সিপিডির সংবাদ সম্মেলন
নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ওপর করের বোঝাই বেশি

ড. ফাহমিদা খাতুন
বাজেটের আকার কত বড় হলো সেটি মুখ্য নয়; বরং এর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)। তাদের মতে, সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বাড়ানো না হলে বাজেটের কোনো লক্ষ্যমাত্রাই পূরণ সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন বড় ধরনের সংস্কার।
গতকাল শুক্রবার রাজধানীতে বাজেট-পরবর্তী পর্যালোচনা নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সিপিডির পক্ষে এ মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়। এতে বক্তব্য দেন সংস্থাটির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান ও নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন।
সিপিডির মতে, অর্থনৈতিক সংকটাবস্থার মধ্যে সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের যে বাজেট প্রস্তাব করেছে, তার সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভিত্তিই বাস্তবসম্মত নয়। এ ছাড়া বর্তমান করকাঠামোয় সমাজের নিম্ন আয়ের মানুষের ওপরই করের বোঝা অনেক বেশি পড়ছে বলেও তারা মনে করেন। সে বিবেচনায় প্রস্তাবিত বাজেটে করমুক্ত আয়ের সীমা আরও বাড়ানো প্রয়োজন ছিল বলে জানিয়েছে সিপিডি। তাদের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির এ সময়ে করমুক্ত আয়ের যে সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা নিম্ন আয়ের মানুষদের স্বস্তি দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।
সংবাদ সম্মেলনে মোস্তাফিজুর রহমান বললেন, বাজেটের প্রাক্কলনগুলো এমনভাবে করা হয়েছে, যেন মনে হচ্ছে চলতি অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে হঠাৎ করে অর্থনীতিতে একটি চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। আর তাতে করে প্রবৃদ্ধি হঠাৎ বেড়ে যাবে, মূল্যস্ফীতি কমে আসবে এবং বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ ও সম্পদ আহরণ আকস্মিকভাবে বৃদ্ধি পাবে। এ ধরনের প্রাক্কলন বাস্তবসম্মত নয়।
এটি বাজেটের শৃঙ্খলা নষ্ট করে উল্লেখ করে তিনি বললেন, ‘বর্তমান সরকার উত্তরাধিকারসূত্রেই কিছু প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার অভাব ও অর্থনৈতিক দুর্বলতা পেয়েছে। তাই ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের পর মার্চ থেকে জুনের মধ্যে কোনো বৈপ্লবিক পরিবর্তন সম্ভব নয়। এমন পরিস্থিতিতে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া দুর্বলতাগুলো স্বীকার করে যদি ভিত্তিটি বাস্তবসম্মতভাবে নির্ধারণ করা হতো, তবে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাগুলো আরও টেকসই হতো।
সিপিডির এই সম্মাননীয় ফেলোর মতে, প্রস্তাবিত বাজেটের সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রক্ষেপণগুলো বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। বিদায়ী অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ১৪ শতাংশে নামলেও নতুন বাজেটে তা একলাফে ৬ দশমিক ৫ এবং মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩ থেকে কমিয়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ করার লক্ষ্য ধরা হয়েছে। এটি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ ছাড়া অর্জন করা অসম্ভব। পাশাপাশি কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়াই রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৯, আমদানি ১৫ দশমিক ৮ এবং রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি ১৫ শতাংশ প্রাক্কলন করায় এ লক্ষ্যমাত্রাগুলো শুরু থেকেই রয়েছে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে।
সংবাদ সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ড. ফাহমিদা খাতুন। এতে তিনি বলেন, ব্যবসায়িক ও রাজস্ব কাঠামোর বিশ্লেষণে দেখা যায়, নতুন বাজেটে মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১৯ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। কর প্রশাসনের দীর্ঘদিনের দুর্বলতা, সীমিত করজাল এবং কর ফাঁকির সংস্কৃতির কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যেখানে ধারাবাহিক রাজস্ব ঘাটতি সৃষ্টি হচ্ছে, সেখানে বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এ লক্ষ্য পূরণ অসম্ভব।
সিপিডির মূল প্রবন্ধে বলা হয়, করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা হলেও বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে তা জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় মোটেও পর্যাপ্ত নয়। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর করের চাপ তুলনামূলকভাবে বাড়ছে। পাশাপাশি ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের ওপর এ চাপ থাকলেও করপোরেট কর পাঁচ বছরের জন্য স্থিতিশীল রাখার ঘোষণা ব্যবসায়ীদের জন্য ইতিবাচক বার্তা দেয়।
অর্থনীতিতে সুশাসনের অভাব ও বৈষম্য বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে আবাসন খাতে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বহাল রাখার কড়া সমালোচনা করেছে সিপিডি।




