এমডি হতে পেরোতে হবে ৩০ শর্ত
- সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের নিয়োগ নীতিমালা জারি
- গোয়েন্দা সংস্থা ও দুদকের প্রতিবেদনের ভিত্তিতেও প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা যাচাই হবে

ফাইল ছবি
রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ পদে বসতে হলে এখন শুধু দীর্ঘ অভিজ্ঞতা বা উচ্চতর ডিগ্রি থাকলেই হবে না। প্রমাণ করতে হবে তিনি কখনো ঋণখেলাপি ছিলেন না, কর ফাঁকি দেননি, আর্থিক জালিয়াতি বা দুর্নীতির সঙ্গে জড়াননি এবং কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থার শাস্তিও পাননি। এমনকি নিয়োগের আগে গোয়েন্দা সংস্থা ও দুদকের প্রতিবেদনের ভিত্তিতেও প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করা হবে।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের এমডি নিয়োগ নীতিমালায় এ বিধান যুক্ত করে জারি করা হয়েছে নীতিমালা। এর নাম ‘রাষ্ট্রমালিকানাধীন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পদে নিয়োগের জন্য মনোনয়ন প্রধান নীতিমালা, ২০২৬’। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ গত ২৬ জুলাই এটি জারি করেছে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদন ও দুদকের যাচাই: নীতিমালার এমডি মনোনয়নের আগে প্রার্থীর বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা হবে। এর অর্থ হলো, শুধু ব্যাংকিং দক্ষতা নয়, একজন প্রার্থীর আর্থিক ও ব্যক্তিগত সততাও নিয়োগের পূর্বশর্তে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নিয়োগে নিরাপত্তা যাচাই নতুন নয়। তবে ব্যাংকের এমডি নিয়োগে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে নীতিমালার অংশ হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।
ঋণ ও করখেলাপির জন্য ‘শূন্য সহনশীলতা’: নীতিমালায় বলা হয়েছে— ঋণ ও করখেলাপি হওয়া যাবে না। এ ছাড়া আর্থিক প্রতারণা, জালিয়াতি কিংবা নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিধি লঙ্ঘনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা, আদালত কর্তৃক দেউলিয়া ঘোষিত, দুর্নীতির কারণে চাকরি হারানোর ইতিহাস থাকলে অযোগ্য বিবেচিত হবেন।
এ প্রসঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ব্যাংক খাতে গত এক দশকে সবচেয়ে বড় সংকট ছিল নেতৃত্বের। খেলাপি ঋণ, রাজনৈতিক প্রভাব, পরিচালনা পর্ষদের ব্যর্থতা এবং অযোগ্য নেতৃত্বের কারণে একের পর এক ব্যাংক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। এমন বাস্তবতায় সরকার নবগঠিত রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের নীতিমালায় অনেকটা কঠোরতা আনছে।
শুধু এমডি হলেই হবে না, হতে হবে পরীক্ষিত নেতা: নীতিমালায় বলা হয়েছে, প্রার্থীকে কমপক্ষে ২০ বছরের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। তবে শুধু অভিজ্ঞতাই যথেষ্ট নয়, তিনি বর্তমান বা সাবেক এমডি হতে পারেন অথবা এমডির ঠিক আগের পদে অন্তত দুই বছর দায়িত্ব পালন করতে হবে। অর্থাৎ, প্রথমবারের মতো কোনো কর্মকর্তাকে সরাসরি এমডি পদে উন্নীত করার সুযোগ কার্যত সীমিত করা হয়েছে। এতে নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়লেও যোগ্য কিন্তু অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতৃত্বের জন্য সুযোগ সংকুচিত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিকভাবে দুর্বল ব্যাংকের মূল সমস্যা প্রায়ই আর্থিক নয়— নেতৃত্বগত। দুর্বল নেতৃত্ব, অদক্ষ ব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং জবাবদিহির অভাব একটি সুস্থ ব্যাংককেও দ্রুত সংকটে ঠেলে দিতে পারে।
নেতৃত্ব নির্বাচনকে ‘রিস্ক ম্যানেজমেন্ট’-এ রূপান্তর: নীতিমালার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এমডি নিয়োগকে আর শুধু অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভরশীল রাখা হয়নি। শিক্ষাগত যোগ্যতা, শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং জ্ঞান, সাইবার নিরাপত্তা, অর্থ পাচার প্রতিরোধ, নৈতিকতা, আর্থিক স্বচ্ছতা, এমনকি ব্যক্তিগত সুনাম— সবকিছুকে একসঙ্গে মূল্যায়নের আওতায় আনা হয়েছে।
বয়স ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ: নীতিমালায় ন্যূনতম বয়স ৪৫ বছর এবং সর্বোচ্চ দায়িত্ব পালনের বয়স ৬৫ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। এমডিকে সর্বোচ্চ তিন বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হবে। কর্মদক্ষতা ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে পুনর্নিয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী নিয়োগের পরিবর্তে কর্মসম্পাদনভিত্তিক মূল্যায়নের সংস্কৃতি জোরদার হতে পারে।




