রাজস্ব বৃদ্ধি ও কর ছাড়ে ভারসাম্য জরুরি

বাজেট শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, এটি একটি দেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ পথচলার রূপরেখাও। প্রতি বছর বাজেট ঘোষণার সময় সরকার রাজস্ব আয় বাড়ানোর উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করে, উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানোর পরিকল্পনা নেয় এবং বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে কর ছাড় ও প্রণোদনার ঘোষণা দেয়। কিন্তু কাগজে-কলমে নির্ধারিত লক্ষ্য বাস্তবে কতটা অর্জন করা সম্ভব হবে, সেই প্রশ্নও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে, এমন একসময়ে যখন দেশের অর্থনীতি নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে; বিনিয়োগে স্থবিরতা রয়েছে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি প্রত্যাশিত নয়।
প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আহরণের যে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। একদিকে ভ্যাটের আওতা সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজস্ব বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, অন্যদিকে বিভিন্ন শিল্প খাতে কর ছাড় ও প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। ফলে রাজস্ব বৃদ্ধির লক্ষ্য এবং কর রেয়াতের মধ্যে একটি কার্যকর ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি হবে। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এত বড় রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের চাপ শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপর গিয়ে পড়ে কি না— সেটিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি শেষ পর্যন্ত দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির গতিপ্রকৃতির ওপরই নির্ভর করবে। বিনিয়োগ, উৎপাদন এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছালে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হতে পারে, তবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কাঙ্ক্ষিত গতি না পেলে নির্ধারিত রাজস্ব সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়বে। এ কারণে আগামী অর্থবছরে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শিল্প খাতে কর ছাড় দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের উচিত নিয়মিত মূল্যায়ন করা, এসব সুবিধার ফলে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও উৎপাদনে কতটা ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। কারণ দীর্ঘদিন ধরে দেশে বিনিয়োগে মন্দা বিরাজ করছে। আর নতুন বিনিয়োগ না হওয়ায় প্রত্যাশিত হারে কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হচ্ছে না। শুধু কর ছাড় দেওয়া নয়, এর বিপরীতে অর্থনীতিতে কী ধরনের বাস্তব সুফল আসছে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় রাজস্ব ক্ষতির তুলনায় অর্থনৈতিক লাভ কম হলে তা দীর্ঘ মেয়াদে কার্যকর নীতি হিসেবে বিবেচিত হবে না।
সামগ্রিকভাবে বাজেট বাস্তবায়নের সাফল্য নির্ভর করবে রাজস্ব প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি, কর ভিত্তি সম্প্রসারণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার ওপর। তাই শুধু উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেই হবে না, বাস্তবায়ন সক্ষমতা বাড়ানোর দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। সেই সঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে যুগোপযোগী সংস্কারের আওতায় এনে একটি দক্ষ, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করাও সময়ের দাবি।




