লেনদেনের জোয়ারে চাঙ্গা গ্রামীণ অর্থনীতি

কোরবানির ঈদ ঘিরে টাকার লেনদেন বেড়েছে ব্যাপক হারে। অর্থনীতিতে তৈরি হয়েছে বিশাল মৌসুমি সঞ্চালন। পশুর হাট, চামড়াশিল্প, রেমিট্যান্স, পরিবহন খাত, অনলাইন বেচাকেনা, পোশাক ও খুচরা বাজারের কেনাকাটা— সব মিলিয়ে কয়েক সপ্তাহে দেশের অর্থনীতি পেয়েছে নতুন গতিধারা। কোরবানির পশু বেচাকেনা ঘিরে প্রতি বছরই অর্থনীতিতে বড় সঞ্চালন হয়। এ প্রবাহ গ্রামীণ অর্থনীতিকে যেমন চাঙ্গা করে, তেমনি তৈরি হয় ভোগব্যয় ও মূল্যস্ফীতির চাপ বেড়ে যাওয়ার শঙ্কাও। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, কোরবানির ঈদ ঘিরে প্রতি বছর যে কর্মচাঞ্চল্য দেখা দেয়, তা প্রকারান্তরে অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করে তুলতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।
সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে কোরবানিকেন্দ্রিক অর্থনীতির আকার প্রায় ৫ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। টাকার অঙ্কে যা ৭০ হাজার কোটি টাকার বেশি (প্রতি ডলার ১২৩ টাকা হিসাবে)। এর মধ্যে পশুপালন ও সংশ্লিষ্ট খাত অর্থনীতিতে বড় প্রভাব রাখে। সরকারের হিসাবে এবার কোরবানির জন্য প্রস্তুত রয়েছে ১ কোটি ২৩ লাখের বেশি গবাদি পশু। প্রতিটি গবাদি পশুর আর্থিক মূল্য ধরলে কয়েক হাজার কোটি টাকা লেনদেন ছাড়াবে এ বাজারে।
এদিকে চামড়া কিনতে এরই মধ্যে ট্যানারিশিল্পের মালিকদের জন্য ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ২২৮ কোটি টাকা নির্ধারণ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর বাইরে নিজস্ব মূলধনও রয়েছে ব্যবসায়ীদের।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে চলতি মাসের প্রথম ২২ দিনে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ২৮০ কোটি ২৪ লাখ মার্কিন ডলার। প্রতিদিন গড়ে এসেছে ১২ কোটি ৭৪ লাখ ডলার।
অর্থনীতিবিদ এম কে মুজেরি গতকাল রবিবার জানান, গ্রামের অনেক পরিবার পশু লালনপালন করে কোরবানি লক্ষ্য রেখে। বেচাকেনার পর তাদের হাতে টাকা আসার পর ভোগবিলাস ও বিনিয়োগে ব্যয় বেশি করে। এতে গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা হয়ে ওঠে। যদিও মূল্যস্ফীতি ও ডলারের চাপ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সংকুচিত করেছে। তারপরও কোরবানির ঈদ ঘিরে যাবতীয় কর্মকাণ্ড অর্থনীতিকে আরও সক্রিয় করে তুলবে।
এদিকে কোরবানির মৌসুমে এরই মধ্যে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে গ্রামীণ অর্থনীতিতে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জমে উঠেছে পশুর হাট। খামারিরা বলছেন, গত দুই বছরে খাদ্য ও ওষুধের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে অনেক। তবুও কোরবানির বাজার ঘিরে তারা আশাবাদী। কারণ, এই একটি মৌসুমেই সারা বছরের আয়ের বড় অংশ উঠে আসে। গ্রামের মুদি দোকান, ভুসিমালের আড়ত, পশুখাদ্য ব্যবসায়ী, ভ্যানচালক, ট্রাকমালিক, স্থানীয় শ্রমিক— সবাই এই অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ারই অংশ। পশু বিক্রির পর গ্রামের মানুষ নতুন টিন, মোটরসাইকেল, কৃষিযন্ত্র কেনা কিংবা জমিতে বিনিয়োগ করেন। তা না হলে অন্য কোনো শখ মেটান। এভাবে টাকার প্রবাহ অনেকাংশে বেড়ে যায়। এরই ইতিবাচক প্রভাব পড়ে অর্থনীতিতে।
সবচেয়ে বড় লেনদেন পশুর বাজারে: পশুর হাট এ সময়ে এসে অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। রাজধানী থেকে গ্রামাঞ্চল— সারা দেশে কয়েক হাজার অস্থায়ী ও স্থায়ী হাট বসেছে। খামারিরা পশু বিক্রিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এবার কোরবানিযোগ্য পশুর মধ্যে রয়েছে গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া মিলিয়ে ১ কোটি ২৩ লাখের বেশি প্রাণী। প্রাণিসম্পদ ও কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেছেন, কোরবানির পশুর কোনো সংকট হবে না এবার।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিবহন, খাদ্য, ওষুধ, শ্রমিক, হাট ইজারা, মোবাইল ব্যাংকিং ও ডিজিটাল লেনদেন— এসব মিলিয়ে কোরবানির বাজার দেশের সবচেয়ে বড় অনানুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞে রূপ নিয়েছে।
বড় প্রস্তুতি চামড়া শিল্পেও: প্রায় এক কোটি পিসের ওপর গরু, মহিষ ও ছাগলের চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ট্যানারিশিল্প মালিকদের। এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক চামড়া কিনতে ট্যানারিশিল্পের অনুকূলে ঋণের লক্ষ্য বেঁধে দিয়েছে ২২৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা। বসে নেই ট্যানারির মালিকরাও। নিজেদের পুঁজিও বিনিয়োগ করার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন তারা। জানতে চাইলে বাংলাদশে ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সভাপতি মো. শাহীন আহমেদ আগামীর সময়কে বললেন, অন্য যেকোনো বছরের তুলনায় এ বছর কোরবানির চামড়া ব্যবস্থাপনার প্রস্তুতি ভালো। চামড়া নষ্ট হওয়া এড়াতে সরকারিভাবে প্রায় ১৮ কোটি টাকার লবণ বিনামূল্যে বিতরণ করা হচ্ছে। আমাদের নিজেদের প্রস্তুতিও যথেষ্ট।
রেমিট্যান্সের জোয়ার এবারও: প্রতি বছর কোরবানির ঈদ কেন্দ্র করে বাড়ে প্রবাসী আয়। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় থাকা বাংলাদেশিরা এ সময় পরিবারকে বাড়তি অর্থ পাঠান; যা কোরবানি, কেনাকাটা ও অন্যান্য ব্যয়ে মেটাতে খরচ হয়। এবারও বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স এসেছে। ফলে অতিরিক্ত ডলারের প্রবাহ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে বেশ স্বস্তি তৈরি করেছে।
রয়েছে মূল্যস্ফীতির শঙ্কাও: কোরবানির ঈদকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড গ্রামের অর্থনীতিতে প্রাণস্পন্দন বাড়ালেও এর সঙ্গে মূল্যস্ফীতির শঙ্কাও জড়িয়ে রয়েছে। বাজারে নগদ অর্থের প্রবাহ বাড়ায় অনেক ক্ষেত্রে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে। বিশেষ করে মাংস, চাল, মসলা, পোশাক ও পরিবহন খাতে চাপ তৈরি হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, কোরবানির অর্থনীতি বাংলাদেশের জন্য একদিকে বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক শক্তি, অন্যদিকে তা মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিও বহন করে। ফলে ঈদের এ অর্থনৈতিক উচ্ছ্বাসের সুফল ধরে রাখতে বাজার ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।






