উচ্চমূল্যের এলএনজিতে চাপ বাড়ছে ভর্তুকিতে, বিনিয়োগ ঝুঁকিতে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আন্তর্জাতিক বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) ২০ ডলার হলে বাংলাদেশকে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসে ৬০ টাকার বেশি ভর্তুকি দিতে হয়। এ বছর সরবরাহ বিঘ্নের কারণে বিভিন্ন সময়ে এর চেয়েও বেশি দামে এলএনজি কিনতে হয়েছে বাংলাদেশকে।
এতে সরকারের ওপর ভর্তুকির চাপ আরও বেড়েছে। তা চাপ ফেলেছে বিনিয়োগেও। দেখা যাচ্ছে, বর্তমান অবস্থায় বাংলাদেশসহ এশিয়ার চার দেশে এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প ও টার্মনাল নির্মাণ অর্ধেকের বেশি আটকে গেছে।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) নতুন এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ‘এলএনজি-টু-পাওয়ার ইন ইমার্জিং এশিয়া : আ ফাইভ-ইয়ার রিভিউ অব প্রজেক্ট আউটকামস’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি আজ বৃহস্পতিবার প্রকাশিত হয়েছে।
প্রতিবেদনে এশিয়ার চারটি উদীয়মান অর্থনীতির দেশ বাংলাদেশ, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের গত ৫ বছরের এলএনজিভিত্তিক প্রকল্পগুলো নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তাতে দেখা গেছে, ২০২১ সালের পর উচ্চ ব্যয় ও অর্থ সংকটের কারণে এসব দেশে প্রস্তাবিত এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও আমদানি টার্মিনালের অর্ধেকের বেশি বাতিল হয়েছে অথবা বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।
আইইইএফএর বাংলাদেশবিষয়ক প্রধান জ্বালানিবিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, গত চার থেকে পাঁচ বছরে এলএনজির দামের ওঠানামা বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর ও মূল্যসংবেদনশীল দেশের জন্য জ্বালানির ব্যয় বহন এবং নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে।
তার মতে, দেশের অব্যবহৃত গ্যাসসম্পদ কাজে লাগানো, জ্বালানি ব্যবহারে ব্যাপক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বড় পরিসরে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ করা গেলে বাংলাদেশ বেশি লাভবান হতে পারে।
আইইইএফএ চারটি দেশে ১০ হাজার ৯২০ কোটি ডলার সম্ভাব্য ব্যয়ের ৯২টি এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং ২ হাজার ১০০ কোটি ডলার ব্যয়ের ৪৪টি এলএনজি আমদানি টার্মিনাল পর্যালোচনা করে।
তাতে দেখা গেছে, ২০২১-২৬ সালের মধ্যে প্রস্তাবিত ৪৯টি এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং ২২টি এলএনজি টার্মিনাল বাতিল হয়েছে অথবা সেগুলোর উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। এসব প্রকল্পের সম্মিলিত মূল্য ৬ হাজার ৭৮০ কোটি ডলার। একই সময়ে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলোর মোট মূল্যের তুলনায় তা প্রায় সাড়ে চার গুণ।
চার দেশে প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ১১ শতাংশ এবং এলএনজি আমদানি টার্মিনালের সক্ষমতার ১৫ শতাংশ ২০২১-২৬ সালের মধ্যে চালু হয়েছে। বাস্তবায়িত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে গড়ে সাত বছরের বেশি সময় নিয়েছে। অথচ প্রকল্প উন্নয়নকারীরা সাধারণত তিন থেকে চার বছরের মধ্যে উৎপাদন শুরুর কথা বলে থাকেন।
আইইইএফএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ সালের পর থেকে এলএনজির দামে অস্থিরতা, মূলধনি ব্যয় বৃদ্ধি, গ্যাস টারবাইন সরবরাহে দীর্ঘসূত্রতা এবং ডলারের বিপরীতে এশিয়ার উদীয়মান দেশগুলোর মুদ্রার অবমূল্যায়ন এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের আর্থিক সম্ভাবনা দুর্বল করেছে। এসব কারণে প্রকল্পের জন্য ব্যাংকঋণ পাওয়াও কঠিন হয়ে উঠেছে।
প্রতিবেদনের সহলেখক ও আইইইএফএ এশিয়ার এলএনজি ও গ্যাস বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টোফার ডোলম্যান বলেছেন, এসব ঝুঁকির কারণে এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জীবনকালব্যাপী প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় ব্যয় ২০২১ সালের প্রাথমিক হিসাবের তুলনায় সর্বোচ্চ ১৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে এশিয়ার স্পট মার্কেটে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ২৭ দশমিক ৫ ডলারে পৌঁছায়, যা সংঘাত শুরুর আগের দামের প্রায় তিন গুণ। ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ২০২৬ সালে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের পর বিশ্ববাজারে এলএনজির দাম ২০২০ সালের আগের গড় দামের চেয়ে অনেক বেশি।
এ ছাড়া বিশ্ববাজারে গ্যাস টারবাইনের সংকট নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ব্যয় বাড়াচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের মূলধনি ব্যয় ২০২২ সালের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেড়েছে। ভারী শিল্পে ব্যবহৃত গ্যাস টারবাইন সরবরাহ পেতে এখন ছয় বছর বা তারও বেশি সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
অন্যদিকে সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তির ব্যয় কমছে এবং এসব প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে। পাশাপাশি ব্যাটারিতে বিদ্যুৎ সংরক্ষণের সক্ষমতা বাড়ায় পিক আওয়ারে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এতে বিদ্যমান গ্যাস অবকাঠামোর বড় অংশ অব্যবহৃত থাকার ঝুঁকিও বাড়ছে।
আইইইএফএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ সালের পর বাংলাদেশে তিনটি এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হয়েছে। তবে এলএনজি ও বিদ্যুতের উচ্চ ব্যয়ের কারণে সরকারের ভর্তুকির বোঝা বেড়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখতে বহিঃস্থ অর্থায়নের ওপর নির্ভরতাও গভীর হয়েছে। এত ব্যয়ের পরও অনির্ভরযোগ্য এলএনজি সরবরাহের কারণে দেশে গ্যাসসংকট অব্যাহত রয়েছে।
শফিকুল আলমের মতে, বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের সংকট সমাধানে শুধু এলএনজি আমদানি বাড়ানো যথেষ্ট নয়। বরং নিজস্ব গ্যাসসম্পদের ব্যবহার বাড়ানো, জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণের সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
তিনি বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি জ্বালানির চাহিদার দিকেও বিদ্যুতায়নের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। উদাহরণ হিসেবে শিল্পকারখানায় গ্যাসচালিত বয়লারের পরিবর্তে উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন হিট পাম্প ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেন তিনি।



