শিক্ষাখাতে বাজেট বেড়েছে ৫৬ শতাংশের বেশি, থাকছে বাধ্যতামূলক তৃতীয় ভাষা

সংগৃহীত ছবি
নতুন সরকারের প্রথম বাজেটে গুরুত্ব পেয়েছে শিক্ষাখাত। গত অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৫৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ বরাদ্দ বেশি দেওয়া হয়েছে এবার। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৮৭ হাজার ২০৬ কোটি টাকা, জিডিপির ১.৩৯ শতাংশ। এবার ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মোট জিডিপির ২ শতাংশ।
দীর্ঘ দেড় দশকের রাজনৈতিক অস্থিরতায় ভেঙে পড়া শিক্ষা কাঠামোকে পুনর্গঠন এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা পূরণে এই বাজেট প্রস্তাবে একাধিক যুগান্তকারী পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
বাজেট প্রস্তাব অনুযায়ী, গত অর্থবছরের তুলনায় এবার শিক্ষাখাতে বরাদ্দ একলাফে ৪৯ হাজার ৪০০ কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে। সরকারের চূড়ান্ত লক্ষ্য এই বরাদ্দ পর্যায়ক্রমে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করা।
অর্থমন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় শিক্ষাক্রমকে এমনভাবে রূপান্তর করা হচ্ছে, যেন ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ বা আনন্দময় শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধ ও নেতৃত্বের গুণাবলি বিকশিত হয়।
বাধ্যতামূলক তৃতীয় ভাষা ও উচ্চশিক্ষায় ঋণ
দেশের কর্মসংস্থান ও বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে সংগতি রেখে শিক্ষাক্রমে বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি বাধ্যতামূলক একটি তৃতীয় ভাষা অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এর মধ্যে জাপানিজ, কোরিয়ান, চীনা, আরবি, ফ্রেঞ্চ ও জার্মান ভাষাকে কারিকুলামে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। যেসকল শিক্ষার্থী এই তৃতীয় ভাষায় জ্ঞান অর্জন করে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে উচ্চশিক্ষার জন্য যেতে চাইবে, তাদের ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা দেবে সরকার।
বিনামূল্যে স্নাতক ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের সহায়তা
নারী শিক্ষার প্রসারে মেয়েদের জন্য স্নাতক (অনার্স) পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক বা বিনামূল্যে করা হয়েছে। এছাড়া দরিদ্র শিক্ষার্থীদের স্কুল ইউনিফর্ম, জুতা ও স্কুলব্যাগ সরবরাহ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং বিশেষায়িত সহায়ক প্রযুক্তি ও শিক্ষাসামগ্রী প্রদান করা হবে।
ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কারিগরি শিক্ষা ও মাদ্রাসা আধুনিকায়ন
বাংলাদেশকে একটি দক্ষতাভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তর করতে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই পর্যায়ক্রমে সবার জন্য কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা চালু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী মেধা ও আগ্রহ অনুযায়ী গবেষক, শিল্পী বা উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে। পাশাপাশি মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় শিক্ষার বাইরেও বিজ্ঞান, গণিত, ইংরেজি ও তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং কর্মমুখী প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা হবে।
প্রযুক্তি ও এআই নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা
আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রযুক্তি ও এআই-নির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন এবং বিনামূল্যে ওয়াই-ফাই সুবিধা সম্প্রসারণ করা হবে। শক্তিশালী ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সংযোগ, এপ্রেনটিসশীপ ও ইন্টার্নশিপ সুবিধা এবং স্টার্ট-আপ চালুকরণের মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করাও এই বাজেটের অন্যতম লক্ষ্য।
মিড-ডে মিল ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা
ছাত্র-ছাত্রীদের পুষ্টির চাহিদা মেটাতে এবং সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতকরণে স্কুলগুলোতে মিড-ডে মিল কর্মসূচি পুনরায় চালু এবং তা পর্যায়ক্রমে সারা দেশে সম্প্রসারণ করা হবে। এর পাশাপাশি ছাত্রী ও শিক্ষিকাদের স্যানিটেশন ও হাইজিনকে প্রাধান্য দিয়ে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিতর্ক, বিজ্ঞান মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সাহিত্যচর্চার মতো ক্লাব ভিত্তিক সহশিক্ষা কার্যক্রমকেও উৎসাহিত করা হবে।
মেধা পাচার রোধে ‘ব্রেইন সার্কুলেশন’
দেশ থেকে মেধা পাচার (ব্রেইন ড্রেইন) রোধ করে একে ‘ব্রেইন সার্কুলেশনে’ রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অধীনে বিদেশে বসবাসরত ও বৈশ্বিক জ্ঞান-অভিজ্ঞতাসম্পন্ন উচ্চশিক্ষিত বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞদের দেশের শিক্ষা ও গবেষণা ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা করছে সরকার। সেই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরেও গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিশেষ গুরুত্ব ও কার্যকর পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করা হবে।







