যন্ত দর বেড়েছে। এখনো ঊর্ধ্বমুখী বাজার।
বর্তমান বাজারে মিলগেট ও পাইকারি আড়তে প্রতি কেজি কাটারি নাজির চাল বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৭২, জিরা শাইল ৬৫ থেকে ৬৮ টাকা। মোটা চাল ৫৫ টাকার নিচে মিলছে না।
নওগাঁর রাইস মিলার গোলাম মোস্তফা বলেছেন, নওগাঁ, দিনাজপুর, কুষ্টিয়া, বগুড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ ধান-চালের বড় মোকামগুলোতে পুঁজিপতি, মৌসুমি মজুদদার ও মিলাররা কম দরে ধান কিনে অবৈধভাবে মজুদ গড়ে তুলছেন। মিলার ও ব্যবসায়ীরা ইচ্ছামতো চালের দর বাড়াচ্ছেন। সঠিক তদারকি না থাকায় চালের দর নিয়ন্ত্রণ ও ধানের দরের সঙ্গে সামঞ্জস্য আসছে না।
এরই মধ্যে সরু ধানের সিংহভাগ মজুদ করেছেন হাতেগোনা বড় মিলার ও ব্যবসায়ীরা। ফলে তাদের মর্জির ওপর নির্ভর করে চালের দর। ক্ষুদ্র ও সাধারণ মিলাররা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছেন না। এ কারণে নতুন ধান উঠলেও চালের বাজারে প্রভাব পড়ছে না।
নওগাঁ জেলা চালকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার বললেন, দেশে এই মুহূর্তে ধান-চালের কোনো সংকট নেই। সরকারি গুদামে সরবরাহের কারণে মোটা জাতের চালে টান পড়েছিল। ফলে ধানের দর কিছুটা বেড়েছে এবং তারই প্রভাবে চালের দর বৃদ্ধি পেয়েছে।
নওগাঁ ভোক্তা অধিকার আন্দোলনের সদস্য নাইস পারভীন বলেছেন, ধানের হাট, চালের পাইকারি ও খুচরা বাজার এবং মিলগেটে তদারকি নেই। যার ফলে ধানের অবৈধ মজুদ গড়ে উঠছে এবং চালের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ দেন তিনি।
নওগাঁ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ফরহাদ খন্দকার বললেন, চলতি মৌসুমে ধানের ফলন ভালো হয়েছে। বাজারে নতুন ধান-চালের সরবরাহ স্বাভাবিক আছে। কোনো ধরনের অজুহাত দিয়ে দাম বাড়ানোর সুযোগ নেই। আড়তদারি এবং মিল পর্যায়ে খোঁজখবর রাখা হচ্ছে। কোথাও কোনো অসামঞ্জস্য পাওয়া গেলে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এ ছাড়া লাইসেন্সবিহীন কিংবা যেকোনো ধরনের অবৈধ মজুদের বিরুদ্ধে শিগগির যৌথ অভিযান শুরু করা হবে।
ধান-চালের বাজারদর স্থিতিশীল রাখতে অবৈধ মজুদের লাগাম টানতে হবে। একই সঙ্গে পাইকারি থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত তদারকি বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
কুষ্টিয়ায় অস্বস্তি: ঈদের পর দেশের বৃহত্তম চালের বাজার কুষ্টিয়ায় কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় চাপে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ।
কুষ্টিয়া পৌর বাজারের মেসার্স মা ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মাহমুদ মনজু জানান, বর্তমানে ২৫ কেজির প্রতি বস্তা মিনিকেট (ব্র্যান্ড) ১ হাজার ৮০০ (কেজি ৭২ টাকা) এবং নন-ব্র্যান্ড ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৬৫০ টাকায় (কেজি ৬৪-৬৬ টাকা) বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া কাজললতা (ব্র্যান্ড) ১ হাজার ৬৫০, আটাশ ১ হাজার ৩০০ (প্রতি কেজি ৫২ টাকা) এবং মোটা চাল ৪৮ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। বাসমতী ব্র্যান্ডের চালের বস্তা বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ২০০ টাকায়।
চালের দাম বাড়ার পেছনে প্রধানত ধানের দাম বৃদ্ধি এবং বিদ্যুৎ খরচকে দায়ী করছেন মিল মালিক ও ব্যবসায়ীরা। সামির এগ্রোর পরিচালক সামির খালেক জানান, মান ও জায়গাভেদে মণপ্রতি ধানের দাম ২০০-২৫০ টাকা বৃদ্ধি পাওয়ায় চালের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। এ ছাড়া বিদ্যুতের দাম প্রায় ১৯ শতাংশ বাড়ায় মিল মালিকদের ব্যয় বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে।
কুষ্টিয়া জেলা চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদিন বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে বললেন, ধান কাটার সময় কাঁচা ধানের দাম কম থাকলেও শুকানোর পর ওজনে ঘাটতিসহ বিভিন্ন কারণে মণপ্রতি খরচ ৭০-৮০ টাকা বেড়ে যায়। এ ছাড়া ঈদের পরবর্তী দুই মাস ধানের দাম এমনিতেই কিছুটা চড়া থাকে।
চালের এই মূল্যবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন স্বল্প আয়ের মানুষ। বেসরকারি চাকরিজীবী শরিফুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন, বেতন বাড়েনি, কিন্তু চালসহ সব কিছুর দাম বাড়ছে। এক কেজি চাল ৬২ টাকা হলে মাসে চাল কিনতেই বেতনের বড় অংশ চলে যাচ্ছে। শিশুর পড়াশোনাসহ সংসারের অন্যান্য খরচ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছি।




