সুতা আমদানির বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার

তৈরি পোশাকশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ প্রধান উপাদান সুতা। সম্প্রতি এই সুতা ‘আমদানির বন্ড সুবিধা’ প্রত্যাহার করেছে সরকার। এতে দেশের প্রধান রপ্তানি খাতের উদ্যোক্তাদের মধ্যে অস্থিরতা ও
অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে সরকারের এ সিদ্ধান্ত জরুরি ভিত্তিতে প্রত্যাহারের দাবিও তুলেছেন তারা। পোশাক রপ্তানিকারকদের আলাদা দুটি সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান এবং বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম যৌথভাবে এতে স্বাক্ষর করেন। অর্থাৎ সুতা আমদানির বন্ড সুবিধা ফেরত পেতে চান গার্মেন্টস মালিকরা।
সোয়েটার বানানো, নিট অর্থাৎ গেঞ্জি তৈরির বহুমুখী কাজে ব্যবহার করা হয় কটন (তুলা) সুতা। এর মধ্যে সোয়েটার তৈরির ‘১০-৩০’ কাউন্টের মিক্সড সুতা বাংলাদেশে উৎপাদনই হয় না। সারা দেশে এক হাজারের বেশি বন্ড রয়েছে বলে ধারণা দেন গার্মেন্টস মালিকরা। সর্বশেষ গত বছর আনুমানিক ১২ লাখ টন সুতা আমদানি হয়। আর এতে খরচ প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা। বিদেশ থেকে কম দামে সুতা এনে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হয় দেশীয় কারখানার মালিকদের। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে বছরে ৪০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি হয় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী-সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে গত ৮ সেপ্টেম্বর পাঠানো এই চিঠিতে বলা হয়, কোনো স্বার্থান্বেষী মহলকে বিশেষ সুবিধা প্রদানের উদ্দেশ্যে আলোচনাবহির্ভূত এ সিদ্ধান্ত। সংকট সমাধানে প্রয়োজনে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের অনুরোধ করেন পোশাকশিল্পের নেতারা। যে বৈঠকের উদ্ধৃতি দিয়ে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত, সেটি অনুষ্ঠিত হয়েছে গত ২০ আগস্ট বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে। এর ১১ দিন পর ওই সভার কার্যবিবরণীর ক্রমিক নম্বর ৫-এ স্পষ্ট বলা হয়, ‘১০-৩০’ কাউন্টের কটন সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারপূর্বক সংশ্লিষ্ট অ্যাসোসিয়েশনের প্রত্যয়নপত্রের ভিত্তিতে ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে প্রকৃত রপ্তানিকারকরা প্রয়োজনীয় সুতা আমদানি করতে পারবেন। এর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। অর্থাৎ পুরো প্রক্রিয়া সহজীকরণের পরিবর্তে জটিল ও সময়ক্ষেপণের এক সমীকরণ এটি।
পোশাকশিল্প মালিকদের দাবির বিষয়ে জানার জন্য বাণিজ্য সচিব এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে অসংখ্যবার ফোন ও এসএমএস দিয়েও সাড়া পাওয়া যায়নি।
তবে বিজিএমইএর সহসভাপতি মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী আগামীর সময়কে বললেন, ‘বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বৈঠক শেষে কথার ফাঁকে সুতার বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের বিষয়টি আলোচনা হলে বাণিজ্যমন্ত্রী সব পক্ষকে লিখিতভাবে উত্থাপন করার অনুরোধ জানান। তার আগেই কীভাবে সিদ্ধান্ত আকারে মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি ইস্যু হয়ে গেল, তা এক বড় বিস্ময় ও জালিয়াতি। এরপর মন্ত্রীর কাছে গিয়ে এমন কেন হলো— জানতে চাইলাম আমরা। এতে তিনি বিব্রত। বললেন, তিনি জানেন না কিছু। অনেক চিঠির মধ্যে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত-সংক্রান্ত চিঠি তার কাছ থেকে স্বাক্ষর করিয়ে নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেছেন বিষয়টি দেখবেন।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশীয় শিল্পের স্বার্থসংরক্ষণ অর্থাৎ স্পিনিং মিল চালু ও সচল রাখতে সরকার সুতা আমদানির বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার করল। কিন্তু গার্মেন্টস মালিকরা বলছেন, প্রত্যাশিত মানের সুতা দেশীয় অনেক কারখানায় তৈরি করা সম্ভব হয় না। এ রকম অবস্থায় যাচাই-বাছাই না করে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার করায় বেকায়দায় পড়েছেন পোশাক রপ্তানিকারকরা। দ্রুত বিকাশমান পোশাকশিল্পের জন্য অনেক বিবেচনা করেই বন্ড সুবিধার সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছিল কয়েক বছর আগে। কিন্তু বর্তমানে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত বাস্তববিরোধী ও আত্মঘাতী বলেই মনে করেন এ খাতের শিল্পমালিকরা। তারা মনে করেন, এতে রপ্তানি পণ্য উৎপাদন সংকটে পড়বে। বিদেশি ক্রেতার কাছে যাবে ‘ভুল বার্তা’।
বন্ড বিষয়ে অভিজ্ঞ নাম প্রকাশে অনাগ্রহী একজন জানালেন, দেশীয় টেক্সটাইল শিল্পের সুরক্ষা যেমন প্রয়োজন, তেমনি তৈরি পোশাক খাতও যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ দেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাকশিল্পের রপ্তানি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ও সংবেদনশীল খাত। এ রকম স্পর্শকাতর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সব পক্ষের উপস্থিতিতে আলোচনা মাধ্যমে মতামত নেওয়া দরকার।



