নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর অনেক কলকারখানা বন্ধ

সংগৃহীত ছবি
মাসখানেক আগে থেকেই জ্বালানি সংকটে ভুগছিলেন নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দারা। লোডশেডিংয়ের সঙ্গে গ্যাসের নিম্নচাপে বিপাকে পড়েছিলেন আবাসিক গ্রাহক থেকে ব্যবসায়ীরা। উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানে। গত ১১ আগস্ট থেকে ক্রমেই মারাত্মক আকার নেয় পরিস্থিতি। একই সময় গ্যাস সরবরাহে স্বল্পতার কারণে তীব্র সংকটে পড়েন নগরীতে তিতাসের ৮১ হাজার আবাসিক গ্রাহক। দীর্ঘ ভোগান্তির পর কিছুটা স্বস্তি ফেরে ১৬ আগস্ট, কেটে যায় সিএনজি পাম্প ও আবাসিকের দৈন্য। তবে পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলোর সরবরাহ।
অন্যদিকে উল্টোচিত্র পার্শ্ববর্তী নরসিংদীতে; সারকারখানায় গ্যাস দেওয়ায় গলা শুকাচ্ছে শিল্প মালিকদের।
‘নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস, বিদ্যুৎ নিশ্চিত না হওয়ায় বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে নিটওয়্যার বা নিট পোশাক খাত। গত সপ্তাহে এই অবস্থা ছিল ভয়াবহ। এখন কিছুটা সরবরাহ বেড়েছে। গত কয়েক দিনের তুলনায় বলা যায় মন্দের ভালো। তবে নিয়মিত গ্যাস না পেলে শিপমেন্ট নিয়ে তৈরি হয় সংশয়’— অবস্থা তুলে ধরলেন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সহসভাপতি (অর্থ) ও আরএস কম্পোজিট লিমিটেডের ম্যানেজিং ডিরেক্টর মোরশেদ সারোয়ার সোহেল। পরিস্থিতি এখনো সংকটাপন্ন বলে জানালেন প্রাইম গ্রুপ অব কোম্পানিজের চেয়ারম্যান আবু জাফর আহমেদ বাবুল। তার অভিযোগ, গ্যাসসংকট ভয়াবহ। মাত্র কয়েকটি মেশিন চালু রাখতে পারছি। অন্য সব বন্ধ। গ্যাস সরবরাহ কবে নাগাদ স্বাভাবিক হবে, এরও নিশ্চয়তা নেই।
‘গ্যাসসংকটের কারণে চালু রাখতে পারছি না সুতা কারখানা। এখনো কাটেনি সমস্যা। নতুন করে দেখা দিয়েছে লোডশেডিং। খুব নাজেহাল অবস্থা। শুনেছি আগামী কয়েক দিনের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হবে’— উৎপাদন স্বাভাবিক না হওয়ার চিত্র তুলে ধরলেন বাংলাদেশ ইয়ার্ন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (বিওয়াইএমএ) সদস্য জোবায়ের আলম ঝলক।
নরসিংদীতে সার কারখানা যেন শিল্পের গলার কাঁটা: উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার ঘাটতি মেটাতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে নরসিংদীর ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া কারখানায়। দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম এই সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের চাহিদা মেটাতে গিয়ে বঞ্চিত স্থানীয় শিল্পকারখানাগুলো।
চরম সংকটে উৎপাদনমুখী মিলগুলো। উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠানে। এতে দৈনিক শত শত কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের।
মাসখানেক ধরে তীব্র গ্যাসসংকটে জেলার মাধবদী, শেকেরচর, চৌয়ালা এলাকার টেক্সটাইল, ডাইং এবং নিটিং, স্পিনিং কারখানাগুলোতে ধস নেমেছে উৎপাদনে। সময়মতো সরবরাহ করা যাচ্ছে না বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডারের পণ্য। হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে কোটি কোটি ডলারের বৈদেশিক রপ্তানি।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নরসিংদীর আমানত শাহ গ্রুপ, পাকিজা গ্রুপ, জজ ভূঁইয়া গ্রুপ, আবেদ টেক্সটাইল, শিপলু স্পিনিং, তিথি গ্রুপ, এমএমকে ডাইং ও চৌয়ালা এলাকায় মেসার্স ফকির সাইজিং মিলসহ শতাধিক কারখানার উৎপাদন বন্ধ। আবার দেশের বস্ত্র চাহিদার একটি বড় অংশ আসে মাধবদী, চৌয়ালা, ঘোড়াদিয়া, মেহেরপাড়া ও শেখেরচরের শিল্পকারখানাগুলো থেকে। তবে দীর্ঘদিন গ্যাসসংকটের কারণে এসব এলাকার টেক্সটাইল, ডাইং, নিটিং, উইভিং, স্পিনিং মিলসহ গ্যাসনির্ভর পোশাকশিল্পে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন।
‘শুধু আমানত শাহের কাছে ৩০ লাখ ডলারের অর্ডার আছে। কিন্তু সময়মতো দেওয়া যাবে না সরবরাহ। এতে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন বিদেশি ক্রেতারা। গ্যাসের প্রয়োজনীয় চাপ না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন। আমার সব মিল কারখানা বন্ধ। সেই সঙ্গে শ্রমিকের বেতন, গ্যাস বিল, বিদ্যুৎ বিল, ব্যাংকের দেনা কীভাবে পরিশোধ করব, তা নিয়ে রয়েছে দুশ্চিন্তা’— পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরলেন আমানত শাহ গ্রুপের পরিচালক রেজাউল করিম।
নরসিংদী চেম্বারের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোমেন মোল্লার ভাষ্য, ‘আমার এত বছরের ব্যবসায়ী জীবনে গ্যাসের এত বড় সংকট দেখিনি। এভাবে মিল কারখানা বন্ধ রাখতে হলে অন্ত থাকবে না লোকসানের।’ শিল্প খাত বাঁচাতে গ্যাসের সুষম বণ্টন চাইলেন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডের (বিটিএমএ) মুখপাত্র আবদুল্লাহ আল মামুন।
নরসিংদী তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন উপমহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মামুনুর রহমানের ব্যাখ্যা, নরসিংদীতে দৈনিক ৫০ পিএসআই গ্যাসের চাহিদা থাকলেও মিলছে ২০ পিএসআই। এর মধ্যে সার কারখানায় অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশনা আছে সরকারের।






