৮০ প্রকল্পে বেসরকারি বিনিয়োগের খোঁজ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সময় গড়িয়েছে, প্রকল্পের তালিকা বড় হয়েছে; কিন্তু সফল বাস্তবায়নের উদাহরণ খুব বেশি তৈরি হয়নি। এক দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ বা পিপিপি মডেল এখনো প্রত্যাশিত জায়গায় পৌঁছাতে পারেনি বলে মনে করছেন নীতিনির্ধারক ও বিশেষজ্ঞরা। এ অবস্থার মধ্যেই আগামী অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) নতুন করে যুক্ত করা হয়েছে ৮০টি পিপিপি প্রকল্প। রাজধানী ঢাকাকে কেন্দ্র করে মেট্রোরেল সম্প্রসারণ থেকে শুরু করে বড় বড় অবকাঠামো— সব মিলিয়ে এক বিশাল পরিকল্পনার তালিকা। মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকা। এজন্য সরকারের পক্ষ থেকে বেসরকারি বিনিয়োগকারী খোঁজা হচ্ছে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যেখানে পিপিপি প্রকল্প ছিল ৭৯টি, সেখানে এবার বেড়েছে মাত্র একটি। সংখ্যাগত এই সামান্য পরিবর্তনই বলে দিচ্ছে, পিপিপি মডেলটি এখনো পৌঁছায়নি বড় ধরনের রূপান্তরের জায়গায়।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, সমস্যা প্রকল্পের অভাবে নয়; বরং কাঠামোগত দুর্বলতায়। তাদের মতে, বাংলাদেশে পিপিপি ধারণা ভালো হলেও বাস্তবায়নের মডেল এখনো কার্যকর হয়নি। ফলে বড় ঘোষণা থাকলেও মাঠপর্যায়ে সফলতার নজির খুবই কম।
একটা সময় ছিল, যখন দেশের অবকাঠামো উন্নয়নের বড় স্বপ্নগুলো শুধু সরকারি বাজেটের সীমায় আটকে থাকত। সড়ক, সেতু, মেট্রো— সবকিছুর পেছনে থাকত একটিই প্রশ্ন, টাকা কোথা থেকে আসবে? ঠিক সে জায়গা থেকেই বাংলাদেশে শুরু হয়েছিল নতুন ধারণা— পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ বা পিপিপি। ধারণাটা ছিল সহজ, কিন্তু সাহসী— সরকার ও বেসরকারি খাত একসঙ্গে বিনিয়োগ করবে, আর বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে দ্রুত ও দক্ষভাবে।
২০০৯ সালে এই মডেলের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। পরের বছরই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে গঠিত হয় পিপিপি অথরিটি। লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট, বেসরকারি বিনিয়োগ টেনে এনে দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে গতি আনা। ২০১২ সালে প্রথম দফায় সাতটি প্রকল্প অনুমোদনও পায়। তখন অনেকেই ভেবেছিলেন, হয়তো এবার বড় পরিবর্তনের সূচনা হচ্ছে। কিন্তু কয়েকটি প্রকল্প ছাড়া পিপিপি মডেলের বড় কোনো সফল উদাহরণ এখনো দাঁড়ায়নি।
এখন পর্যন্ত বড় প্রকল্পের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হলো মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার। তবে সেটির সফলতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এরপর ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজ চলছে; কিন্তু সেখানে ধীরগতিসহ দেখা দিয়েছে নানা জটিলতা।
এই অবস্থায় নতুন করে এত বড়সংখ্যক মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশ্লেষকরা।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিষয়টি শুধু বাস্তবায়নের নয়, পরিকল্পনারও অংশ। পিপিপি মহাপরিচালক (প্রোগ্রামিং অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশনাল) চৌধুরী মোয়াজ্জেম আহমদ বলেছেন, এ তালিকায় প্রকল্প থাকা মানে এগুলো পাইপলাইনে আছে। এতে বিনিয়োগকারীরা সরকারের অগ্রাধিকার বুঝতে পারেন এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, পিপিপির আওতায় থাকা প্রকল্পগুলো বিভিন্ন খাতে বিস্তৃত। সাধারণ সরকারি সেবা থেকে শুরু করে শিল্প ও অর্থনৈতিক সেবা খাতে ২১টি প্রকল্প রয়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের মেট্রোরেল লাইন-২, যার ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২৯ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা। এর মধ্যেই এটি অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির (সিসিইএ) অনুমোদন পেয়েছে।
এ ছাড়া মাতারবাড়ী ল্যান্ড বেজড এলএনজি টার্মিনাল প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০ হাজার ৩৮ কোটি টাকা। ঢাকা আউটার রিংরোড প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ১২ হাজার ৯৯৬ কোটি টাকা। কমলাপুর মাল্টিমোডাল হাব নির্মাণে খরচ ধরা হয়েছে ২২ হাজার ৫৭ কোটি টাকা। বে-টার্মিনাল প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ ১৭ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকা।
ঢাকা ইস্ট-ওয়েস্ট এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৭ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা। দ্বিতীয় পদ্মা মাল্টিপারপাস ব্রিজ প্রকল্পেও ধরা হয়েছে প্রায় ১২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা। সব প্রকল্পই কাগজ-কলমে বড় এবং সম্ভাবনাময়; কিন্তু বাস্তবায়নের পথ এখনো অনেক অনিশ্চিত।
বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, সমস্যার মূল জায়গায় আস্থার ঘাটতি রয়েছে। তাঁর মতে, পিপিপির মূল ধারণা হলো সরকারি ও বেসরকারি যৌথ বিনিয়োগ। কিন্তু এখানে যদি বেসরকারি খাত সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা না পায়, তাহলে বিনিয়োগ আসবে না।
তিনি আরও বলেছেন, অনেক সময় বিনিয়োগকারীরা আশঙ্কা করেন— প্রকল্পে বিনিয়োগ করলে নীতিগত জটিলতা, আইনি বাধা বা সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে হবে কি না। লাভ ভাগাভাগি কীভাবে হবে, সিদ্ধান্তে বেসরকারি খাতের কতটা অংশগ্রহণ থাকবে— এসব প্রশ্নের পরিষ্কার জবাব না থাকলে বড় বিনিয়োগ আসা কঠিন।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো, ‘ভালো বিনিয়োগকারী’ পাওয়া। তার মতে, অনেকেই সুযোগ নিতে আসেন, দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন নয়—ফলে পুরো ব্যবস্থায় একধরনের রেন্ট-সিকিং প্রবণতা সৃষ্টি হয়।




