সিলেটে ৩৮০ কোটির প্যাকিং হাউজ
- খুলবে কৃষিপণ্য রপ্তানির দুয়ার

সংগৃহীত ছবি
সিলেট অঞ্চলের কৃষিপণ্য ও হাওরের দেশি মাছ রপ্তানির সম্ভাবনা থাকলেও আধুনিক সংরক্ষণ, মান যাচাই ও প্যাকেজিং সুবিধার অভাবে তা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এই সীমাবদ্ধতা কাটাতে প্রায় ৩৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক প্যাকিং হাউজ ও কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কৃষিপণ্যের অপচয় কমানো, আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে পণ্য রপ্তানি এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সুযোগ বাড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
সিলেটের গোয়ালগাদ্দা শিম, জারা লেবু ও নাগা মরিচের মতো কৃষিপণ্যের যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে চাহিদা রয়েছে। হাওরের দেশি মাছও যাচ্ছে বিদেশের বাজারে। তবে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে এসব পণ্যের রপ্তানি সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পাশে বড়শালা এলাকায় প্রায় পাঁচ একর খাসজমিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রাথমিক প্রস্তাব করা হয়েছে। এজন্য উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি করে কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর।
গত ২৩ সেপ্টেম্বর সিলেটে এক অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, ঢাকার শ্যামপুরের প্যাকিং হাউজ ও কোল্ড স্টোরেজের আদলে প্রয়োজনীয় সমীক্ষা করে দ্রুত প্রকল্পের কাজ শুরু করা হবে। প্রয়োজনে প্রকল্পের পরিধি বাড়ানো হবে। এটি বাস্তবায়িত হলে সিলেটকে দেশের অন্যতম প্রধান কৃষিপণ্য রপ্তানিকারক অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।
সিলেটের জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, প্রকল্পের জন্য বড়শালা এলাকায় খাসজমি নির্ধারণ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত কমপ্লেক্সে থাকবে এক হাজার টন ধারণক্ষমতার কোল্ড স্টোরেজ, প্যাকিং ও গ্রেডিং সুবিধা এবং মান যাচাইয়ের জন্য ১০টি পরীক্ষাগার। এ ছাড়া প্রশিক্ষণকেন্দ্র, সম্মেলনকক্ষ, অফিস ভবন ও বিদেশি ক্রেতাদের থাকার জন্য অতিথি ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পণ্য পরিবহন, লোডিং-আনলোডিং, মান নিয়ন্ত্রণ ও সনদ দেওয়ার ব্যবস্থাও থাকবে।
প্রকল্পের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করতে ঢাকা ও সিলেটের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা প্রস্তাবিত স্থান পরিদর্শন করে কৃষক, ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের সঙ্গে আলোচনা করবেন।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং গবেষক ফজলে এলাহী মোহাম্মদ ফয়সাল বলেছেন, আধুনিক প্যাকিং হাউজ ও কোল্ড স্টোরেজ নির্মিত হলে সিলেটের কৃষি অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। ড্রাগন ফল, সাতকড়া, তেজপাতা ও নাগা মরিচের উৎপাদন এবং রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে হাওরের মাছ পরীক্ষাগারে মান যাচাই করে উন্নত প্যাকেজিংয়ের মাধ্যমে বিদেশে পাঠানো সম্ভব হবে। পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের সুবিধা গড়ে উঠলে ডেইরি ও পোলট্রি খাতের সম্প্রসারণেও সহায়তা মিলতে পারে।
প্রকল্পের খসড়া ডিপিপি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন কমিটির আহ্বায়ক ও কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগের উপপরিচালক জুলিয়া যেসমিন মিলি। তিনি বলেছেন, কমপ্লেক্সের নকশা তৈরির কাজ চলছে। হাওরের মাছ রপ্তানির জন্য সনদ দেওয়ার সুবিধা ও একটি বিক্রয়কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাবও রয়েছে।
জুলিয়া যেসমিন মিলি আরও বলেছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। আন্তর্জাতিক বিধিবিধান মেনে পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানির জন্য কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে। এতে কৃষক ও রপ্তানিকারকদের মধ্যে সমন্বয় বাড়বে।
তিনি জানিয়েছেন, সিলেটের কৃষিপণ্য ও হাওরের মাছের আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা থাকলেও রপ্তানি সম্প্রসারণের জন্য মান নিয়ন্ত্রণ, উপযুক্ত সংরক্ষণ ও প্যাকেজিংয়ের ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রস্তাবিত প্যাকিং হাউজ ও কোল্ড স্টোরেজ এক্ষেত্রে কার্যকর অবকাঠামো হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে প্রকল্পটি এখনো প্রস্তাবিত পর্যায়ে রয়েছে। ডিপিপি অনুমোদন, অর্থায়ন ও বাস্তবায়নের পরই এর সুফল পাওয়া যাবে। সিলেটের কৃষিপণ্য ও মাছের রপ্তানি সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে তাই প্রকল্পটির দ্রুত অনুমোদন ও কার্যকর বাস্তবায়ন গুরুত্বপূর্ণ।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সিলেটের উপপরিচালক মো. শামসুজ্জামান বলেছেন, সরকার দায়িত্ব দিলে অধিদপ্তর প্রকল্পটি বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেবে। আধুনিক সংরক্ষণ ও প্যাকেজিং সুবিধা কৃষিপণ্যের অপচয় কমানো, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং রপ্তানি ও কর্মসংস্থান বাড়াতে সহায়ক হবে।



