বিআইএফসির সম্পদের চেয়ে দায় বেশি ১৩৪৫ কোটি টাকা
- সানম্যান গ্রুপের গ্যারান্টিতে ৬২০ কোটি টাকার ঋণ

দীর্ঘদিনের লোকসান ও মূলধন ঘাটতিতে ধুঁকতে থাকা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানির (বিআইএফসি) সার্বিক অবস্থা আরও শোচনীয় হয়ে পড়েছে। ২০২৫ সালের শেষে কোম্পানিটির মোট সম্পদের চেয়ে দায়ের পরিমাণ ১ হাজার ৩৪৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকা ছাড়িয়েছে। একই সময়ে পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৯৯ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। চরম এই আর্থিক সংকটের কারণে প্রতিষ্ঠানটির স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন নিরীক্ষক।
বিআইএফসির ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত হিসাব বছরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন আহসান মঞ্জুর অ্যান্ড কোম্পানির অংশীদার মো. আবদুল্লাহ আল আমিন।
নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিআইএফসির বিতরণ করা ঋণ, লিজ ও অগ্রিমের একটি বড় অংশের বিপরীতে সানম্যান গ্রুপের গ্যারান্টি রয়েছে। ২০২৫ সাল শেষে কোম্পানিটির মোট ঋণ, লিজ ও অগ্রিমের পরিমাণ ছিল ৭৬২ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে সানম্যান গ্রুপের প্রতিষ্ঠান গোল্ডেন হরাইজন লিমিটেডকেই দেওয়া হয়েছে ৫৮ কোটি ৬১ লাখ টাকা। বাকি ৭০৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে অন্যান্য পক্ষকে।
বিতরণকৃত এসব ঋণ ও অগ্রিমের মধ্যে ৬১৯ কোটি ৫৮ লাখ টাকার বিপরীতেই সানম্যান গ্রুপের গ্যারান্টি রয়েছে, যা মোট ঋণের প্রায় ৮১ শতাংশ। নিরীক্ষক জানিয়েছেন, এ ধরনের জামানত ব্যবস্থা ‘ফাইন্যান্স কোম্পানি আইন, ২০২৩’-এর ২৫ ধারার পরিপন্থী।
এদিকে, নিরীক্ষক কোম্পানিটির ৭২৭ কোটি ৩৮ লাখ টাকার ঋণ ও আমানতের হিসাবের যথার্থতা নিশ্চিত করতে পারেননি। এর মধ্যে অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও এজেন্টের কাছ থেকে নেওয়া ঋণ ৩৪৭ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। এ ছাড়া ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মেয়াদি আমানত ২১১ কোটি ৪৭ লাখ এবং অন্যান্য উৎসের মেয়াদি আমানত ১৬৮ কোটি ১১ লাখ টাকা। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কাছে চিঠি পাঠিয়ে বা বিকল্প নিরীক্ষা পদ্ধতিতেও পর্যাপ্ত প্রমাণ না মেলায় এসব হিসাবের সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পাশাপাশি কয়েকটি ব্যাংক ও কোম্পানির হিসাবেও অমিল পাওয়া গেছে, যা সমন্বয় করা হয়নি নিরীক্ষার তারিখ পর্যন্ত।
বিআইএফসির স্থায়ী সম্পদের হিসাব নিয়েও আপত্তি তুলেছেন নিরীক্ষক। ২০২৫ সাল শেষে কোম্পানিটির স্থায়ী সম্পদের মূল্য দেখানো হয়েছে ৪৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এর মধ্যে শুধু পল্টনে অবস্থিত একটি জমির মূল্যই ধরা হয়েছে ৪৪ কোটি টাকা। কিন্তু এই জমির মালিকানা প্রমাণের প্রয়োজনীয় নথি— যেমন মিউটেশন রেকর্ড, বিএস, আরএস, এসএ, সিএস খতিয়ান ও ভূমি কর পরিশোধের কোনো কপি পাওয়া যায়নি। ফলে জমির প্রকৃত মালিকানা ও মূল্য নিশ্চিত হতে পারেননি নিরীক্ষক।
এ ছাড়া টেলিপ্লাস নিউ ইয়র্ক লিমিটেডের একটি ঋণ হিসাবে অপরিশোধিত ১৮ কোটি ৮ লাখ টাকা সুদ যোগ করে বকেয়া ঋণের পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অন্যদিকে, বিআইএফসির ৪৩ লাখ ৪৭ হাজার টাকার অবণ্টিত লভ্যাংশ ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ডে (সিএমএসএফ) স্থানান্তর করা হয়নি। পাশাপাশি ৭ কোটি ৮৩ লাখ টাকার বকেয়া উৎসে কর সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ায় ‘আয়কর আইন, ২০২৩’ অনুযায়ী কোম্পানিটি অতিরিক্ত দায়ের মুখে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন নিরীক্ষক।
সার্বিক বিষয়ে বিআইএফসির কোম্পানি সচিব আনিসুর রহমান আগামীর সময়কে বললেন, ২০১৫ সালে এস আলম ও পি কে হালদার কোম্পানিটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিভিন্ন অনিয়ম করেন। এতে কোম্পানিটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে কোম্পানিটির ব্যবসা নেই। তারপরও সমস্যা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুঞ্জীভূত লোকসান, মূলধন ঘাটতি এবং সম্পদের চেয়ে দায় অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় বিআইএফসির স্বাভাবিক ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ফেরা কঠিন। আর্থিক অসংগতি ও সম্পদের হিসাবহীনতা প্রতিষ্ঠানটির ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনাকে করে তুলেছে আরও ক্ষীণ।



