যুক্ত হচ্ছে নতুন ৮ মেগা কর্মসূচি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সামাজিক নিরাপত্তায় চমক থাকছে বাজেটে। সমাজের অসহায় ও নিম্ন আয়ের মানুষ, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং নারীদের স্বাবলম্বী করতে নেওয়া হচ্ছে অভূতপূর্ব পদক্ষেপ। এ খাতে যুক্ত হচ্ছে নতুন আট কর্মসূচি। এর মধ্যে অন্যতম ফ্যামিলি কার্ড, যা বাস্তবায়নে খরচ করা হবে মোট বরাদ্দের সিংহভাগ। এ ছাড়া কৃষক কার্ড, কর্মহীন শ্রমিক সুরক্ষা, জুলাই শহীদ পরিবার ও আহতদের ভাতা এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের সম্মানীর বিষয়টিও উল্লেখযোগ্য।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এবারের বাজেটে প্রকল্প নিচ্ছে নবগঠিত সরকার। এরই অংশ হিসেবে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে যুক্ত করা হচ্ছে ভিজিএফ (মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়) এবং খাল খনন ও বৃক্ষরোপণও। খাল খনন ও বৃক্ষরোপণে নেওয়া হবে আলাদা প্রকল্প। অন্য কর্মসূচিগুলো মাঠে গড়াতে বরাদ্দ থাকছে ১৫ হাজার ৩২৩ কোটি টাকা।
দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি মূলত দারিদ্র্যবিমোচন কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এবার সেটি রূপ নিচ্ছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার হাতিয়ারে। প্রথমবারের মতো সামাজিক নিরাপত্তা খাতকে শুধু মানবিক সহায়তা নয়, বরং অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা তৈরির ‘অর্থনৈতিক ইঞ্জিন’ হিসেবে ব্যবহার করতে যাচ্ছে সরকার। এই উদ্যোগ একদিকে নিম্ন আয়ের পরিবার, প্রান্তিক কৃষক, শ্রমিক ও ধর্মীয় গোষ্ঠীকে সরাসরি আর্থিক সুরক্ষার আওতায় আনছে। অন্যদিকে রাজনৈতিকভাবে একটি বিস্তৃত সামাজিক জোট তৈরি করবে— ধারণা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
বিষয়টি আরও স্পষ্ট করলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি আগামীর সময়কে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘আমরা চাই অর্থনীতির সুফল যেন সবার কাছে পৌঁছায়। এজন্য একটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে হবে। যারা এতদিন অর্থনীতির মূলধারার বাইরে ছিলেন, তাদের আর্থিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে হবে। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে সহায়তা দেওয়া হবে অনেক পরিবারকে। সেখানে পরিবারের নারী সদস্যকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, এতে তাদের ক্ষমতায়নও নিশ্চিত হবে। কৃষকদেরও বাদ দেওয়া হচ্ছে না। সার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত সব ক্ষেত্রে তাদের সহায়তা দিতে হবে। নইলে সামগ্রিক উন্নয়নের মধ্যেও কৃষকরা বঞ্চিত থেকে যাবেন।’
বাজেটের কেন্দ্রবিন্দুতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’: এককভাবে এই কর্মসূচির জন্য বরাদ্দ থাকছে ১২ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা, যা সামাজিক নিরাপত্তা খাতের সবচেয়ে বড় বাজেট। প্রায় ৪১ লাখ পরিবার বা ব্যক্তি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে ভাতা পাবেন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি কার্যত প্রথম বড় পরিসরের পরিবারভিত্তিক নগদ সহায়তা কর্মসূচি, যা আন্তর্জাতিকভাবে ‘টার্গেটেড ক্যাশ ট্রান্সফার’ মডেলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এককভাবে এই কর্মসূচির বরাদ্দই অনেক মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক উন্নয়ন বাজেটের চেয়েও বেশি। ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা পেলে সামাজিক নিরাপত্তার অন্য কোনো কর্মসূচির সুবিধা পাবেন না ওই উপকারভোগীরা।
কর্মহীন শ্রমিকদের জন্য প্রথম নিরাপত্তা বেষ্টনী: শিল্প ও সেবা খাতে কর্মহীন হয়ে পড়া শ্রমিকদের জন্যও নেওয়া হচ্ছে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি। ১৫ হাজার শ্রমিক সর্বোচ্চ তিন মাস মাসিক ৫ হাজার টাকা করে পাবেন। বরাদ্দ ২২ দশমিক ৬৪ কোটি টাকা। অর্থনীতিবিদদের মতে, কর্মহীন শ্রমিকদের জন্য নতুন সুরক্ষা কর্মসূচি শিল্প খাতে একধরনের ‘বেকার ভাতা’ কাঠামোর সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বৈশ্বিক মন্দা বা রপ্তানি খাতে ধাক্কা এলে এটি শ্রমবাজারে স্থিতিশীলতা আনতে ভূমিকা রাখতে পারে।
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের জন্য নতুন ভাতা: সরকার প্রথমবারের মতো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের জন্যও বড় আকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু করছে। ইমাম, মুয়াজ্জিন, পুরোহিত, সেবাইত, বৌদ্ধ ভিক্ষু, খাদেমসহ ২ লাখ ৫৫ হাজার ৬৬৬ জনকে মাসিক সম্মানী দেওয়া হবে। এর মধ্যে ইমাম, পুরোহিত ও বিহার অধ্যক্ষের ভাতা মাসে ৫ হাজার টাকা, মুয়াজ্জিন, পুরোহিত, সেবাইত, বিহার উপাধ্যক্ষের ভাতা ৩ হাজার এবং মসজিদের খাদেমের ভাতা ২ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ হাজার ৮১ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও আহতদের ভাতা: ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের ভাতা কর্মসূচিতে ১৬ হাজার ৫১৩ উপকারভোগী অন্তর্ভুক্ত হচ্ছেন। এর মধ্যে ৪৪টি শহীদ পরিবার মাসে ২০ হাজার টাকা করে পাবে। গুরুতর আহত ‘এ’ শ্রেণির ১ হাজার ৬০৭ জনকে মাসিক ২০ হাজার টাকা, ‘বি’ শ্রেণির ২ হাজার ৬১৪ জনকে ১৫ হাজার টাকা এবং ‘সি’ শ্রেণির ১২ হাজার ৪৪৮ জনকে ১০ হাজার টাকা সম্মানী ভাতা দেওয়া হবে। এই খাতে সরকারের বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২৩৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা। এ ছাড়া কৃষকের হাতে সরাসরি নগদ অর্থ দিতে প্রথমবারের মতো কৃষক কার্ডের মাধ্যমে ৪২ লাখ ৫০ হাজার কৃষককে বছরে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে দেওয়া হবে। ভিজিএফের পরিধি বাড়িয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, যারা মৎস্যজীবী, তাদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেওয়া হবে ১ লাখ ১০ হাজার টন চাল।




