দাম বাড়ছে বাজারে, পুষ্টি কমছে নারীর পাতে

চায়না আক্তার (৩৪)। ছুটা কাজ করেন বাসাবাড়িতে। বড় ছেলে ও স্বামীকে নিয়ে থাকেন রাজধানী ঢাকার কাজীপাড়ায়। ছেলে ভাত মুখে তোলে না মাছ-মুরগি ছাড়া। ছেলের প্লেটে ‘মাছ’ জোগাতে নিজে কখনো খান না মাছ, প্লেটে থাকে সবজি, শুঁটকি বা ডাল। অবশ্য স্বামীর মাছ জোটে একবেলা।
চায়না বলছিলেন, ‘বাজারে আগুন। কোনো জিনিসে হাত দিবার পারি না। মুকরা কিনবার পারি না। ছোড ছোড টুকরা কইর্যা মাছ রাইন্ধ্যা পোলারে দেই। নিজেরা খাইলে খরচে পোষায় না।’
এই নারী জানালেন, মাছ বলতে তাদের ঘরে আসে শুধু তেলাপিয়া। স্বামী পাঙাশ মাছ খান না বলে হয় না কেনা। যেসব বাসাবাড়িতে কাজ করেন, সেখান থেকে দেয় মুরগির পা-গিলা, তাতেই স্বাদ নেন মুরগির মাংসের। গরুর মাংস খাওয়া হয় শুধু কোরবানির সময়। দাম বেশি বলে সবজিও খেতে হয় হিসাব করে। এমনকি ডিমও এখন কেনার ক্ষমতার বাইরে।
ইয়াসমীন বেগমের (৬২) সংসারে ছেলে ও ছেলের বউ, মেয়েসহ সদস্য ৯ জন। খরচের লাগাম টানতে পুরুষ সদস্যদের জন্য সকালের নাশতায় রুটি, সবজির সঙ্গে ডিম থাকলেও মেয়েরা শুধু খান রুটি আর সবজি। ইয়াসমীন বেগমের ভাষ্য, ‘ছেলেরা রুটি-রুজি করে। তাদের সুস্থ থাকা দরকার। ভালো-মন্দ খানা দরকার। আমরা (নারীরা) ঘরেই থাকি। একটু কম খেলেও অসুবিধা নাই।’
শুধু চায়না বা ইয়াসমীন বেগমের পরিবারেই নয়, বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে নারীর খাবারের প্লেটে। সামাজিক ও পারিবারিক কাঠামোর কারণে নারীরা পরিবারের পুরুষ সদস্য এবং সন্তানদের পুষ্টির কথা ভাবেন আগে। তারা খেতে বসেন সবার শেষে, প্লেটে থাকে হাঁড়ির তলায় পড়ে থাকা ছোট মাছের টুকরো বা অল্প সবজি-ডাল। নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার কারণে চিরচেনা সেই পরিস্থিতি হয়েছে আরও খারাপ।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মোশতাক আহমদ বলছিলেন, নারীরা অভ্যাসগত কারণে ও সংসারের খরচ বাঁচাতে গ্রহণ করেন কম খাবার। দীর্ঘদিন ধরে এমন অভ্যাসের ফলে নারীরা ভোগেন রক্তস্বল্পতা, অপুষ্টিসহ নানা রোগে। বিশেষ করে, কম আয়ের পরিবারে নারীদের পুষ্টি পরিস্থিতি বেশি নাজুক।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রতি মাসে প্রকাশ করে মূল্য এবং মজুরি (সিপিআই, আইআইপি) সূচকবিষয়ক প্রতিবেদন। এই প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, গত এপ্রিলে সাধারণ পয়েন্ট টু পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ, যা আগের মাসে ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। একইভাবে খাদ্য মূল্যস্ফীতিও আগের মাসের চেয়ে বেড়েছে কিছুটা। পাশাপাশি বেড়েছে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতিও।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান তার এক অভিমতে লিখেছেন, মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত; উভয় ক্ষেত্রে মানুষের খরচ বাড়ছে। গ্রাম ও শহরের দরিদ্র, নিম্নমধ্যবিত্ত, স্থির আয়ের মানুষ এবং অনানুষ্ঠানিক শ্রমজীবীরা মূল্যস্ফীতির প্রধান ভুক্তভোগী।
খাবারের অভ্যাস সম্পর্কে জানতে বিভিন্ন বয়সী নানা পেশার কমপক্ষে ৩০ নারীর সঙ্গে কথা বলেন এই প্রতিবেদক। তাদের অধিকাংশ বলছেন, আগের থেকে তারা মাছ-মাংস কম খাচ্ছেন। কেউ কেউ সম্পূর্ণ বাদ দিয়েছেন। অনেকে দুধ-ফল বাদ দিয়েছেন। আবার কেউ কেউ তুলনামূলক সস্তার মাছ-সবজি কিনছেন। ডিম-ডাল খেতেও হিমশিম খাচ্ছেন অনেকে।
ইউএসএআইডির অর্থায়নে বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য ফলাফল উন্নত করতে কাজ করে ডেটা ফর ইমপ্যাক্ট। তাদের তথ্য বলছে, বাংলাদেশে ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী প্রজননক্ষম বিবাহিত নারীর সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ। তাদের মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ নারী ভুগছেন পুষ্টিহীনতায়। এর মধ্যে ৫০ লাখ নারী অপুষ্টির কারণে কম ওজন এবং ১ কোটি ২০ লাখ নারীর ওজন অতিরিক্ত।
২১ বছর ধরে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের স্ত্রী ও প্রসূতি রোগ বিশেষজ্ঞ এবং সার্জন ছাবিকুন নাহার। তিনি জানালেন, তার কাছে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর অধিকাংশই ভোগেন রক্তস্বল্পতায়। অপুষ্টির শিকার নারীরা আক্রান্ত হন দীর্ঘ ও স্বল্পমেয়াদি নানা শারীরিক জটিলতায়। পাশাপাশি তারা ক্লান্ত বোধ করেন সবসময়। কর্মদক্ষতা থাকে কম। তাদের বাচ্চারাও জন্ম নেয় অপুষ্টি নিয়ে।
সর্বশেষ জাতীয় পুষ্টি জরিপ অনুযায়ী, অন্তঃসত্ত্বা ও স্তন্যদানকারী নন— এমন নারীদের মধ্যে মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট ঘাটতি উদ্বেগজনক। জরিপের তথ্য বলছে, এমন নারীদের মধ্যে ভিটামিন ডি ঘাটতি সবচেয়ে বেশি, ৭১ শতাংশ। জিংকের ঘাটতি রয়েছে ৪৪ শতাংশ এবং আয়োডিনের অভাব রয়েছে ২৯ শতাংশ নারীর। এই জরিপ আরও বলছে, মৃদু থেকে তীব্র রক্তস্বল্পতায় ভুগছেন ৩০ শতাংশ— অর্থাৎ প্রতি তিনজন নারীর একজনের রয়েছে রক্তস্বল্পতা।
গ্লোবাল নিউট্রেশন রিপোর্ট হলো বৈশ্বিক পুষ্টি পরিস্থিতির ওপর বিশ্বের অন্যতম স্বাধীন মূল্যায়ন প্রতিবেদন। এই প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, বাংলাদেশ মাতৃ, নবজাতক ও অল্পবয়সী শিশুদের পুষ্টিসংক্রান্ত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেছে অনেকটাই। তবে প্রজননক্ষম বয়সী নারীদের রক্তস্বল্পতা কমানোর ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়নি তেমন একটা।
নারীর খাদ্য বৈচিত্র্য ও খাদ্য নিরাপত্তাবিষয়ক বেশ কিছু গবেষণা প্রতিবেদন রয়েছে ব্র্যাকের। এমন একাধিক গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, নিম্ন আয়ের পরিবারের খাদ্যতালিকায় কমছে বৈচিত্র্য এবং পুষ্টিকর খাবার সবচেয়ে কম পৌঁছায় নারীদের কাছে। খাদ্যের দাম বাড়লে নারীরা সবার আগে নিজের খাবার কমিয়ে দেন। খাবার হিসেবে মাছ-মাংস-ফল আগে বাদ দেন তারা। তারা স্বেচ্ছায় কম খাচ্ছেন বিষয়টা এমন নয়, পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামোর কারণে অনেক নারীই পর্যাপ্ত পুষ্টি থেকে হচ্ছেন বঞ্চিত।
গার্মেন্টস শ্রমিক মমতাজ আক্তার বললেন, ‘যে দাম, সবজিও কিনতে পারি না। বেশি ঝাল দিয়ে শুঁটকি রান্দি। ঝাল বেশি দিলে ভাতে তরকারি কম লাগে।’
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে স্বাস্থ্যকর খাদ্যের প্রাপ্য নিশ্চিত করা দরকার। এজন্য সাশ্রয়ী ও বৈচিত্র্যময় খাদ্যগ্রহণের ওপর দিতে হবে জোর। বিশ্বব্যাপী পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাবারকে সহজ করতে কাজ করে গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ইমপ্রুভড নিউট্রিশন। তারা বলছে, বাংলাদেশ অপুষ্টির ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মোশতাক আহমদ এ সমস্যার সমাধানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সার্বিক অর্থনীতির অবস্থা পরিবর্তনের ওপর জোর দেন। তিনি বলছিলেন, ফলাফল স্বাস্থ্যগত হলেও সমাজের সব অংশীজনের সমন্বয়ে এর সমাধান করতে হবে।




