সরকারের ১৮০ দিন
দুর্ভোগ বেশি স্বস্তি কম

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনার প্রতিশ্রুতি থাকলেও, সরকারের ক্ষমতার ছয় মাস পূর্তিতে বাজারের চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নেওয়া নতুন সরকারের ছয় মাসের মাথায় চাল, ডাল, ভোজ্য তেল, ডিমসহ প্রায় প্রতিটি নিত্যপণ্যের দাম নির্বাচনী সময়ের তুলনায় আরও ঊর্ধ্বমুখী। এতে ভোগান্তির মুখে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত সাধারণ মানুষ। সরকারের রাজস্ব শুল্ক ছাড়ের সুবিধা খুচরাপর্যায়ে না পৌঁছানো এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যের পাশাপাশি সাম্প্রতিক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি-সংকট এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। সরবরাহে টান ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধিতে নিত্যপণ্যের লাগামহীন বাজারে সাধারণ মানুষের দৈনিক জীবনযাত্রা এখন অসহনীয় চাপের মুখে।
কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব), ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) ও খুচরা বাজারদর অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি থেকে আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে নিত্যপণ্যের দাম কেজিপ্রতি ৫ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। সরু চাল ৭২-৮২ থেকে বেড়ে ৭৮-৮৮ এবং মোটা চাল ৫৫-৬০ থেকে ৬২-৬৫ টাকায় উঠেছে। খোলা সয়াবিন তেল লিটারে ১৬৫-১৭০ থেকে ১৮৫-১৯২ এবং বোতলজাত তেল ১৭৫-১৮০ থেকে বর্তমানে ১৯০-১৯৬ টাকা।
ডজনপ্রতি ফার্মের ডিম ১৩০-১৩৫ থেকে ১৫৫-১৬৫ এবং ব্রয়লার মুরগি কেজিপ্রতি ১৭৫-১৯০ থেকে বেড়ে ২০৫-২২০ টাকা হয়েছে। এ ছাড়া দেশি পেঁয়াজ ৪৫-৫৫ থেকে ৬০-৬৫, মসুর ডাল ১৫০ থেকে ১৬০ এবং ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার ১ হাজার ৩৫০ থেকে বেড়ে বর্তমানে ১ হাজার ৬০০ টাকা।
বাজার নিয়ন্ত্রণে গত ছয় মাসে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর সারা দেশে প্রতিদিন গড়ে ৩০-৪০টি তদারকি অভিযান চালিয়েছে। অতিরিক্ত দাম, মূল্য তালিকা না রাখা ও অবৈধ মজুদের অপরাধে প্রায় চার হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠানকে আড়াই কোটি টাকার মতো জরিমানা করা হয়। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে পরিচালিত ১ হাজার ২০০টির বেশি মোবাইল কোর্টে অসাধু ব্যবসায়ীদের দণ্ড দেওয়া হয় এবং টিসিবির অনিয়মের দায়ে অর্ধশতাধিক ডিলারের লাইসেন্স স্থগিত করা হয়। তবে ক্যাবের মতে, এসব অভিযান প্রধানত খুচরা ও পাইকারি বাজারে সীমাবদ্ধ থাকায় এবং বড় করপোরেট সিন্ডিকেটে সরাসরি আঘাত হানতে না পারায় বাজার পরিস্থিতিতে অধরা কাঙ্ক্ষিত স্থায়ী স্বস্তি।
জানতে চাইলে ক্যাব সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বললেন, ‘নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনতে যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন ছিল, গত ছয় মাসে তার স্পষ্ট ঘাটতি দৃশ্যমান। আমদানিতে কিছু শুল্ক ছাড় দেওয়া হলেও বাজারে সিন্ডিকেট এবং করপোরেট মিলার ও রিফাইনারিগুলোর ওপর সরকারের কঠোর এবং কেন্দ্রীয় কোনো নজরদারি ছিল না। ফলে কর ছাড়ের সুবিধা সাধারণ ভোক্তারা পাননি, চলে গেছে মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে। বাজার স্বাভাবিক করতে হলে আমদানিকারক থেকে শুরু করে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত সরবরাহ শৃঙ্খলে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে এবং জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখা জরুরি।’
বাজারের এ অনিয়ন্ত্রিত অবস্থার পেছনে সম্প্রতি তীব্র হয়ে ওঠা জ্বালানি ও বিদ্যুৎসংকট গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। তীব্র গরমে অব্যাহত লোডশেডিংয়ের ফলে খামারগুলোতে পোলট্রি উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে এবং বিপুলসংখ্যক মুরগি মারা যাওয়ায় ডিম ও মুরগির সরবরাহে টান পড়েছে। খামার ও হ্যাচারিতে ব্যবহৃত বিকল্প জেনারেটর পরিচালনার জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচে এর প্রভাব।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রভাবে পাইকারি আড়ত ও হিমাগারগুলোতে পচনশীল শাকসবজি দ্রুত নষ্ট হওয়ায় বাজারে কৃত্রিম সংকট দেখা দিয়েছে, যার ফলে বেগুন, করলা, কাঁচা মরিচ, ঢেঁড়সসহ অধিকাংশ সবজির মূল্য কেজিপ্রতি ৮০ থেকে ১২০ টাকার ওপরে।
সরকার ক্ষমতার শুরুর দিকে জাতীয় বাজেটে চাল, তেলসহ প্রায় ৬০টি পণ্যের ওপর উৎসে কর ও অগ্রিম আয়কর কমিয়ে আনার মতো রাজস্ব পদক্ষেপ নিলেও তার প্রত্যক্ষ ফল সিন্ডিকেটের কারণে খুচরা বাজার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি। ক্ষমতার ছয় মাস পূর্তিতে এসে নির্বাচনকালীন যে স্বস্তির প্রত্যাশা সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছিল, বাস্তব বাজারে তার উল্টো চিত্রই দৃশ্যমান।






